গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : দেশে করোনার ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ অব্যাহত আছে। শনাক্তের হার আবারো শতকরা ১০ ভাগ ছাড়িয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রস্তাব থাকলেও লকডাউনের কথা ভাবছে না সরকার। তার বদলে স্বাস্থ্যবিধির বিষয়ে সরকার কঠোর হবে।
দেশে এখন প্রতিদিন দুই হাজারের বেশি করোনা রোগী শনাক্ত হচ্ছেন। এই ধারা শুরু হয়েছে গত ১৮ মার্চ থেকে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসেবে রোববার, ২৪ ঘণ্টায় মোট দুই হাজার ১৭২ জন শনাক্ত হয়েছেন, মারা গেছেন ২২ জন৷ সেখানে ১ মার্চ আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৫৮৫ জন, মারা গেছেন ৮ জন।
সে হিসেবে চলতি মাসের ২১ দিনেই করোনার সংক্রমণ বেড়েছে চারগুণ, আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যু বেড়েছে প্রায় তিনগুন। এই সময়ের মধ্যে পরীক্ষার বিপরীতে করোনা রোগী শনাক্তের হার চার দশমিক তিন-এক থেকে বেড়ে হয়েছে ১০ দশমিক দুই-নয় ভাগ। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে আক্রান্তদের মৃত্যুর হার প্রায় একই রকম আছে।
এ অবস্থায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ১২ দফা সুপারিশ দিয়েছে, যার মধ্যে লকডাউনের পরামর্শও রয়েছে। তবে সরকারের চিন্তা অন্য৷
পরিকল্পনামন্ত্রী আবদুল মান্নান বলেন ‘‘আমরা মনে করি ”মাস্ক, মাস্ক এবং মাস্ক” ও সামাজিক দূরত্বই হলো করোনা ঠেকানোর প্রধান উপায়।
সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণ
করোনার সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বগতির জন্য স্বাস্থ্যবিধির প্রতি মানুষের উদাসীনতাকেই প্রধানত দায়ী বলে মনে করেছেন সরকারি সংস্থা আইইডিসিআর-এর উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, ‘‘নভেম্বরে করোনা বেড়ে যাওয়ার পর সার্বিক চেষ্টায় তা কমে আসে। এরপর লোকজন মনে করতে শুরু করে করোনা আর আসবে না। ফেব্রুয়ারিতে টিকা দেয়া শুরুর পর এই মনোভাব আরো প্রবল হয়। মাস্ক ব্যবহার, সামাজিক দূরত্ব মানা বলতে গেলে উঠে যায়। ফলে সংক্রমণ আবার বাড়ছে। আর গরম এসে যাওয়ায় মানুষ ফ্যান ব্যবহার করছে, যা করোনা ছড়িয়ে দেয়। করোনার নতুন ভেরিয়েশনও হয়েছে।’’
করোনা সংক্রান্ত জাতীয় টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য বিএসএমইউ’র সাবেক উপাচার্য এবং ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘‘শীতের সময় দেশীয় অন্যান্য ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করে। তখন তারা করোনাকে ঢুকতে বাধা দিয়েছে। ফলে শীতে সংক্রমণ কম ছিল। এখন শীত চলে গেছে। দেশীয় ভাইরাস শরীরে নাই, তাই করোনা সংক্রমণ বাড়ছে।’’ তার মতে, যুক্তরাজ্য থেকে বাংলেদেশে প্রবেশ করা করোনার নতুন ধরনও সংক্রমণ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সেটি কতটা বিস্তৃত হয়েছে তা গবেষণার বিষয়। তিনিও স্বাস্থ্যবিধি না মানাকেই প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
লকডাউনের পরিকল্পনা নেই
পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ১২ দফা সুপারিশ পাঠিয়েছে মন্ত্রণালয়ে। তাতে শর্তসাপেক্ষে লকডাউনসহ নানা ধরনের স্বাস্থ্যবিধির কথা বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর লকডাউনের সুপারিশ করলেও বিশেষজ্ঞদের অনেকে এর পক্ষে নন। আগের লকডাউনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘‘প্রথমে না বুঝেই অনেক কিছু আমরা করেছি। লকডাউন করতে হলে মানুষকে খাবার পৌঁছে দিতে হবে৷ আমাদের এখানে সেটা সম্ভব নয়।’’
লকডাউন আরোপের পরিকল্পনা নেই সরকারেরও। স্বাস্থ্যসচিব আবদুল মান্নান বলেন, ‘‘এখন পর্যন্ত লকডাউনের কোনো চিন্তা নাই।’’ তার বদলে স্বাস্থ্যবিধিগুলো মানার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করছে সরকার। ‘‘আমরা মাস্ক এবং সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছি। মাস্ক ছাড়া বাইরে বের হওয়া যাবে না৷ সামাজিক অনুষ্ঠান, বিয়ে এসব ব্যাপারের সামাজিক দূরত্ব মানতে হবে। গণপরিবহণ, রাস্তাঘাট সবখানে৷ কোনো ছাড় দেয়া হবে না। মোবাইল কোর্ট নামানো হয়েছে। জরিমানা করা হবে। আমরা মনে করি মাস্ক ও সামাজিক দূরত্বই হলো করোনা ঠেকানোর প্রধান উপায়। মাস্ক, মাস্ক এবং মাস্ক।’’
তবে শুধু বাহিরে কড়াকড়ি আরোপ করেও করোনার বিস্তার ঠেকানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে ঘরের ভিতরেও মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে সচেতন হতে হবে। ডা. মুশতাক হেসেন বলেন, ঘরোয়া অনুষ্ঠানেও যে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হয় তা অনেকেই বুঝতে পারছেন না। যেমন, কোরাস গান গাওয়া যাবে না। একজনকে গান গাইতে হবে৷ একটি বদ্ধ ঘরে মাস্ক পরেও অনেক লোক বেশিক্ষণ থাকতে পারবেন না। আইইডিসিআর এ সংক্রান্ত একটা নির্দেশনা সিভিল সার্জনদের পাঠিয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আগামী ৩০ মার্চ খোলার কথা রয়েছে। তবে শিক্ষামন্ত্রী গত সপ্তাহে বলেছেন জাতীয় কমিটির কাছ থেকে আবার মতামত নেয়া হবে।
ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘‘এনিয়ে আমাদের সাথে সোমবার বৈঠক আছে। সংক্রমণ শতকরা ১০ ভাগের বেশি হলে আমি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার বিরুদ্ধে। এরইমধ্যে ১০ ভাগ ছাড়িয়ে গেছে।’’
এ পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনা আক্রান্ত পাঁচ লাখ ৭০ হাজার ৭৭৮ জন শনাক্ত হয়েছে। মারা গেছেন আট হাজার ৬৯০ জন। ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত সারাদেশে ৪৭ লাখ ৬০ হাজার ৭৪৭ জন করোনার টিকা নিয়েছেন।
সূত্র: ডয়চে ভেলে