পৌরসভায় ‘খেয়ালখুশির’ নিয়োগ: স্থায়ী কর্মী ১১ হাজার ৬৭৫, অস্থায়ী কর্মী ২০ হাজার ৩৫৫

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : দিনাজপুর পৌরসভার ৪৯২ জন কর্মীর মধ্যে ৪১৭ জনই অস্থায়ী কর্মী। অস্থায়ী কর্মীদের কেউ রাজস্ব আদায়কারী, কেউ লাইসেন্স প্রদায়ক বা স্বাস্থ্যকর্মী আবার কারও পদবি ইলেকট্রিশিয়ান। অথচ পৌরসভার নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও মালি ছাড়া অস্থায়ী কর্মী নিয়োগের বিধান নেই। কিন্তু আইন না মেনেই গত চার বছরে শুধু দিনাজপুর পৌরসভাতেই অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ১০৬ জন।

শুধু দিনাজপুর নয়, দেশের ৩২৮টি পৌরসভায় স্থায়ী কর্মীর চেয়ে অস্থায়ী কর্মীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। অস্থায়ী কর্মী নিয়োগের বিষয়ে কোনো বিধিমালা না থাকায় মেয়ররা তাঁদের খেয়ালখুশিমতো নিয়োগ দিতে পারেন। নতুন মেয়ররা দায়িত্ব পেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিজের কাছের ও দলীয় লোকজনকে নিয়োগ দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব নিয়োগে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও পাওয়া যায়। স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে পৌরসভাগুলোতে অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ বন্ধ করতে বলা হলেও, সেটি মানা হচ্ছে না।

অস্থায়ী কর্মী নিয়োগের বিষয়ে দিনাজপুর পৌরসভার সদ্য বিদায়ী ওয়ার্ড কাউন্সিলর রমজান আলী বলেন, কোন সময়, কাকে কী কারণে নিয়োগ দেওয়া হয়, সেটি মেয়র ছাড়া আর কেউ জানে না। বিজ্ঞপ্তি তো দূরের কথা, পৌরসভার মাসিক সভাতেও কর্মী নিয়োগের বিষয়টি পাস করার প্রয়োজন মনে করেন না। আর নিয়োগ পাওয়া বেশির ভাগ অস্থায়ী কর্মী নিয়মিত অফিসে আসেন না। অথচ তাঁদের বেতনের বোঝা বইতে হয় পৌরসভাকে।

দিনাজপুর পৌরসভায় অস্থায়ী কর্মীদের মধ্যে কর নির্ধারণ ও আদায় শাখায় ২৯ জন, পূর্ত শাখা, পানি শাখা ও স্বাস্থ্য শাখায় ২৪ জন করে, বিদ্যুৎ শাখায় ২৩ জন, সাধারণ শাখায় ১৪ জন, লাইসেন্স শাখায় ১১, বাজার শাখায় ১০ জন এবং হিসাব শাখায় ৫ জন কাজ করেন। ঝাড়ুদার হিসেবে কাজ করেন ১১০ জন। অস্থায়ী কর্মীদের মাসিক বেতন-ভাতায় খরচ হয় প্রায় ২১ লাখ টাকা। দিনাজপুর পৌরসভায় বেতন বাকি না থাকলেও ৫৪ মাসের ভাতা বকেয়া।

দিনাজপুর পৌর মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সরকারি কাঠামো অনুযায়ী ৮০ জন স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী কম। ফলে মাস্টাররোলে (অস্থায়ী কর্মী) যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের দিয়েও বিভিন্ন দপ্তরে কাজ করানো হচ্ছে। পৌরসভার আয় থেকে অস্থায়ী কর্মচারীদের বেতন আগে পরিশোধ করতে হয়।

পৌর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংগঠন বাংলাদেশ পৌরসভা সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএসএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশের পৌরসভাগুলোতে বর্তমানে স্থায়ী কর্মী রয়েছেন ১১ হাজার ৬৭৫ জন। আর অস্থায়ী ভিত্তিতে বা দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করেন এমন কর্মীর সংখ্যা ২০ হাজার ৩৫৫ জন। দেশের দুই শতাধিক পৌরসভায় ২ থেকে ৭০ মাস পর্যন্ত বেতন–ভাতা বকেয়া। এ বকেয়ার পরিমাণ প্রায় ৮৭৫ কোটি টাকা।

একদিকে আয় কম, অন্যদিকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত অস্থায়ী কর্মী নিয়োগের কারণে বিভিন্ন পৌরসভায় বেতন বকেয়া পড়ছে। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম বলেন, অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগের ফলেই পৌরসভার কর্মীদের মাসের পর মাস বেতন-ভাতা বকেয়া থাকছে। অস্থায়ী ভিত্তিতে অতিরিক্ত লোকবল নিয়োগ না দিতে পৌর মেয়রদের বলা হয়েছে।

পৌরসভার কর্মকর্তা–কর্মচারীদের নিয়োগ হয় ১৯৯২ সালের পৌর কর্মকর্তা–কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী। তাতে বলা হয়েছে, পরিচ্ছন্নতাকর্মী (সুইপার), মালি ও মিকশ্চার মেশিন (রাস্তা নির্মাণের কাজে ব্যবহৃত) চালক পদে খণ্ডকালীন নিয়োগ দেওয়া যাবে। অন্য সব পদে সরাসরি, পদোন্নতি এবং বদলির মাধ্যমে স্থায়ী নিয়োগ দিতে হবে।

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ পৌরসভার সদ্য সাবেক মেয়র আতাউর রহমান তাঁর শ্যালিকা একতারুন্নেসাকে অস্থায়ী কর্মী হিসেবে নিয়োগ দেন। পরে টিকাদানকারী পদে তাঁকে স্থায়ী করা হয়।

এ বিষয়ে পৌরসভার বর্তমান মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মুকিতুর রহমান বলেন, সাবেক মেয়র তাঁর শ্যালক, শ্যালিকা ও ভায়রার ছেলেকে পৌরসভায় নিয়োগ দিয়ে গেছেন। কিছু ভুয়া নিয়োগও আছে, যাঁদের বেতন হয়, কাগজে–কলমে থাকলেও বাস্তবে অস্তিত্ব নেই।

গোবিন্দগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র আতাউর রহমান উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। এবার তিনি মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন পাননি। স্বজনদের নিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার কোনো ভাই–ব্রাদার পৌরসভায় চাকরি করে না। ক্ষমতায় থাকতে এসব প্রশ্ন উঠে নাই।’

পৌরসভার স্থায়ী কর্মকর্তা–কর্মচারীরা অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ ও তাঁদের দিয়ে দাপ্তরিক কাজ করানোর বিপক্ষে। বিপিএসএ সভাপতি আবদুল আলীম মোল্লা বলেন, ‘পৌরসভায় অস্থায়ী কর্মী নিয়োগে মেয়রদের অফুরন্ত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। নিয়োগ–বাণিজ্যের মাধ্যমে পুরোনো কর্মী ছাঁটাই করে নতুন কর্মী নিয়োগ করা হচ্ছে। পরিচ্ছন্নতাকর্মী পদে মেয়ররা স্নাতক–স্নাতকোত্তর পাস লোকজন নিয়োগ দিচ্ছেন। এসব কর্মীকে দিয়ে দাপ্তরিক কাজ চালানো হচ্ছে।’ তিনি বলেন, পৌরসভায় কর্মীদের নিয়োগের পুরো বিষয়টি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সরাসরি দায়িত্বে থাকা উচিত।

রংপুরের বদরগঞ্জ পৌরসভার ১০৬ জন কর্মীর মধ্যে ৬৯ জনই অস্থায়ী কর্মী। তাঁরা পৌরসভার বিভিন্ন শাখায় কাজ করেন। পৌরসভার পাঁচজন স্থায়ী কর্মী ও দুজন কাউন্সিলর নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, অস্থায়ী কর্মীর অধিকাংশের বাস্তবে কোনো প্রয়োজন নেই। ঘোরাফেরা করেই তাঁরা বেতন–ভাতা নেন। অস্থায়ী কর্মীরা আওয়ামী লীগদলীয় ও দলের অনুসারী। তবে পৌর মেয়র আহসানুল হক চৌধুরী বলেন, অস্থায়ী কর্মীদের প্রয়োজন আছে।

বিপিএসএর তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরা পৌরসভায় স্থায়ী কর্মী ৬২ জন। অস্থায়ী কর্মী ২২৫ জন। এই পৌরসভায় কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বেতন–ভাতা বকেয়া ৬ কোটি ২৯ লাখ টাকা। নাটোর পৌরসভার মোট ২৫৭ জন কর্মীর মধ্যে ২১৬ জন অস্থায়ী। এই পৌরসভার কর্মীদের বেতন–ভাতা পাঁচ মাস বকেয়া। বগুড়া পৌরসভার ৯০২ জন কর্মীর মধ্যে অস্থায়ী কর্মী ৮১২ জন। বাগেরহাট পৌরসভায় ৩২৭ জন কর্মীর মধ্যে অস্থায়ী কর্মী ২৪৯ জন। এই পৌরসভায় পাঁচ মাসের বেতন–ভাতা বকেয়া পড়েছে।

পৌরসভার মেয়র–কাউন্সিলরদের সংগঠন বাংলাদেশ পৌরসভা সমিতির নির্বাহী সভাপতি ও সাভার পৌরসভার মেয়র আবদুল গণি বলেন, পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগের বিষয়ে ধরাবাঁধা কোনো নিয়ম না থাকায় মেয়ররা নিজেদের মতো করেই নিয়োগ দেন। কোনো পৌর মেয়রের বিরুদ্ধে নিয়োগ নিয়ে অভিযোগ থাকলে মেয়রদের সংগঠনকে জানালে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের নজরদারি আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, পৌরসভাগুলোর স্থায়ী ও অস্থায়ী কর্মকর্তা–কর্মচারীর সংখ্যা, মাসিক বেতন–ভাতার পরিমাণ, বকেয়া বেতন–ভাতার তথ্য একটি সফটওয়্যারে হালনাগাদ করা হচ্ছে। এটি শেষ হলে পৌরসভার কর্মী সংখ্যার সার্বিক চিত্র পাওয়া যাবে। অন্যদিকে দেশের প্রথম শ্রেণির পৌরসভাগুলোতে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া শুরু হয়েছে। মন্ত্রণালয় বলছে, এর মাধ্যমে পৌরসভার কার্যক্রম গতিশীল হবে এবং স্বচ্ছতা আসবে।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ বলেন, ভাতিজা–ভাইসহ নানাজনকে নিয়োগ দিচ্ছেন পৌরসভার মেয়ররা। যখন এত নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তখন মন্ত্রণালয় কোনো প্রশ্ন তোলেনি। এসব নিয়োগে খরচের খাত বেড়ে গেছে। জনগণের টাকায় অপ্রয়োজনীয় লোকবলকে বেতন দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, পৌরসভার কর্মী নিয়োগের পুরো বিষয় মন্ত্রণালয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে হওয়া প্রয়োজন। আর যাঁরা অনিয়ম করে নিয়োগ দিয়েছেন, সেসব মেয়রের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয় চাইলে ব্যবস্থা নিতে পারে।

 

সূত্র: প্রথম আলো