নিজস্ব সংবাদদাতা
কালীগঞ্জের বক্তারপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের আরও তিন নেতাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিতে আদালতে আবেদন করেছে পুলিশ। কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা আওয়ামী লীগের মিছিলে অর্থ ও লোকবল জোগানোর অভিযোগে সন্ত্রাস বিরোধী আইনের একটি মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) গাজীপুর চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তাদের হাজির করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এই আবেদন করেন।
গ্রেপ্তার চারজনের একজন বক্তারপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান আকন্দ ফারুক (৫৮)। তিনি খৈকড়া এলাকার প্রয়াত আব্দুল মজিদ আকন্দের এই ছেলে ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তিনি পাঁচবারের চেয়ারম্যান এবং সর্বশেষ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নৌকা প্রতীকে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
অন্যরা হলেন, আটলাব এলাকার প্রয়াত গিয়াস উদ্দিনের ছেলে ৪ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ইউপি সদস্য নুরুল ইসলাম (৫৯), ব্রাহ্মণগাঁও এলাকার প্রয়াত তাজিম উদ্দিনের ছেলে ও ইউনিয়ন শ্রমিক লীগের সহ-সভাপতি নূর উদ্দিন মোল্লা (৪৫) এবং খৈকড়া এলাকার প্রয়াত শুকুর আলীর ছেলে ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য ইকবাল হোসেন (৩৯)।
পুলিশ জানিয়েছে, বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে গাজীপুর শহরের উত্তর ছায়াবীথি এলাকা থেকে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) চারজনকে আটক করে। পরে বাসন থানার সন্ত্রাস বিরোধী আইনে হওয়া একটি মামলায় (মামলা নম্বর ৩৩(৮)২৬) তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত ২২ আগস্ট ভোর পাঁচটার কাছাকাছি সময়ে বাসন থানার ভোগড়া বাইপাস থেকে নাওজোর সড়কে একদল লোক জড়ো হন। ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা ও ১৫ আগস্টের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এবং আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রতিবাদে তারা বিক্ষোভ মিছিল করেন বলে এজাহারে উল্লেখ আছে। মিছিলে ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ গাজীপুর মহানগর’ লেখা একটি ব্যানার ছিল।
এজাহারে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, দেশ ও বিদেশে থাকা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও তাদের অঙ্গসংগঠনের নেতা এবং কয়েকজন সদস্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়েছেন। মিছিলে তারা বিভিন্ন স্লোগান দেন। এগুলোর মধ্যে ছিল ‘জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’, ‘শেখ হাসিনা আসবে বাংলাদেশ হাসবে, বাংলাদেশ হাসবে শেখ হাসিনা আসবে’, ‘শেখ হাসিনা ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই’, ‘মোদের নেতা শেখ মুজিব’ এবং ‘বাবু ভাই, বাবু ভাই, রাজপথ ছাড়ি নাই, শেখ হাসিনার ভয় নাই’।
এজাহারের ভাষ্য, এসব কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল ও অকার্যকর করা এবং দেশের সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করা।
রিমান্ড আবেদনে পুলিশ বলেছে, প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে যে আতিকুর রহমান আকন্দ ফারুক নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল কার্যকর করতে অর্থ জুগিয়েছেন। বাকি তিনজনের মাধ্যমে কর্মী জোগান দিয়েছেন এবং নিজেরাও মিছিলে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন। পুলিশের দাবি, সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমে তারা জড়িত।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (উত্তর) উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ জাকির হোসেন রিমান্ডের পক্ষে সাতটি যুক্তি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, রিমান্ড পেলে পুলিশ মামলার সুষ্ঠু তদন্ত করতে পারবে; ঘটনা-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে; এজাহারভুক্ত আসামিদের বর্তমান অবস্থান নির্ণয় করে তাদের গ্রেপ্তার করতে পারবে; আসামিদের সরকার বিরোধী সন্ত্রাসী কার্যক্রম ও রাষ্ট্রবিরোধী মিছিলের বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে পারবে; মিছিলের অর্থায়নকারী ও মূল হোতাদের শনাক্ত করতে পারবে; অজ্ঞাতনামা আসামিদের নাম-ঠিকানা জোগাড় করে গ্রেপ্তার করতে পারবে এবং আসামিদের নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করতে এবং তাদের নিয়ে অভিযান চালাতে পারবে।
তদন্ত কর্মকর্তা আবেদনে বলেছেন, প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য এই রিমান্ড প্রয়োজন। তিনি একই সঙ্গে আসামিদের জেলহাজতে রাখার আবেদন করেছেন।
আদালতকে পুলিশ জানিয়েছে, এই ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জড়িত থাকার পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ তারা পেয়েছে। পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে তারা প্রাথমিকভাবে স্বীকার করেছেন যে ঘটনার দিন ও সময়ে তারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তারা গাজীপুর মহানগর যুবলীগসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন এবং নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সরকারবিরোধী মিছিল, সভা ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন বলেও পুলিশ জানায়।
পুলিশ জানিয়েছে, আতিকুর রহমান আকন্দ ফারুকের বিরুদ্ধে কালীগঞ্জ ও উত্তরা পশ্চিম থানায় পৃথক দুটি মামলা আছে। নুরুল ইসলাম ও ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধেও কালীগঞ্জ থানায় একটি করে মামলা রয়েছে। নূর উদ্দিন মোল্লার বিরুদ্ধে অন্য কোনো মামলার কথা পুলিশ উল্লেখ করেনি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই জাকির হোসেন জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার চারজনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়ে দেওয়া আবেদনের বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত অপেক্ষমাণ।