গাজীপুরে টাকায় মেলে ফায়ার সনদ, বেশির ভাগ কারখানার ‘ফায়ার সনদ’ ভুয়া!

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : গাজীপুরে গত চার বছরে দুই শতাধিক শিল্প-কারখানায় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড হয়েছে। এসব অগ্নিকাণ্ডে ২০১৬ সালে ৩৮ জন, ২০১৭ সালে ১৮ জন, ২০১৮ সালে দুজন এবং সর্বশেষ চলতি বছর মৃত্যু হয়েছে ১৬ শ্রমিকের। সম্পদ পুড়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকার। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী দু-চারটি ছাড়া অধিকাংশ কারখানায় ছিল আধুনিক সরঞ্জামসহ অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা। ছিল ফায়ার সনদও। তার পরও আগুন লেগে এত ক্ষয়ক্ষতি ও মৃত্যু কেন?

২৮ ডিসেম্বর কালের কণ্ঠ- পত্রিকায় প্রকাশিত ‘বেশির ভাগ কারখানার অগ্নিনিরাপত্তা ভুয়া’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এ সকল তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযোগ উঠেছে, শুধু ওই সব কারখানা নয়, গাজীপুরের বেশির ভাগ কলকারখানার অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থাই কাগুজে। ফায়ারম্যান, অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র, প্রয়োজনীয় উন্মুক্ত জায়গা ও পানির ব্যবস্থা না থাকলেও ‘ফায়ার সনদ’ পেয়েছে কারখানাগুলো।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, অগ্নিনিরাপত্তা সরঞ্জাম নেই, গাজীপুরের এমন কারখানারও রয়েছে অগ্নিনিরাপত্তা সনদ। নামমাত্র যন্ত্রপাতি থাকা কারখানাও পেয়েছে ফায়ার সনদ। ওই সব কারখানায় পানির পাইপ, জলাধার, ধোঁয়া বের হওয়ার ব্যবস্থা, বিকল্প সিঁড়ি বা পথ, নিজস্ব ফায়ার ফাইটার, ভেতর ও বাইরে পর্যাপ্ত খোলা স্থান দেখা যায়নি। আবার এক বা দোতলার সনদ নিয়ে আরো একাধিক তলা বা নতুন ভবনে কারখানা পরিচালনার ঘটনা এখানে অহরহ।

গত ২২ অক্টোবর আগুন লাগে গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গীর পুবাইলের ‘আল রাজি পলিমার’ কারখানায়। কারখানায় ফায়ার সনদ থাকলেও বাস্তবে আগুন নেভানোর কোনো ব্যবস্থাই ছিল না এতে। আগুন লাগার তিন মাস পেরিয়ে গেলেও কারখানাটির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি ফায়ার সার্ভিস। উল্টো কারখানা কর্তৃপক্ষ বীমা দাবির জন্য ফায়ার সার্ভিসের কাছে প্রতিবেদন চেয়ে আবেদন করেছে।

জানতে চাইলে টঙ্গী ফায়ার স্টেশনের পুবাইল অঞ্চলের ফায়ার পরিদর্শক মো. কবিরুল ইসলাম বলেন, ‘ফায়ার সনদ নেওয়ার সময় আল রাজি পলিমার কারখানায় একটি ভবন ছিল। পরবর্তীতে কারখানা কর্তৃপক্ষ মূল ভবনের পাশে অবৈধভাবে আরো কয়েকটি শেড তৈরি করে সুতা তৈরি করত। ওখানেই আগুন লাগে। ওই শেডের কোনো ফায়ার সনদ ছিল না। নতুন শেড সম্পর্কে আমাদের জানা ছিল না।’ মূল ভবনে সনদ থাকলেও আগুন নেভানোর যন্ত্রপাতি না থাকা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সঠিক উত্তর দিতে পারেননি এই পরিদর্শক।

কবিরুল ইসলাম আরো জানান, আল রাজি পলিমারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে কোনো তদন্ত কমিটি করা হয়নি।

সম্প্রতি আল রাজি বীমা দাবি তোলায় ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তর থেকে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। কমিটি শিগগিরই তদন্ত শুরু করবে। তদন্তের পর আগুন লাগার কারণ জানা যাবে।

গত ১৫ ডিসেম্বর গাজীপুরের কিশরিতায় লাক্সারি ফ্যান কারখানায় আগুন লাগে। অগ্নিকাণ্ডের পর গাজীপুর ফায়ার সার্ভিসের সহকারী উপপরিচালক দাবি করেন লাক্সারি কারখানার নিচতলা ও দোতলার ফায়ার সনদ ছিল। ছিল না দোতলার ছাদের টিনশেড অংশের। ওই টিনশেডেই আগুন লেগে মৃত্যু হয় ১০ শ্রমিকের।

দুর্ঘটনার পর ওই কারখানার নিচতলা ও দোতলায় চার-পাঁচটি অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র ছাড়া অগ্নিনিরাপত্তার আর কোনো সরঞ্জাম খুঁজে পাওয়া যায়নি।

কারখানার পাশের কিশরিতা গ্রামের বাসিন্দা উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সৈয়দ আফসার উদ্দিন বলেন, ‘লাক্সারি ফ্যান কারখানা কিভাবে ফায়ার সনদ পেল, তারও তদন্ত হওয়া দরকার।’

শ্রীপুরের অটো স্পিনিং মিলে আগুন লেগে গত ২ জুলাই মৃত্যু হয়েছিল ছয় শ্রমিকের। অগ্নিকাণ্ডের পর গঠিত কমিটি তদন্ত করতে গিয়ে দেখতে পায়, ৩০ মিটার পর পর জরুরি বের হওয়ার পথ থাকার কথা থাকলেও বিশাল ওই কারখানায় পথ ছিল একটি। ছিল না ধোঁয়া বের হওয়ার ব্যবস্থা, যে কারণে ছয় শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। অগ্নিনিরাপত্তা শর্ত পূরণ না হলে কারখানায় ফায়ার সনদ পাওয়ার সুযোগ নেই। অথচ ওই কারখানারও ছিল ফায়ার সনদ।

একইভাবে গত ৫ ডিসেম্বর আগুন লেগে পুড়ে যায় টঙ্গীর এনেটেক্স গ্রুপের লামিশা স্পিনিং। বিশাল আয়তনের কমপ্লায়েন্স কারখানাটিতে ছিল আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা। কিন্তু আগুন লাগার পর ওই কারখানায় আগুন নেভানোর ন্যূনতম চেষ্টার প্রমাণ পায়নি জেলা প্রশাসকের গঠিত তদন্ত কমিটি। কারখানাটিতে তিন হাজার শ্রমিক কাজ করত। ফায়ার সনদ অনুযায়ী কোনো কারখানায় শ্রমিক-কর্মচারীর ১৮ শতাংশের আগুন নেভানো ও মোকাবেলার প্রশিক্ষণ থাকার কথা। ওই হিসাবে লামিশা স্পিনিংয়ে ৫৪০ জন ফায়ার ফাইটার থাকার কথা ছিল। তারা কেন আগুন নেভায়নি তারও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন টঙ্গী ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা আতিকুর রহমান।

জানা গেছে, ফায়ার সনদের শর্ত অনুযায়ী কারখানার মোট জনবলের ১৮ শতাংশ ফায়ার ফাইটার থাকতে হয়। তাদের অবশ্যই ফায়ার সার্ভিস থেকে দুই দিনের মৌলিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং সনদধারী হতে হয়। প্রশিক্ষণের জন্য সরকারি কোষাগারে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমা দেওয়ার পর ফায়ার সার্ভিস শ্রমিকদের জন্য দুই দিনের মৌলিক প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। প্রশিক্ষণে উন্নীত হলেই দেওয়া হয় সনদ। অভিযোগ রয়েছে, বহু কারখানার ফায়ার ফাইটারদের ট্রেনিংও কাগুজে।

একাধিক শ্রমিক জানান, কারখানা মালিকরা নিয়ম রক্ষার জন্য প্রশিক্ষক ফি দেন। নাম দিলেও কাজের ক্ষতির কথা চিন্তা করে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণে যেতে দেন না। তালিকা অনুযায়ী ফায়ার সার্ভিস সনদ তৈরি করে দেয়। অনেকে সনদ নেয় না। গাজীপুর ফায়ার সার্ভিসের সহকারী উপপরিচালকের অফিসে গেলে দেখা যাবে, শত শত কারখানার নামে এ ধরনের হাজার হাজার সনদ তাদের তাকে বছরের পর বছর পড়ে আছে।

জানা গেছে, ঋণ নবায়ন, এলসি, রপ্তানি আদেশ এবং বিদেশি ক্রেতার কাছ থেকে কার্যাদেশ পাওয়া, শ্রমিক-কর্মচারীদের জীবনের নিরাপত্তা ইত্যাদির জন্য কলকারখানায় ফায়ার সনদ বাধ্যতামূলক। গ্রিন কারখানা এবং বড় বড় কারখানায় রয়েছে আধুনিক অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা। তবে ছোট ও মাঝারি বহু কারখানার চিত্র উল্টো। মুনাফালোভী মালিকরা লাখ লাখ টাকার যন্ত্রপাতি কেনার পরিবর্তে ফায়ার কর্মকর্তাদের হাত করে ফায়ার সনদ বাগিয়ে নিয়ে কারখানা চালাচ্ছেন।

গাজীপুর ফায়ার সার্ভিসের তথ্য মতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে গাজীপুরে ৪৯৩টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে সম্পদ পুড়েছে আট কোটি ৮৮ লাখ টাকার। নিহত হয়েছে ১১ জন। ২০১৮ সালে ৪১১টি, ২০১৭ সালে ৩৮১টি অগ্নিকাণ্ড হয়েছে।

গাজীপুর ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক মো. মামুনুর রশিদ জানান, গাজীপুরে সাড়ে চার হাজারের বেশি কারখানা রয়েছে। ফায়ার পরিদর্শকদের সুপারিশ ছাড়া কোনো কারখানায় ফায়ার সনদ প্রদান করা হয় না। কোনো কারখানায় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার সব শর্ত পূরণ হলেই কেবল সনদ প্রদান করা হয়। তবে নানা কারণে অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটতেই পারে। তাঁর অফিসে ‘ফায়ার সনদ’ পড়ে থাকা প্রসঙ্গে বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠান সনদ নিচ্ছে না বলে রয়ে গেছে। দ্রুত সব সনদ সংশ্লিষ্ট কারখানাকে নিতে বলা হবে।

গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং সম্প্রতি একাধিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় জেলা প্রশাসকের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান মো. শাহিনূর ইসলাম জানান, বড় বড় কয়েকটি অগ্নিকাণ্ডের পর তদন্ত করতে গিয়ে তিনি দেখতে পেয়েছেন, সনদ থাকলেও অনেক কারখানায় আগুন নেভানোর পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে, কোনোটাতে প্রশিক্ষিত ফায়ার ফাইটার নেই, কোনোটাতে বিকল্প সিঁড়ি নেই, ধোঁয়া বের হওয়ার ব্যবস্থা নেই। এমনকি এক তলার ফায়ার সনদ নিয়ে দু-তিন তলা অথবা এক ভবনের সনদ নিয়ে একাধিক ভবনে উৎপাদন চালানো হচ্ছে। এর ফলে ঝুঁকি বাড়ছে। প্রাণহানি ও সম্পদ পুড়ে বিশাল ক্ষতি হচ্ছে। এসব অনিয়ম রোধ করতে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে প্রতি উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রধান, সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) সদস্যসচিব করে পাঁচ সদস্যের পরিদর্শন টিম গঠন করা হয়েছে। যেসব কারখানায় অনিয়ম পাওয়া যাবে ওই সব প্রতিষ্ঠান তাত্ক্ষণিক সিলগালা করে দেওয়া হবে।