ভারতের প্রথম মসজিদ ও তুহফাৎ উল মুজাহিদিন
শানজিদ অর্ণব : কেরালার ইতিহাস নিয়ে কোনো কেরালাবাসীর রচিত প্রথম গ্রন্থের নাম তুহফাৎ উল মুজাহিদিন। লেখকের নাম শেখ জায়েনউদ্দিন মাখদুম বা জায়েনউদ্দিন মালিবারি। ষোড়শ শতাব্দীর শেষ ভাগে বইটি লেখা হয়েছিল আরবি ভাষায়। বিষয়বস্তু ছিল কেরালার মাপিলা মুসলমান ও পর্তুগিজ শক্তির মধ্যকার সংঘাত। এ অঞ্চলে আসা পর্তুগিজরা আধিপত্য বিস্তার করতে চাইছিল, আর তাতেই প্রতিরোধ শুরু করে স্থানীয় মাপিলারা। জায়েনউদ্দিন এ ইতিহাসই বিধৃত করেছেন তার বইতে।
জায়েনউদ্দিন তার গ্রন্থ উৎসর্গ করেছিলেন বিজাপুরের সুলতান আদিল শাহকে। তুহফাৎ উল মুজাহিদিন চার ভাগে বিভক্ত—প্রথম অংশে আছে ইসলামে জিহাদের ধারণা নিয়ে আলাপ, দ্বিতীয়াংশে আছে মালাবারে মুসলিম অধিবাসীদের ইতিহাস। এরপর আছে সে সময় মালাবারের হিন্দুদের বিবরণী এবং চতুর্থ ও শেষ অধ্যায়ে জায়েনউদ্দিন বর্ণনা করেছেন সে সময় পর্তুগিজ ও মুসলিমদের সংঘাত। পর্তুগিজদের এ অঞ্চলে আগমন থেকে শুরু করে ১৫৭১-এর চালিয়ামের লড়াই পর্যন্ত বর্ণিত হয়েছে এ আখ্যান।
জায়েনউদ্দিন মালাবারের পূর্বপুরুষরা ছিলেন ইয়েমেনের অধিবাসী। তিনি নিজে ছিলেন মালাবারের একজন মুসলিম কাজী। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন কেরালার পোন্নামে, ১৫৩২ সালে। এই পোন্নামকে বলা হতো ‘মালাবারের মক্কা’। এ থেকে বোঝা যায় স্থানটি কেরালার মুসলিমদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। জায়েনউদ্দিন তুহফাৎ উল মুজাহিদিন লিখেছিলেন ১৫৮৩ সালে, বইটি লেখার পেছনে পর্তুগিজদের প্রতিরোধে স্থানীয় মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করার উদ্দেশ্য ছিল তার। আরবের সঙ্গে পোন্নামের যোগাযোগ ছিল অনেক পুরনো। জয়েনউদ্দিনের পরিবার এখানে এসেছিল পঞ্চদশ শতাব্দীতে। মালাবার ও করোমানডেল উপকূলে মুসলমানরা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, অভিবাসন, ধর্মান্তর, বিয়ে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির ইতিহাস তৈরি করে। অমুসলিমদের সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেত্রে আদান-প্রদান সত্ত্বেও এখানকার মুসলমানরা তাদের ধর্মীয়, সামাজিক জীবনকে দেয়াল ঘেরা দিয়ে রেখেছিলেন। অমুসলিম রাজাদের অধীনেও মুসলিম সমাজ বিকশিত হতে থাকে। সমুদ্রের রাজা বা সাগরের শাসক ছিলেন এমনই এক শাসক। তিনি তার অধীনে থাকা মুসলিম জনগণ ও বণিকদের উপযুক্ত মূল্যায়ন করেছিলেন। তার এমন নীতির কারণে কেরালায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিকশিত হচ্ছিল। এমন এক পরিস্থিতিতে এ অঞ্চলে হাজির হয় পর্তুগিজরা। তারা মুসলিম বণিক, তাদের পৃষ্ঠপোষক শাসক ও নেটওয়ার্ক উচ্ছেদ করে উপকূলে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে উদ্যোগী হয়। মালাবার উপকূলের দামি পণ্য গোলমরিচ ইউরোপের বাজারে নিতে পর্তুগিজরাই ছিল মাধ্যম। কোচিনের শাসকের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে তারা মুসলিম ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের ওপর হামলা শুরু করে।
তুহফাৎ উল মুজাহিদিনে সে সময় স্থানীয় অমুসলিমদের জীবন, রীতি-নীতির চিত্তাকর্ষক বর্ণনা পাওয়া যায়। এসবের মাধ্যমে এটি কেরালার স্থানীয় ইতিহাসের প্রথম ও মূল্যবান লিখিত দলিল হয়ে উঠেছে। গ্রন্থে জয়েনউদ্দিন লিখেছেন, ‘প্রাচীনকাল থেকে অদ্যাবধি মালাবারের সেরা ও সবচেয়ে বিখ্যাত বন্দর হচ্ছে কালিকট। কিন্তু পর্তুগিজদের আগমনের পর থেকে এ বন্দর দুর্বল ও দৈন্যদশায় পতিত হয়েছে। তারা স্থানীয় বণিকদের চলাচল বাধাগ্রস্ত করেছে। পুরো মালাবার অঞ্চলে কোনো শক্তিশালী মুসলিম শাসক নেই। তাদের শাসকরা অমুসলিম। তারাই মুসলমানদের কর্মকাণ্ড, সমাজ জীবনকে নজরদারি করেন। তার পরও এখানে মুসলমানরা সম্মান পায় এবং তাদের শক্তিও আছে। কারণ শহরের বেশির ভাগ ভালো বাড়ি মুসলমানদের। শুক্রবারে মুসলমানরা জুমার নামাজ পড়ে এবং বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবও পালন করতে পারে। মুসলমানদের নিজস্ব কাজি আছেন যারা সম্প্রদায়ের মধ্যে ইসলামী আইনে বিচার করেন। আছেন মুয়াজ্জিন, তিনি নামাজের জন্য সবাইকে আহ্বান করেন।’
স্থানীয় অমুসলিম বা হিন্দুদের নানা রীতি-নীতির বিবরণ আছে তুহফাৎ উল মুজাহিদিনে। যুদ্ধে মালাবার অঞ্চলের কোনো গোষ্ঠীর নেতা নিহত হলে তার বাহিনীর সদস্যরা নিজেরা মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেত। তাদের একমাত্র লক্ষ্য থাকত যে করে হোক প্রতিপক্ষকে মাটিতে মিশিয়ে দিতে হবে। যুদ্ধে এরা কোনো ছলচাতুরীকে ঘৃণা করত। লড়াই হতো ঘোষণা দিয়ে এবং প্রকাশ্যে।
ব্রাহ্মণ কিংবা নায়ারদের পরিবারে কোনো প্রবীণ মারা গেলে তারা এক বছর নারীসঙ্গ, মাংস ও তামাক থেকে দূরে থাকত। চুল ও নখও কাটত না। এ নিয়মের ব্যত্যয় দেখা যেত না সচরাচর।
চেরামান জুমা মসজিদ
আরবের বণিকরা মালাবার উপকূলে বসতি গেড়েছিলেন আরবে ইসলামের আবির্ভাবের আগেই। এর প্রমাণও আছে। প্রাক-ইসলামী যুগের কবি ইমরুল কায়েস হরিণের মলের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন গোলমরিচকে। অর্থাৎ আরবে তখন গোলমরিচের উপস্থিতি ছিল। কিন্তু কেরালা ছাড়া দুনিয়ার আর কোথাও তখন গোলামরিচের চাষ ছিল না। তাই বোঝা যায়, আরব বণিকরাই এ দুর্দান্ত মসলাটি মালাবার উপকূল থেকে আরবে নিয়ে গিয়েছিল।
এ আরবদের হাত ধরেই ইসলাম প্রবেশ করে ভারতের কেরালায়। এখানেই স্থাপিত হয় ভারত উপমহাদেশের প্রথম মসজিদ। সেখানকার হিন্দু চেরা রাজবংশের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত হয়েছিল সে মসজিদ। উত্তর ভারতে ইসলামের আগমনের ইতিহাস থেকে দক্ষিণের ধরনটি ভিন্ন। শুধু মসজিদ নির্মাণই নয়, চেরা রাজবংশের শেষ রাজা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।
আরবে ইসলাম ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে থেকেই ভারতের সঙ্গে আরবদের যোগাযোগ ছিল। ভারতে আরবদের আগমণের প্রধান কারণ বাণিজ্য। ভারতে আরবদের পত্তনীর মূল কেন্দ্র ছিল কেরালা। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, প্রাচীন কেরালার মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা কেরালার প্রতি আরবদের বাড়তি আকর্ষণ জুগিয়েছিল। এরপর আরবে ইসলামের প্রসার ঘটলে মসৃণভাবেই তা আরবদের মাধ্যমে কেরালায় প্রবেশ করে। এ সময় আরব মুসলমান ও স্থানীয়দের মধ্যে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। আর এ সম্পর্কের প্রমাণ হিসেবে গবেষকরা তুলে ধরেন কেরালার ক্র্যাংগানোরে ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে মসজিদ নির্মাণের ঘটনা। ভারতবর্ষে নির্মিত এটিই প্রথম মসজিদ।
গবেষকদের অনেকের মতে, ভারতে ইসলাম যে তলোয়ার বা সামরিক অভিযানের মাধ্যমে প্রবেশ করেনি, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন এ মসজিদ। মসজিদটির নাম চেরামান জুমা মসজিদ। এগারো শতকে মসজিদটি পুনর্নির্মিত হয়। মসজিদটির নির্মাণ নিয়ে দুই ধরনের কাহিনী প্রচলিত আছে। প্রথম ধারণামতে, ইসলাম আরবে প্রতিষ্ঠা হওয়ার আগেই ভারতের মালাবার উপকূলে আরব বণিকরা বসতি ও যোগাযোগ স্থাপন করেছিল। এদের মাধ্যমেই ইসলাম এ অঞ্চলে আসে। সে সময় মালাবার উপকূল অঞ্চলের শাসক ছিল চেরা রাজবংশ, যারা পেরুমল নামে পরিচিত। পেরুমলরা বিদেশি তথা আরবদের প্রতি উদার ছিলেন। কোনো এক পেরুমল রাজার পৃষ্ঠপোষকতায়ই এ অঞ্চলের মুসলমানরা চেরামান জুমা মসজিদটি নির্মাণ করেছিল বলে ধারণা করা হয়। এজন্যই মসজিদটির নাম চেরামান জুমা মসজিদ। উল্লেখ্য, পেরুমলদের শেষ রাজা চেরামান পেরুমল ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং শেষ জীবনে মক্কা চলে গিয়েছিলেন।
চেরামানের অনুরোধে তাকে ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান দিতে আরব থেকে ২০ জন সহচর নিয়ে কেরালায় আসেন মালিক ইবন দিনার। বলা হয় চেরামান মক্কা যাত্রা করেছিলেন ৮২৫ খ্রিস্টাব্দে। এ মত অনুসারে চেরামান কেরালায় ভারতের প্রথম মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন, এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এটি অন্য কোনো পেরুমল রাজার পৃষ্ঠপোষকতায়ও হতে পারে।
অন্য একটি মত অনুসারে, পেরুমলদের শেষ রাজা চেরামান পেরুমলই কেরালায় ভারতের প্রথম মসজিদটি নির্মাণ করিয়েছিলেন। এ মত অনুসারে, চেরামান ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে মক্কা যান এবং সেখানে গিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। নতুন নাম নেন থাজুদিন। মক্কা থেকে দেশে ফেরার পথে তিনি মারা যান। মৃত্যুর আগে তিনি মালিক বিন দিনারকে নিজ হাতে লেখা একটি চিঠি দিয়েছিলেন। দিনার তার সহযাত্রীদের নিয়ে কোদুনগাল্লুর পৌঁছেন এবং স্থানীয় শাসককে পেরুমলের হাতে লেখা চিঠিটি দেখান। চিঠিতে ছিল ইসলাম ধর্ম গ্রহণ এবং এ নতুন ধর্ম নিয়ে পেরুমলের অভিজ্ঞতার বিবরণী। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় শাসক দিনারকে মসজিদ নির্মাণের অনুমতি দেন। তিনিই এ মসজিদের ইমাম হিসেবে দায়িত্ব নেন। একসময় দিনার আরবে ফিরে যান এবং মসজিদের দায়িত্ব দিয়ে যান ভাইপো হাবিব বিন মালিককে।
মসজিদটিতে একটি সাদা মার্বেল পাথরের ব্লক আছে। মনে করা হয়, এটি মক্কা থেকে আনা হয়েছিল। মসজিদটি নির্মিত হয়েছে হিন্দু স্থাপত্য রীতি অনুসরণে। এ মসজিদে একটি প্রাচীন প্রদীপ আছে, যা সবসময় জ্বালিয়ে রাখা হয়। সব ধর্মের মানুষই এ প্রদীপের জন্য তেল দান করেন। কেরালার বেশির ভাগ মসজিদের মতো এ মসজিদেও অন্য ধর্মাবলম্বীরা প্রবেশ করতে পারেন। প্রচলিত আছে, প্রদীপটির বয়স প্রায় এক হাজার বছর। সকালে এ মসজিদে হাজির হয় বিভিন্ন ধর্মের মানুষ। স্থানীয় হিন্দু কিংবা খ্রিস্টানরাও আসে এ মসজিদে।
কেরালায় আগত আরব মুসলিম ও স্থানীয় নারীদের বিয়ের পরিপ্রেক্ষিতে যে নতুন প্রজন্ম তৈরি হয়, তারা মোপলা বা মাপিলা নামে পরিচিত। স্থানীয় হিন্দু শাসকরা আরব মুসলিমদের কদর করতেন। তাদের মাধ্যমে আরবের ঘোড়া সংগ্রহ করতেন এবং নিজেদের অশ্বারোহী বাহিনীতে নিয়োগ দিতেন। দশম শতকের আরব আল-ইশকাখরি ভারতে এসেছিলেন। তিনি তার বিবরণীতে কেরালায় মুসলিম ও জুমা মসজিদের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন। পরিব্রাজক আল মাসুদী ও ইবনে বতুতাও একই রকম উল্লেখ করেছেন। এগারো শতকে এক তুর্কি অভিজাত নাথাদ ভালি এ অঞ্চলে ধর্ম প্রচার করেছেন। তার সমাধি আছে কেরালায়। ইবনে বতুতার বিবরণীতে পাওয়া যায় তৃতীয় হোয়সালা বাল্লালার সেনাদলে ২০ হাজার মুসলিম সেনা ছিল। দুয়ার্তে বারবোসা জানিয়েছেন, ষোল শতকের শুরুতে মালাবারের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ ছিল মুসলিম।
শানজিদ অর্ণব: লেখক ও সাংবাদিক



