নতুন করে সংঘবদ্ধ হচ্ছে জেএমবি সদস্যরা!

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : গেল বছরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানের ফলে দেশে জঙ্গি তৎপরতা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছিল। কিন্তু বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে জঙ্গি তৎপরতা দেখা গেছে। অভিযানগুলোতে প্রায়ই পুরনো ধারার জেএমবি সদস্যরা নিজেদের আরও শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে নতুন করে সংঘবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছে। তারা মনে করে তাদের সাংগঠনিক ক্ষমতা, অর্থনৈতিক সাপোর্ট, শিক্ষা, দক্ষতাও অন্যান্য জঙ্গি সংগঠন থেকে ভিন্ন। তারা নতুন গ্রুপ সংগঠিত করে সদস্য সংগ্রহের কাজ পরিচালনা করে। একটি গ্রুপ সংগঠিত হতে হলে বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হয়। এ কারণে মাঝে মাঝে ব্যাংক ডাকাতির পরিকল্পনাও করে এই সদস্যরা। র‌্যাবের তথ্য মতে, পুরনো ধারার জঙ্গি সদস্যদের ধীরে ধীরে খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

তারা নতুন করে সংঘবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছে। পুরনো ধারার জেএমবির ১৫শ’র অধিক সদস্য বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তার হয়েছে। এ পর্যন্ত জঙ্গি সংগঠনের ২৬শ’র অধিক সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

অপরাধ ও সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে, দেশে জঙ্গি সংগঠনগুলো ধর্ম এবং রাজনীতিকে পুঁজি করে চলে। তারা ধর্মকে পুঁজি করে রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। জঙ্গি সংগঠনগুলোর মূল উদ্দেশ্য রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করা। জঙ্গি সংগঠনগুলো পরিচালনা করতে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের বয়স, মেধা এবং অভাব-অনটনকে কাজে লাগিয়ে থাকে। এক সময় মনে করা হতো যে, শুধু নিম্ন আয়ের মানুষগুলো ধার্মান্ধ মতাদর্শের শিকার হচ্ছে তা নয়, একটি গোষ্ঠী এখন কৌশলগতভাবে উচ্চবিত্ত ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের টার্গেট করছে। তাদেরকে টার্গেট করার মানে হলো তারা তাদের একটি অবস্থান জানান দিতে চায়। তারা দেখাতে চায় উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীয় তাদের সঙ্গে আছে।

বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে যাদের বিভিন্ন সংকট ও অভাব রয়েছে তাদের পার্ট টাইম চাকরি ও টিউশনির ব্যবস্থা করে দিয়ে তাদের এই মতাদর্শের মধ্যে নিয়ে আসে গত বছরের ৩১শে অক্টোবর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের ৫ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে এন্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ)। ঢাকার শেরেবাংলা নগর ও কেরানীগঞ্জ এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে ৬টি মোবাইল ও ৭টি উগ্রবাদী বই জব্দ করা হয়।

এন্টি টেরোরিজম ইউনিটের (এটিইউ) তথ্য মতে, গ্রেপ্তারকৃতরা অনলাইনে উগ্রবাদ প্রচারণাসহ রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশে খিলাফত প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। তারা সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্মীয় উগ্রবাদী মতাদর্শ প্রচার ও আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং নাশকতার জন্য পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতি নেয়ার জন্য সিকিউরড টেলিগ্রাম গ্রুপ খুলে নিজেদের মধ্যে চ্যাটিং চালিয়ে যাচ্ছিল।

এদিকে নীলফামারীর সোনারায়ে ৪ঠা ডিসেম্বর র‌্যাবের অভিযানে ৫ জঙ্গি সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। সোনারায়ের মাঝপাড়ার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে একটি শক্তিশালী বোমা, বোমা তৈরির সরঞ্জাম, বিস্ফোরক, পিস্তল, ম্যাগাজিন ও গুলি উদ্ধার করা হয়। সোনারায় ও সংগলশী ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে নীলফামারী সদর থানায় মামলা দায়ের করেন র‌্যাব-১৩। রাজধানীর আদাবরে গত ১২ই জুন নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের দাওয়াতি শাখার দুই সক্রিয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। গ্রেপ্তারকৃতরা নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্র জঙ্গিবাদী বই ও প্রচারপত্র বিলি করে নতুন সদস্য দলভুক্ত করাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। মাসিক ভিত্তিতে সংগঠনের জন্য চাঁদা সংগ্রহ করতো।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, নতুন বছরকে ঘিরে দেশে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো জঙ্গি হামলা বা তৎপরতার সরাসরি আমাদের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। কিন্তু বছর শুরুর প্রোগ্রামকে ঘিরে বিশ্বব্যাপী জঙ্গিরা বিভিন্ন ধরনের হামলার একটি ভয়ভীতি প্রদর্শন করেছিল বিভিন্ন সাইট বা তাদের নিজস্ব সাইটে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার রাখা হয়েছিল। কোনো ধরনের হামলার আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না। আমরা তথ্যের ভিত্তিতে নিরাপত্তা জোরদার রেখেছিলাম। এখন পর্যন্ত এ বছরকে ঘিরে জঙ্গি হামলা বা তৎপরতার সরাসরি কোনো তথ্য পাইনি। দেশে যারা জঙ্গি সংগঠন রয়েছে তাদের মধ্যে জেএমবি হলো সবচেয়ে পুরনো সংগঠন।

তিনি আরও বলেন, ময়মনসিংহের একটি অভিযানে দেখা গিয়েছে জেএমবির পুরাতন সদস্যরা তারা আবার নতুন করে সংঘবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছে। একটি সংগঠনকে শক্তিশালী করতে হলে তাদের অর্থের প্রয়োজন হয়। তারা ভাবছে কাজ করতে গেলে সাইবার ওয়ার্ল্ড, অনলাইন অ্যাক্টিভিটিস, আইটি সেক্টরের প্রয়োজন আছে। সেজন্য নতুনদেরকে নিয়ে সংঘঠিত হওয়ার চেষ্টা করছিল। তাদের প্রধান সমস্যা হলো অর্থ। গত বছরের মাঝমাঝি একটি অভিযান পরিচালনা করা হয়। তখন তারা সংঘবদ্ধ হয়ে একটি ব্যাংক ডাকাতির প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। সেখান থেকে অর্থ সংগ্রহ করে সংগঠনগুলোকে অর্থ দেয়া ও শক্তিশালী করে গড়ে তোলার উদ্দেশ্য ছিল। পরবর্তীতে লালমনিরহাটে একটি অভিযান করা হয় সেখানেও জেএমবির সদস্য পাওয়া যায়। তারা পলাতক ছিল বা জেল থেকে বেড়িয়েছে। তারা নাশকতা তৈরির জন্য বোমা তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। জানা যায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা জনসমাগমের মতো একটা জায়গায় তারা হামলার পরিকল্পনা করেছিল। এই নাশকতার মধ্যে তাদের অবস্থান জানান দেয়ার কৌশল ছিল এটা। দুইটা বড় অভিযানে জেএমবির সদস্যদের পাওয়া গেছে। এ ছাড়াও বিভিন্ন সংগঠনগুলোকে সন্দেহজনকভাবে পাওয়া যাচ্ছে। তাদেরকে গ্রেপ্তার ছাড়াও অন্যান্য সংগঠনের সদস্যদেরও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুরনো ধারার জঙ্গি সদস্য এই পর্যন্ত জেএমবির ১৫শ’র অধিক সদস্যকে বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার করেছি। মোট জঙ্গি সংগঠনের ২৬শ’র অধিক সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

র‌্যাবের সূত্রে জানা যায়, জঙ্গি তৎপরতা কমে গেছে এটা ভাবা ঠিক না। জেএমবি সংক্রান্ত দুইটি অভিযান হয়েছে বছরের শেষের দিকে এবং মাঝামাঝি সময়ে। বছর জুড়েই জঙ্গিদের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। জঙ্গি দমনে সাইবার ইউনিটে মনিটরিং অনেক বাড়ানো হয়েছে। যাদের সম্পর্কে আমরা তথ্য পেয়েছি বা যাদেরকে বিভিন্ন সময় সংঘবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছে তাদের বিরুদ্ধে আমাদের সব ধরনের নজরদারি চলমান রয়েছে। যাদেরকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে তারা সবাই যেকোনো বয়সী। তবে শিক্ষিতদের সংখ্যা বেশি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, দেশে জঙ্গি হামলার ইতিহাসগুলোর প্রেক্ষাপটে বলা যায়, ধর্মকে পুঁজি করে বা ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে সমাজে বা রাজনীতিতে একটি অস্থির অবস্থা তৈরি করা। দেশের উন্নয়নকে পিছনের দিকে নিয়ে যেতে চায় যারা তারা জঙ্গি হামলাগুলো পরিচালনা করছে। জঙ্গি হামলাকে আমরা হামলার চেয়ে একধরনের মতাদর্শী অপশক্তি বলে থাকি। যখন একজন ব্যক্তি ও পরিবারকে আর্দশিকভাবে ধ্বংসমূলক মতাদর্শে ধাবিত করা যায় এটি তারা সংগঠিতভাবেই করে। তরুণ বয়সীদের জঙ্গি সংগঠনগুলো বেশি টার্গেট করে। জঙ্গি সংগঠনগুলো পরিচালনা করতে তরুণদের বয়স, মেধা এবং অভাবকে কাজে লাগায়। এক সময় মনে করা হতো নিম্ন আয়ের মানুষগুলো শুধু ধার্মান্ধের মতাদর্শের শিকার হচ্ছে তা নয়। একটি গোষ্ঠী তাদের কৌশলগতভাবে উচ্চবিত্ত ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের যুক্ত করছে। এই টার্গেটের মানে হলো তাদের অবস্থান জানান দেয়া। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে যাদের বিভিন্ন সংকট ও অভাব রয়েছে তাদের পার্ট টাইম চাকরি, টিউশনির ব্যবস্থা করে দিয়ে এই মতাদর্শের মধ্যে নিয়ে আসে।

 

সূত্র: মানবজমিন