মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের জমি বিক্রি করে এফডিআরের সিদ্ধান্ত!

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : গাজীপুর মহানগরের বোর্ডবাজারে অবস্থিত ইউনাইটেড টোব্যাকো কোম্পানির অনুকূলে ১ দশমিক ১০ একর জমি রয়েছে। জমির মূল মালিক বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট। এ জমিটি এখন সরকারের কাছে বিক্রি করে দিতে চায় তারা। সেজন্য জমির মৌজা ও বাজারমূল্য সংগ্রহ করেছে ট্রাস্টি বোর্ড। বর্তমানে খালি পড়ে থাকা জমিটির রেজিস্ট্রি ধরা হয়েছে ২৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ও বাজারমূল্য ৭৫ কোটি টাকা।

সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে কল্যাণ ট্রাস্টের পক্ষ থেকে অপ্রয়োজনীয় ও অব্যবহূত জমি বিক্রির বিষয়ে একটি প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়। সেখানে ট্রাস্টের মালিকানায় থাকা বেশকিছু প্রতিষ্ঠান ও স্থানের জমি বিক্রি করে সেই অর্থ ব্যাংকে এফডিআর করে রাখার সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, টঙ্গীতে বাংলাদেশ গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজ কোম্পানির অনুকূলে পড়ে আছে ১ দশমিক ৭৭ একর খালি জমি। যার রেজিস্ট্রি মূল্য ২৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ও বাজারমূল্য ১০০ কোটি টাকা। ট্রাস্টের হাজার কোটি টাকার ভূসম্পত্তি ফেলে রাখার পাশাপাশি শত কোটি টাকার সম্পত্তি ভাড়া দিয়ে সামান্য আয়ের ঘটনাও রয়েছে। তেজগাঁও শিল্প এলাকায় অবস্থিত মিমি চকোলেট লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানটিতে এক একর জমির বাজারমূল্য ১৫০ কোটি টাকা। অথচ জমিটি থেকে মাসে ১২ লাখ ২০ হাজার টাকা ভাড়া পাওয়া যায়। একই এলাকায় সিরকো সোপ অ্যান্ড কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের অনুকূলে থাকা দুই একর জমি থেকে মাসে ভাড়া আসে ১৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অথচ এ পরিমাণ জমির বাজারমূল্য ৩০০ কোটি টাকা।

এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি বোর্ডের সভায় তাদের মালিকানাধীন জমি বা সম্পত্তি বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তবে এ জমি সরকারি অফিস বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের জন্য সরকারের কাছেই বিক্রি করার বিষয়ে একমত হন বোর্ডের সদস্যরা। সভা থেকে সিদ্ধান্ত হয়, জমি বিক্রির অর্থ সরকারি ব্যাংকে স্থায়ী আমানত (এফডিআর) হিসেবে রাখা হবে। আমানত রাখার লভ্যাংশ থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বিশেষ করে শহীদ, খেতাবপ্রাপ্ত ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা বা তাদের পরিবারের কল্যাণে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে খরচ করা হবে। ট্রাস্টি বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের নির্বাহী কমিটির সভায় চারটি প্রতিষ্ঠানের জমি সরকারের কাছে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সেজন্য জমির মৌজাভিত্তিক রেজিস্ট্রি মূল্য ও সম্ভাব্য বাজারমূল্যও সংগ্রহ করা হয়। সেই প্রতিবেদনটি সম্প্রতি জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়। সংসদীয় কমিটির বৈঠকেও অপ্রয়োজনীয় ও অব্যবহূত জমি বিক্রির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়।

স্বাধীনতার পর পরই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে এ ট্রাস্ট গঠন করেন। শহীদ ও আহত মুক্তিযোদ্ধা পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের লক্ষ্যে নেয়া বিভিন্ন কার্যক্রমে অর্থায়নের জন্য শুরুতে ১৮টি শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ট্রাস্টের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বিভিন্ন সময়ে আরো বেশকিছু লাভজনক প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ট্রাস্টকে দেয়া হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট তার অধীনে দেয়া প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করে আয় করবে। সেই আয় দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের কর্মসংস্থান ও আর্থিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করবে। তবে পরিকল্পনা অনুযায়ী সেসব বাস্তবায়ন করা যায়নি। ব্যবস্থাপনার ঘাটতি ও দুর্নীতির কারণে বিভিন্ন সময় বন্ধও হয়ে যায় অনেক প্রতিষ্ঠান। ২০০২ সালে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় গঠনের পর মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টসহ এর আওতাধীন সব প্রতিষ্ঠান এ মন্ত্রণালয়ের অধীনে চলে যায়।

সংসদীয় কমিটির বৈঠকে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের সম্পত্তির তালিকাও জমা দেয়া হয়। সেখানে দেখা যায়, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, চট্টগ্রাম মিলিয়ে ট্রাস্টের জমি আছে প্রায় ৭০ একর। এর মধ্যে কেবল ৫ দশমিক ৮৭ একর জমি বিক্রির জন্য প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

এছাড়া অন্য যে সম্পত্তি আছে তার মধ্যে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের প্রধান কার্যালয়ের জমির পরিমাণ ১৩ শতক। এখানে পাঁচতলা ভবন রয়েছে, যা ভাড়া দিয়ে মাসে প্রায় সাড়ে ১০ লাখ টাকা পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে জমির রেজিস্ট্রি মূল্য ১৩ কোটি টাকা ও বাজারমূল্য ৭৮ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের মালিকানাধীন অন্য জায়গাগুলোর মধ্যে রয়েছে, তেজগাঁও শিল্প এলাকায় তাবানি বেভারেজের ১ একর জায়গা, মিরপুরে তাবানি বেভারেজ কোম্পানি লিমিটেডের অনুকূলে থাকা ৭ দশমিক ২৫ একর জায়গা, রাজধানী ও নিউ রাজধানী সুপার মার্কেটে হরদেও গ্লাস অ্যান্ড অ্যালুমিনিয়াম ওয়ার্কসের ৩ দশমিক ৮২ একর, ঢাকার কেএম দাস লেনে হরদেও গ্লাস অ্যান্ড অ্যালুমিনিয়ামের স্কুল বাড়িতে ১৪ শতক জমি, মোহাম্মদপুরে মুক্তিযোদ্ধা টাওয়ার-১-এ ৬৯ দশমিক ৭০ শতক জায়গা, চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় ইস্টার্ন কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের অনুকূলে ১০ একরের বেশি জায়গা, কিছু পাহাড়ি জমি, চট্টগ্রামের চট্টেশ্বরী রোডের দেলোয়ার পিকচার্সের ৬৫ দশমিক ৯৯ শতক জায়গা ইত্যাদি। এসবের কোথাও থেকে দোকান ভাড়া আসে, কোথাও বহুতল ভবন নির্মাণ হচ্ছে।

এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি শাজাহান খান বলেন, কল্যাণ ট্রাস্টের জমি বিক্রির বিষয়ে ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতামত নিয়ে তারপর সিদ্ধান্ত নিতে বলেছে সংসদীয় কমিটি।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কল্যাণ ট্রাস্টের হাতে বিপুল পরিমাণ ভূ-সম্পত্তি রয়েছে, যা দীর্ঘদিন অব্যবহূত অবস্থায় পড়ে আছে। অনেক জমি বেদখল হয়ে যাচ্ছে কিংবা বেদখলের পথে। সেসব জমি উদ্ধার করে কাজে লাগানোর জন্যও সংসদীয় কমিটির পক্ষ থেকে সুপারিশ করা হয়েছে।

 

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button