মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি কি জাতিসংঘে গুরুত্ব পাবে?

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : ডিসেম্বরে ব়্যাব-পুলিশের সাত শীর্ষ কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার পর মানবাধিকার সংঠনগুলোর এই দাবির জবাব দেয়ার প্রস্তুতি আগেই শুরু করেছে বাংলাদেশ।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো গত ৮ নভেম্বর জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারিকে এই চিঠি পাঠালেও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ওয়েবসাইটে তা প্রকাশ করা হয়েছে বৃহস্পতিবার। তবে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে এখনো তাদের এই চিঠির কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়া হয়নি।

শান্তিরক্ষা মিশনে র‌্যাবকে নিষিদ্ধের দাবি জানিয়ে চিঠিতে দাবি করা হয়েছে, জাতিসংঘের ২০১২ সালের ‘পলিসি অন হিউম্যান রাইটস স্ক্রিনিং অব ইউনাটেড ন্যাশন পারসোনেল’ বাংলাদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে না।

২০০৪ সালে র‌্যাব গঠিত হওয়ার পর থেকে ইউনিটের সদস্যদের মাধ্যমে বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন এবং জোরপূর্বক গুম করার ধারাবাহিক ও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ থাকার পরও যেসব ব্যক্তি র‌্যাবের সঙ্গে কাজ করেছেন তাদের জাতিসংঘ মিশনে পাঠানো হচ্ছে।

চিঠিতে আরো বলা হয়, ২০২১ সালের মার্চে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল ব্যাচেলেট উল্লেখ করেছেন, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ানের দ্বারা নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তি মিশনে শীর্ষ সেনা ও পুলিশ মোতায়েনকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়৷ ২০২০ সালে বাংলাদেশ বিভিন্ন মিশনে ছয় হাজার ৭৩১ জন ইউনিফর্মধারী কর্মী মোতায়েন করে সর্বোচ্চ অবদান রাখে।

জবাব দেয়ার প্রস্তুতি

বাংলাদেশ অবশ্য এই চিঠি প্রকাশ হওয়ার আগেই এইসব অভিযোগের জবাব দিতে ১৪টি মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানকে তৎপর করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ওই সব মন্ত্রণালয়কে তথ্য দেয়ার জন্য চিঠি দেয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২২ সালের বিশ্ব মানবাধিকার পরিস্থিতির প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে তথ্য সংগ্রহ শুরু করে। চিঠিতে বলা হয়েছে, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ওপর একটি চ্যাপ্টার আছে। তাতে বিভিন্ন ইস্যুতে বেশ কিছু অভিযোগ করা হয়েছে। এইসব অভিযোগের জবাব দিতে তথ্য প্রয়োজন। চিঠিতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মানবাধিকার প্রতিবেদনের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারটি সংযুক্ত করা হয়েছে।

চিঠিটি স্বরাষ্ট্র, স্বাস্থ্য, আইন, সংসদ, ত্রাণ ও পুনর্বাসন, নারী ও শিশু, সমাজ কল্যাণ, শ্রম ও কর্মসংস্থান, বন ও পরিবেশ, শিক্ষা, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর মূখ্য সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক এবং র‌্যাবের মহাপরিচালকে পাঠানো হয়েছে। তবে কী তথ্য এখন পর্যন্ত সংগ্রহ করা হয়েছে তা জানা যায়নি। তবে গত ১০ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র র‌্যাব-পুলিশের সাত কর্মকর্তার ওপর যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে তা পুনর্বিবেচনার আবেদন জানিয়েছে বাংলাদেশ।

এদিকে ১২টি মানবাধিকার সংগঠনের জাতিসংঘে আবেদনের খবর প্রকাশ হওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, র‌্যাবের প্রতি সব অভিযোগ চাপিয়ে দিয়ে অবিচার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘‘র‌্যাব যারা তৈরি করেছেন, এখন তারাই র‌্যাবকে অপছন্দ করছেন। র‌্যাবের বিরুদ্ধে নানান ধরনের অপপ্রচার করছে।”

তিনি বলেন, ‘‘র‌্যাব যে অনেক ভালো কাজ করেছে সেই সব কাজের কথা তারা বলছে না। তারা নানান ধরনের মানবাধিকারের কথা বলে। আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি, এমন কোনো দেশ নাই যেখানে এনকাউন্টার বা এই ধরনের ঘটনা না ঘটে। পুলিশ বাহিনীর সামনে কেউ যদি অস্ত্র তুলে কথা বলে, পুলিশ বাহিনী তো তখন নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকে না। তখনই এই সমস্যা ফায়ারিংয়ের ঘটনা ঘটে।”

তার কথা, ‘‘এই সবই যদি এলিট ফোর্স, র‌্যাবের ঘাড়ে দিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে আমি মনে করি, তাদের প্রতি অবিচার করা হচ্ছে।”

‘সতর্কভাবে এগোতে হবে’

সাবেক কূটনীতিক ও রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল (অব.) শহীদুল হক বলেন, ‘‘মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং এই মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আবেদনের মধ্যে যোগসূত্র আছে। মার্কিন নীতি জাতিসংঘকেও প্রভাবিত করতে পারে। তাই বাংলাদেশকে এখন অনেক সতর্কভাবে এগোতে হবে। বাংলাদেশের উচিত হবে আপত্তির জায়গাগুলো ভালেভাবে দেখা এবং যদি কোনো সত্যতা থাকে তাহলে সেগুলোর ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া।”

তিনি বলেন, ‘‘আমার জানামতে র‌্যাব থেকে সরাসরি তাদের কোনো সদস্যকে জাতিসংঘ শান্তি মিশনে পাঠানো হয়। এখানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের যে সদস্যরা কাজ করেন তাদের মাতৃবিভাগ থেকে পাঠানো হয়। তাই প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতিসংঘ শান্তি মিশনে র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞার আবেদনটি ঠিক যায় না। তবে বিষয়গুলোকে হালকাভাবে না নিয়ে বাংলাদেশের সিরিয়াসলি নেয়া উচিত।”

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক নূর খানও একই ধরনের মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘‘আমি মনে করি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর এই আবেদন ব্যক্তির ক্ষেত্রে, প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নয়৷ তবে সরকারে উচিত হবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিটি ঘটনা সঠিকভাবে তদন্ত করা। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনা। প্রয়োজনে স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করা। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে অভিযোগের জবাব ভালোভাবেই দেয়া যায়।”

তবে তিনি স্বীকার করেন, ‘‘মানবাধিকার সংগঠনগুলো সবদেশের মানবাধিকার নিয়ে কথা বললেও বড় বড় দেশের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপারে তারা নিষেধাজ্ঞার আবেদন জানায় না।”

‘নেপথ্যে আন্তর্জাতিক রাজনীতি’

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং মানবাধিকার সংগঠনের র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞার আবেদনের নেপথ্যে আন্তর্জাতিক রাজনীতি আছে বলে মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রশীদ৷ তার মতে, বাংলাদেশের উচিত হবে আন্তর্জাতিক বন্ধুদের সহায়তায় সেই রাজনীতি মোকাবেলা করা। আর কোনো অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া। তিনি বলেন, ‘‘পারমাণবিক বোমার যেমন মালিক আছে এই মানবাধিকার সংগঠনগুলোরও মালিক আছে৷ তারা মালিকদের ইচ্ছায় কাজ করে।”

তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশে জঙ্গি দমন, সন্ত্রাস দমন ও মাদক নিয়ন্ত্রণে র‌্যাবের অনেক বড় ভূমিকা আছে। হলি আর্টিজান হামলার পর তার জঙ্গি দমনে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। ঠিক তখনই হিউম্যান রাইটস ওয়াচ র‌্যাবের কার্যক্রম বন্ধের দাবি তোলে৷ আবার এরাই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের বিচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়৷ তাদের মানবাধিকার একেক জায়গায় একেক রকম৷”

এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি একাধিক সূত্র জানায়, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ ১২টি মানবাধিকার সংগঠনের অভিযোগ ও দাবির ব্যাপারে জাতিসংঘ বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। আর জাতিসংঘ শান্তিমিশনে নেয়ার ব্যাপারে জাতিসংঘেরই নিজস্ব স্ক্রিনিং সিস্টেম আছে। তারা প্রত্যেক ব্যক্তির ব্যাকগ্রাউন্ড ও ট্র্যাক রেকর্ড তাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে চেক করে।

 

সূত্র: ডয়চে ভেলে

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button