গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : কালীগঞ্জে স্বামী পরিত্যক্তা এক নারীকে (৪২) বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ ও মিথ্যে বিয়ের নাটক সাজিয়ে প্রতারণার ঘটনায় আইনি সহায়তা করতে জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) নির্দেশ দিলেও থানা থেকে আইনি কোন সহায়তাই পাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী নারীকে আইনি সহায়তা করতে গত ১২ (অক্টোবর) কালীগঞ্জ থানার ওসিকে নির্দেশনা দেন গাজীপুরের পুলিশ সুপার। এরপর প্রায় এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও ভুক্তভোগীর দায়ের করা (এজাহার) মামলা এখনো নথিভুক্ত বা আসামি গ্রেফতার করেনি পুলিশ।
অভিযুক্তরা হলো, নরসিংদীর পলাশ উপজেলার মাতিচর এলাকার মৃত আমান উল্লার ছেলে নয়ন মিয়া (৪৫) এবং সহযোগী কালীগঞ্জের তুমুলিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ সোম এলাকার আব্দুল সাত্তারের মাওলানার ছেলে আবু তাহের কাজী।
নয়ন মিয়া বর্তমানে কালীগঞ্জ পৌরসভার মুনশুরপুর এলাকায় পরিবার নিয়ে ভাড়া বাসায় থেকে কালীগঞ্জ বাজারে সবজি ও ফলের ব্যবসা পরিচালনা করেন।
ভুক্তভোগী স্বামী পরিত্যক্তা নারী কালীগঞ্জের মুনশুরপুর এলাকার বাসিন্দা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ রয়েছে, সম্প্রতি কালীগঞ্জ থানায় ধর্ষণ, ডাকাতি, নারী নির্যাতন, চাঁদাদাবী ও হামলাসহ বেশ কিছু ঘটনায় থানায় এজাহার দায়ের করেও আইনি সহায়তা পাচ্ছে না ভুক্তভোগীরা। গুরুতর এসব ঘটনায় থানায় এজাহার দায়ের করে দিনের পর দিন পুলিশের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোন সেবাই পাচ্ছে না ভুক্তভোগীরা।
জানা গেছে, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ ও মিথ্যে বিয়ের নাটক সাজিয়ে প্রতারণার ঘটনায় স্বামী পরিত্যক্তা ওই নারী গত ৬ অক্টোবর প্রথমে কালীগঞ্জ থানায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে এজাহার দায়ের করেন। প্রতিকার না পেয়ে ভুক্তভোগী গত ১২ অক্টোবর গাজীপুরের জেলা পুলিশ সুপারের (এসপি) কাছে গেলে ঘটনার অনুসন্ধান পূর্বক আইনী ব্যবস্থা নিতে কালীগঞ্জ থানার ওসিকে নির্দেশ দেন এসপি।

থানায় দায়ের করা এজাহার ও পুলিশ সুপার কার্যালয়ে করা অভিযোগে ভুক্তভোগী উল্লেখ করেন, ১১ বছর পূর্বে ভুক্তভোগীর স্বামী তাকে ডিভোর্স (তালাক) দেন। পরবর্তীতে তিনি পিতার বাড়িতে বসবাস করে একটি এনজিও’তে কাজ নেয়। আনুমানিক ৮ বছর পূর্বে এনজিওতে কাজের সুবাদে অভিযুক্ত নয়ন মিয়ার সঙ্গে পরিচয় হয়। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। এরপর বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে নয়ন মিয়া ভুক্তভোগীর সঙ্গে যৌন সম্পর্কে (ধর্ষণ) লিপ্ত। পরে বিভিন্ন সময় ভুক্তভোগীর কাছ থেকে ব্যবসার কথা বলে নয়ন মিয়া চার-পাঁচ লাখ টাকা নেয়। এরপর ২০২০ সালের ১১ নভেম্বর তুমুলিয়া ইউনিয়নের নিকাহ রেজিস্টার আবু তাহের কাজীর বাড়িতে নয়ন মিয়ার সঙ্গে ভুক্তভোগী বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। পরে তারা দু’জন স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ভাঙ্গাল হাওলা গ্রামের কনক মিয়ার বাড়িতে ভাড়া বাসায় বসবাস করতে থাকেন। ওই বাসায় চার-পাঁচ মাস বসবাস করার পর নয়ন মিয়া ভুক্তভোগীকে নিয়ে পূবাইল থানার মিরের বাজার এলাকায় মৃত আরমানের বাড়িতে ভাড়া বাসায় স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে বসবাস করতে থাকে। সম্প্রতি নয়ন মিয়া ভুক্তভোগীকে স্ত্রীর মর্যাদা দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
ভুক্তভোগী নারী বলেন, থানায় অভিযোগ দায়ের করার পর অভিযুক্তদের আটক করে থানায় নিয়ে রাতভর দরবার করে অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। এরপর থেকে অভিযুক্তরা আমাকে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে ও হত্যার হুমকি দিচ্ছে। বিষয়টি পুলিশকে জানিয়েও কোন প্রতিকার পাইনি। পরে গত ১২ অক্টোবর গাজীপুরে গিয়ে এসপি স্যারের সঙ্গে দেখা করে ঘটনার বিস্তারিত জানাই। সে সময় এসপি স্যার কালীগঞ্জ থানার ওসিকে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন। এরপর থেকে পুলিশের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও এখনো কোন প্রতিকার পাইনি। আসামিরা এলাকায় প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করছে।
তিনি আরো বলেন, পুলিশ আসামিদের আটক না করে উল্টো গত রোববার রাতে আমাকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। পরে সোমবার সকালে আমাকে আদালতে পাঠানো হয়। এরপর ওইদিন বিকলে আমি জামিনে মুক্তি পেয়েছি।
ঘটনার তদন্তের দায়িত্ব থাকা কালীগঞ্জ থানার পরিদর্শক (অপারেশন) কায়সার আহমেদ বলেন, অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব পেয়ে ঘটনার বিস্তারিত অনুসন্ধান করে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেয়ার জন্য অবহিত করা হয়েছে। এখনো মামলা নথিভুক্ত করা হয়নি। অন্য আর কোন বিষয়ে জানা নেই।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের একটি সিআর মামলায় (৬৯/১৯) গত ১২ অক্টোবর স্বামী পরিত্যক্তা ওই নারীর নামে একটি গ্রেফতারি পরোয়ানা থানায় যায়। এরপরও ভুক্তভোগী ওই নারী কয়েকদিন থানায় গেলেও তাকে গ্রেফতার করেনি পুলিশ। পরবর্তীতে গত রোববার দিবাগত মধ্যে রাতে ওই নারীকে গ্রেফতার করে সোমবার আদালতে পাঠায় থানা পুলিশ।
সার্বিক বিষয়ে জানতে কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আনিসুর রহমানের ব্যবহৃত সরকারি মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইন গবেষক ও আইনগ্রন্থ প্রণেতা সিরাজ প্রামাণিক জানান, থানায় কোন অভিযোগকারী ব্যক্তি অভিযোগ দায়ের করলে তা প্রত্যাখ্যান করার এখতিয়ার আমাদের দেশের বিদ্যমান ও বর্তমান কোন আইনে নেই। পুলিশ স্টেশন বা থানায় মামলা বা অভিযোগ দায়েরের কথা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৪ ধারায় উল্লেখ থাকলেও পুলিশ বাহিনীর বাইবেল বলে পরিচিত পুলিশ রেগুলেশন্স বেঙ্গল- ১৯৪৩ (পি আর বি)-এর ২৪৪ নম্বর প্রবিধানে অভিযোগ গ্রহণ করার বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে বলা হয়েছে। পিআরবি-এর ২৪৪ (ক) প্রবিধানে পরিস্কারভাবে বলা হয়েছে- ‘আমলযোগ্য প্রত্যেক অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশের সামনে প্রদত্ত প্রথম তথ্য রেকর্ড করতে হবে সেটা প্রাথমিকভাবে সত্য হোক বা মিথ্যা হোক কিংবা গুরুতর হোক বা ক্ষুদ্র হোক অথবা দন্ডবিধি বা অন্য কোন স্পেশাল বা আঞ্চলিক আইনের অধীন শাস্তিযোগ্য যাহাই হোক না কেন। পিআরবি এর এই প্রবিধানে মামলা গ্রহণ বা রেকর্ড করার বাধ্যবাধকতায় শব্দ ‘বাধ্য’ ব্যবহার করা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, থানায় মামলা না নেয়ায় পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে যে শাস্তি হতে পারে তা পুলিশ আইন ১৮৬১ এর ২৯ নম্বর ধারায় পরিস্কারভাবে উল্লেখ আছে। সেখানে বলা আছে, কোন পুলিশ কর্মচারী যদি কোন নিয়ম বা রেগুলেশন স্বেচ্ছাকৃত ভাবে অমান্য করে বা গাফিলতি এবং পূর্ণভাবে তা পালনে শৈথিল্য করা; তবে তাকে বিচারার্থে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে সোপর্দ করা চলবে এবং বিচারে অপরাধী প্রমাণিত হলে ৩ মাসের বেতনের সমপরিমাণ জরিমানা অথবা তিন মাস পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদন্ড অথবা উভয়বিধ দন্ড হতে পারে।
আরো জানতে…….
কালীগঞ্জ থানায় এজাহার দায়ের করেও ‘পুলিশী সেবা’ বঞ্চিত ভুক্তভোগীরা!