গোলাম মোর্তোজা : পৃথিবীতে পদ্মাসেতুর চেয়ে দীর্ঘ সেতু আছে। এর চেয়ে দৃষ্টিনন্দন সেতু আছে। আছে প্রযুক্তি ও গুণগত মানসম্পন্ন সেতু। সেসব সেতু আমাদের নয়, পদ্মাসেতু আমাদের। ফলে পদ্মাসেতু আমাদের গর্ব, পদ্মাসেতু আমাদের গৌরব।
এই পদ্মাসেতু নির্মাণকে কেন্দ্র করে পৃথিবীতে আলোচিত হয়েছে বাংলাদেশ। সেই আলোচনা হয়েছে নেতিবাচক অর্থে, ইতিবাচক অর্থে নয়। দুর্নীতির অভিযোগ ও বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়ন প্রত্যাহারকে কেন্দ্র করে সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। ক্যানাডার আদালতে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ার মধ্য দিয়ে যার সমাপ্তি হয়৷কিন্তু পদ্মাসেতু আলোচনা থেকে চলে যায় না। পদ্মাসেতু আলোচনায় থাকে বাজেট ও প্রযুক্তিগত জটিলতাকে কেন্দ্র করে।
বিশ্বব্যাংক ঋণ সহায়তা প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর নিজস্ব অর্থে পদ্মাসেতু নির্মাণের ঘোষণা দেয় সরকার। সেই অনুযায়ী কাজ চলছে পদ্মাসেতুর। বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থে সেতুর মূল কাজ করছে চীনের প্রতিষ্ঠান। শুরুতে পদ্মাসেতু ছিল ১০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প। তারপর কাজের সময় বাড়তে থাকে,পাল্লা দিয়েবাড়তে থাকে বাজেট। রেল লাইন পরে সংযোজনের কারণে বাজেট বেড়েছে। তারচেয়ে বেশি বেড়েছে সময় ক্ষেপন এবং অযৌক্তিক কারণে। ১০ হাজার কোটি টাকার পদ্মাসেতুর বাজেট এখন প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। তার মানে শুরুতে যে বাজেট ছিল সেই বাজেটে সেতু নির্মিত না হওয়ায়,প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা বেশি ব্যয় হচ্ছে। অর্থাৎ, কমপক্ষে তিনটি পদ্মাসেতুর টাকায় নির্মিত হচ্ছে একটি পদ্মাসেতু। এ সবই জনগণের করের টাকা। পৃথিবীতে নির্মাণ সামগ্রীর ব্যয় খুব বেশি বাড়েনি, কিন্তু পদ্মাসেতুর খরচ বেড়েছে প্রায় তিনগুণ।
এত বিপুল পরিমাণ ব্যয় বাড়লেও পদ্মাসেতুর বড় রকমের কিছু ত্রুটির বিষয় সামনে এসেছে। একটি জায়গায় রেল লাইনের সঙ্গে সেতুর সড়ক লাইন সাংঘর্ষিক হয়ে গেছে। একটি বড় লড়ি সেতু থেকে নামতে পারবে না৷উপরের অংশে আটকে যাবে। এত বড় এবং বিপুল বাজেটের একটি সেতুর ক্ষেত্রে এমন ভুল নজিরবিহীন, যা পদ্মাসেতুর ক্ষেত্রে দৃশ্যমান হয়েছে। এই নকশা সংশোধনে সময় এবং ব্যয় দুটোই বাড়বে। তিনগুণ বেশি ব্যয়ের পদ্মাসেতুর আরো একটি বড় দুর্বলতা এক লাইনের রেলপথ। যখন বাংলাদেশের রেলপথের অন্যতম দুর্বলতা হিসেবে আলোচিত হচ্ছে এক লাইনের রেলপথ। তখন পদ্মাসেতুর মতো আধুনিক সেতুতে নির্মান হচ্ছে এক লাইনের রেল, যা ১০০ বছরেরও বেশি আগে হার্ডিঞ্জ ব্রিজে নির্মিত হয়েছিল। আমাদের রেলপথের অন্যতম যে দুর্বলতা তা পদ্মাসেতুর রেলপথেও থেকেই গেল। বঙ্গবন্ধু সেতুর রেল লাইনে দুর্বলতার কারণে এখন নতুন আরেকটি রেলসেতু নির্মাণের আলোচনা চলছে। আগামী ২০-৩০ বছরের মধ্যেই হয়ত আলাদা করে রেলের জন্যে সেতুর আলোচনাও সামনে আসবে। সেকারণে পদ্মাসেতুতে দুই লাইনের রেলপথ অপরিহার্য ছিল। এত বাজেট বাড়লেও তা করা হয়নি।
পদ্মাসেতুর বাজেট বৃদ্ধির ক্ষেত্রে পদ্মা নদীর ভয়াবহতার আরেকটি যুক্তি সামনে আনা হয়। পদ্মার স্রোত ও তলদেশের মাটির প্রকৃতি ‘ইউনিক’, যা অন্য কোথাও পাওয়া যায়নি। বিষয়টি সত্যি ইউনিক, না তাড়াহুড়োর ফসল, না চীনা প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা,না শুধুই বাজেট বৃদ্ধির কৌশল,যার কোনো সুরাহা হয়নি। বাজেট বেড়েছে,বেড়েছে সময়। ২০২২ সালেও পদ্মাসেতুর কাজ শেষ না হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আশঙ্কা সত্যি হলে বাজেট আরো বাড়বে।
শুধু পদ্মাসেতু নয়, বাংলাদেশের প্রায় সব সেতু-সড়ক-ফ্রাইওভারের নকশায় ত্রুটি ও বাজেট বৃদ্ধি যেন জাতীয় রোগে পরিণত হয়েছে। ৩৫০ কোটি টাকার তেজগাঁও-মৌচাক ফ্লাইওভারের কাজ শেষ হয়েছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে। সোনারগাঁ অংশের নকশা ত্রুটিতে নির্মাণের পর ভাঙতে হয়েছে। এতেই ক্ষতি হয়েছে বা ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৭৫ কোটি টাকা। ঢাকা চট্টগ্রাম চারলেনের চার বছরের কাজ শেষ হয়েছে প্রায় ১২ বছরে। ব্যয় বেড়েছিল প্রায় চার গুণ৷ টঙ্গি-সায়েদাবাদ এক্সপ্রেসওয়ের সময়কাল ছিল তিন বছর, বাজেট ছিল ছয় হাজার কোটি টাকা। সময় চলে গেছে ৯ বছরের বেশি৷তিন বছর আগে জানা গিয়েছিল বাজেট বেড়ে হয়েছিল ২৪ হাজার কোটি টাকা। কাজ হয়েছিল ৩০ শতাংশের মতো। গত তিন বছরে কাজের প্রায় কোনো অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়৷জানা যায়, আবার বাজেট বাড়ানোর পরিকল্পনা চলছে।
সড়ক ও রেলপথের বাংলাদেশের খরচ উত্তর আমেরিকা,ইউরোপ,চীন-ভারতের চেয়ে যে বহুগুণ বেশি তা বহুল আলোচিত বিষয়। এক কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে ইউরোপে ব্যয় হয় ৩০ কোটি টাকার মতো, চীন-ভারতে ১০-১৩ কোটি টাকা। সেখানে বাংলাদেশে ব্যয় হয় ৭০-১২০ কোটি টাকা। রেলপথ নির্মাণের ক্ষেত্রেও হিসেবটা এমন বা এরচেয়েও বেশি। মেট্রোরেল নির্মাণেও বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে তিন থেকে চার গুণ বেশি অর্থ ব্যয় করছে।
এবং এই বিষয়গুলো এখন আর গোপনীয় কিছু নয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয় জমি অধিগ্রহণের ফলে খরচ বাড়ে, যা একেবারেই গ্রহণযোগ্য কোনো বক্তব্য নয়।
পৃথিবীতে মোটামুটিভাবে স্বীকৃত পরিসংখ্যান যে, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ব্যয়ে সবচেয়ে নিম্নমানের সড়ক-সেতু-ফ্লাইওভার-রেলপথ নির্মিত হয়। এ-ও স্বীকৃত যে,এর প্রধানতম কারণ দুর্নীতি।