গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : যদি আপনার কোভিড-১৯ টেস্টে পজেটিভ আসে, তবে আপনাকে নিজের স্বাস্থ্য এবং অন্যদের স্বাস্থ্য সুরক্ষিত রাখতে কিছু নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হচ্ছে করোনা টেস্টে আপনার পজেটিভ আসার পর আপনাকে অন্যদের এ ফল অন্যদের জানাতে হবে, সেটা হয় ব্যক্তিগতভাবে কিংবা কন্টাক্ট ট্রেকারের মাধ্যমে জানাতে হবে।
বেকি স্টুয়েমফিগ নামে এক আচরণবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ বলেন, যদি আপনার কোভিড-১৯-এর টেস্টে পজেটিভ আসে, তবে এটা গুরুত্বপূর্ণ যে অন্যদের সেটা জানানো। কারণ এ ভাইরাস অনেক বেশি সংক্রামক ও মারণঘাতী।
করোনাকে অদৃশ্য শত্রু উল্লেখ করে তিনি বলেন, অন্যদের না জানানোর মধ্য দিয়ে আপনি নিরীহ মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলছেন। যা গোটা সম্প্রদায়ের মধ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
তার পরও এমন অনেক ঘটনা আছে, যেখানে করোনা পজেটিভ ব্যক্তি জানানোর জন্য কয়েকদিন পর্যন্ত সময় নেয়। আবার অনেকে পুরোপুরি সেরে না ওঠা পর্যন্ত আক্রান্ত হওয়ার সংবাদ গোপন রাখে।
প্রত্যেক ব্যক্তির টেস্ট রেজাল্ট অন্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি না করার নিজস্ব কারণ রয়েছে। কিন্তু এটাকে আড়ালে রাখার কিছু সাধারণ কারণও রয়েছে। স্টুয়েমফিগসহ অন্যান্য আচরণ বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ করে দেখেছেন কেন কিছু মানুষ নিজেদের পজিটিভ হওয়ার খবর অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করে না।
আবেগজনিত কারণ
স্টুয়েমফিগ বলেন, যখন একজন ব্যক্তি কোভিড-১৯ টেস্টে পজেটিভ আসে, তখন তাদের আবেগ ধাক্কা কিংবা অবিশ্বাস থেকে রাগ, অনিশ্চয়তা, অপরাধবোধ, লজ্জা, দ্বিধা, উদ্বেগ, ভয়, দুঃখ, ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা এবং পরিবার নিয়ে ভাবনাসহ নানা দিকে বিস্তৃত হয়। এরপর উপসর্গহীন মানুষ যখন পজিটিভ ফল পেতে শুরু করল, তখন আরেক ধরনের অনিশ্চয়তা ও দ্বন্দ্ব তৈরি হলো। অনুভূতির বিস্তৃত এই পরিসীমা লোকজনকে একধরনের হতভম্ব অবস্থার মধ্যে ঠেলে দেয়, ফলে যা ঘটছে তা নিয়ে তারা সংগ্রাম করতে শুরু করে। বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাওয়া এবং কিছুই করতে না পারার জন্য এ রকম হতে পারে।
নিউরোসাইকোলজিস্ট লাউরা বক্সলে বলেন, একজনের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া কেমন হবে সেটা ব্যাপার না। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো এগিয়ে যাওয়ার জন্য যেসব ধাপ অনুসরণ করা দরকার তাতে মনোযোগ দেয়া। এটা করতে হবে নিজেদের স্বাস্থ্য এবং আশপাশের অন্যদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য।
সমালোচিত হওয়ার ভয়
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে যা কিনা রিপোর্ট গোপন রাখার দিকে চালিত করে তা হলো সমালোচিত হওয়ার ভয়। যা কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে বাড়তি স্ট্রেস যোগ করে।
ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট জায়নাব দেলাওয়ালা বলেন, একটি পরিবেশ যেখানে অনেকেই ভাইরাসের বিস্তৃতিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয় না এবং অনেকে মাস্ক পরা এবং সামাজিক দূরত্বের নীতি মানতে চায় না। সেখানে অনেক ব্যক্তি কেবল নিজের অবহেলায় ভাইরাস আক্রান্ত হতে পারে এবং নিজেকেই দুষতে পারে। এ পরিবেশে যখন কেউ সাবধানতা অবলম্বন করে, তখন এমনও হতে পারে যে নিজের কাজের জন্য সমালোচিত হচ্ছে এবং তাদের ওপর দোষ দেয়া হচ্ছে। সে কারণে অনেকেই টেস্টে পজিটিভ আসার বিষয়টি বলতে চায় না।
অনেকে হয়তো লজ্জা বোধ করে
যখন একজন ব্যক্তি করোনাভাইরাস টেস্টে পজেটিভ আসে, তখন তারা হয়তো মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে নিজেদের ভাইরাস আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি যুক্ত করতে আনন্দিত বোধ করে না, বলেছেন সানিয়া মায়ো। তার মতে, বিপজ্জনক, ক্ষতিকর ও মারণঘাতী হিসেবে কোনো ব্যক্তি নিজেকে দেখাতে চায় না।
মানুষের গভীর তদন্তের বিষয়টিও হয়তো লোকজনকে তাদের রেজাল্ট পজেটিভ আসার জন্য নিজেদের দোষারোপ দেয়ার দিকে ঠেলে দিতে পারে এবং নিজেদের আচরণের জন্য তাদের লজ্জার মাঝে ফেলে দিতে পারে। এমনকি যদি তারা জনস্বাস্থ্য নির্দেশনা ঠিকঠাকমতো মেনে চলে তবুও।
স্টুয়েমফিগ বলেন, এ ধরনের অভিজ্ঞতা কোভিড-১৯-এ পজেটিভ হওয়া ব্যক্তিকে কলঙ্কিত হওয়ার ধারণার সঙ্গে যুক্ত করতে পারে।
বক্সলের মতে, ভাইরাসের সংস্পর্শে আসা এবং অন্যদের সংক্রমিত করার যে ধারণা তা সাধারণভাবেই বিব্রতকর অনুভূতি নিয়ে আসে। তবে সত্যি কথা হলো এ তথ্য শেয়ার করলে বরং অন্যদের এবং নিজের স্বাস্থ্য রক্ষা করা সম্ভব হয়। নয়তো পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
অর্থনৈতিক দিক
যুক্তরাষ্ট্রে মহামারী শ্রমিকদের পর্যাপ্ত পরিমাণ অসুস্থতাজনিত ছুটির অভাবকে সামনে এনেছে। যা কিনা রোগ ছড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। আবার অনেকের চাকরির ধরন এমন যে তা তাদের বাড়ি থেকে কাজ করার অনুমতি দেয় না কিংবা অসুস্থতার সময় ছুটি পাওয়ার সুযোগ থাকে না। এ রকম অবস্থার কারণে বাজে ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। যেখানে কিছু শ্রমিক দেখা যাচ্ছে সংক্রমিত হওয়ার পরও তা কাউকে জানাচ্ছে না।
স্টুয়েমফিগ বলেন, অনেক মানুষ নৈতিক দ্বন্দ্বে ভুগতে থাকে কাজে ফেরার কিংবা নিজেদের পরিবারের সদস্যদের দেখাশোনা করার ব্যাপারে। টেস্টে পজিটিভ আসার পর কী করতে হবে, তা নিয়ে তারা অনিশ্চয়তায় ভুগতে থাকে।
স্বীকার না করার প্রবণতা
কথায় আছে, অজ্ঞতায় সুখ। যখন এ ধরনের কঠিন কিছু জানা যায়, আমাদের অনেকের মাঝে সেই প্রবাদ বাক্যের মতো অস্বীকার করার প্রবণতা তৈরি হয়। বক্সলে বলেন, যেসব বিষয় আমাদের মাঝে নেতিবাচক চিন্তা তৈরি করে আমাদের মাঝে সেসব অস্বীকারের প্রবণতা দেখা যায়। তাই দেখা যায় পজেটিভ আসা অনেকেই সবকিছু অস্বীকার করে নিজেদের স্বাভাবিক জীবন যাপন করে যেতে থাকে। যা কিনা পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।