গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক
ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের মাধ্যম বাইন্যান্স জানিয়েছে, একটি ‘নিরাপত্তাজনিত ঘটনায়’ তাদের প্রায় ৬৩০ কোটি ডলারের সম্পদ চুরি হয়েছে। ঘটনাটি ক্রিপ্টোকারেন্সির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চুরির ঘটনা বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের মাধ্যমটি বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, তারা অর্থ জমা ও উত্তোলনের সব কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, সাইবার হামলার পর চুরি হওয়া অর্থের মধ্যে প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে।
বাইন্যান্স জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, একজন হ্যাকার তাদের এক প্রকৌশলীর হ্যাক হওয়া ল্যাপটপে প্রবেশাধিকার পেয়ে অননুমোদিত লেনদেন করতে সক্ষম হয়।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, চুরির কারণে হওয়া সব ক্ষতি তারা নিজেরাই বহন করবে। একই সঙ্গে তারা বলেছে, ব্যবহারকারীদের অর্থ ‘নিরাপদ’ রয়েছে।
আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বাইন্যান্স বলেছে, ‘আমাদের দলগুলো নিরাপদে ও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সমস্যাটির সমাধানে দিনরাত কাজ করছে।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘অপরাধীদের পরিচয় নিশ্চিত করতে এবং তাদের বিচারের আওতায় আনতে আমরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছি।’
তদন্ত শেষ হলে এ বিষয়ে বিস্তারিত কারিগরি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এর আগে বাইন্যান্সের প্রতিষ্ঠাতা ও সবচেয়ে বড় অংশীদার চ্যাংপেং ঝাও বলেছিলেন, লেনদেনের মাধ্যমটি হ্যাক হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান টিআরএম এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, তাদের উচ্চমাত্রার আত্মবিশ্বাস রয়েছে যে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকার ইউনিট ট্রেডারট্রেইটার এই হামলা চালিয়েছে। তদন্তকারীরা এই ইউনিটকে লাজারাস গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
টিআরএমের বৈশ্বিক নীতিবিষয়ক প্রধান আরি রেডবোর্ড হামলাটিকে ‘নজিরবিহীন’ ও ‘একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
আল জাজিরাকে রেডবোর্ড বলেন, ‘উত্তর কোরিয়া যখন এভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ চুরি করে, তখন সেই অর্থ অস্ত্রের বিস্তার এবং অন্যান্য অস্থিতিশীল কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়। ফলে এটি শুধু ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির ঘটনা নয়, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্যও একটি উদ্বেগের বিষয়।’
বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রিপ্টোকারেন্সি বিটকয়েনের দাম এই চুরির ঘটনার পর প্রায় ৫ শতাংশ কমে যায়। এতে বিটকয়েনের দাম ৭৭ হাজার ডলারের নিচে নেমে আসে।
সিডনির ম্যাককুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারবিষয়ক বিশেষজ্ঞ শন ফোলি আল জাজিরাকে বলেন, ‘বাইন্যান্স বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত লেনদেনের মাধ্যম। তাই প্রতিষ্ঠানটির প্রতি আস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা লাগলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। এর ফলে ক্রিপ্টো সম্পদের দাম কমে যেতে পারে।’
ফোলি বলেন, এই হামলা কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত লেনদেনের মাধ্যমগুলোর ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছে। এর ফলে আরও বেশি ব্যবসায়ী বিকেন্দ্রীভূত লেনদেনের বিকল্প মাধ্যম ব্যবহার করতে উৎসাহিত হতে পারেন।
তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত কোনো লেনদেনের মাধ্যমে রাখা সম্পদ ওই প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার ওপরই নির্ভরশীল। আর কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে যত বেশি সম্পদ থাকে, সেটি হ্যাকারদের কাছে তত বড় লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।’
বাইন্যান্সে এই সাইবার হামলার ঘটনা ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এর আগে ২০২৫ সালে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত লাজারাস গ্রুপ ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের মাধ্যম বাইবিট থেকে ১৫০ কোটি ডলারের সম্পদ চুরি করেছিল। এত দিন সেটিই ছিল ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির সবচেয়ে বড় ঘটনা।
টিআরএমের তৈরি ২০২৬ সালের ক্রিপ্টো অপরাধবিষয়ক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রায় ১৫০টি সাইবার হামলার ঘটনায় অপরাধীরা মোট ২৮৭ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো সম্পদ চুরি করেছে।
২০১৭ সালে চীনে চ্যাংপেং ঝাও বাইন্যান্স প্রতিষ্ঠা করেন। কয়েনমার্কেটক্যাপের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনায় প্রায় ১৫ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের সম্পদ রয়েছে। অন্য যেকোনো ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের মাধ্যমের তুলনায় বাইন্যান্সের সম্পদের পরিমাণ বেশি।