প্রথম শহীদ মিনার ও একজন পিয়ারু সরদার

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : ভাষার লড়াই থেকে শুরু হয়েছিল স্বায়ত্তশাসনের দাবি, স্বাধিকারের আন্দোলন, তারপর স্বাধীনতার সংগ্রাম। পঞ্চাশ-ষাট দশকের সে বিদ্রোহী অভিযাত্রার পুরোভাগে ছিলেন নায়ক-মহানায়কেরা। তবে তাদের এগিয়ে যাওয়ার শক্তি, রসদ, প্রেরণা যুগিয়েছেন অনেক নেপথ্য নায়ক। সময়ের দাবি মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও অবদান রেখেছেন তারা। তাই ইতিহাসে তাদেরও রয়েছে গৌরবান্বিত স্থান। এমন এক স্থানের অধিকারী পুরান ঢাকার ২২ পঞ্চায়েতের অন্যতম প্রধান পিয়ারু সরদার। তার নিয়ন্ত্রণে ছিল বকশীবাজার, উর্দু রোড, হোসেনী দালান এলাকা। ২১শে ফেব্রুয়ারির ভাষা শহীদদের স্মরণে নির্মিত প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণের অন্যতম নেপথ্য নায়ক ছিলেন তিনি।

সেদিন ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ ও প্রভাবশালী নবাব পরিবারের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছিলেন তিনি। ভূমিকা রেখেছিলেন বাঙালির মুক্তি আন্দোলনে।

১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে প্রতিষ্ঠা করার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পুুলিশের গুলিবর্ষণে নিহতদের আত্মোৎসর্গ অমর করে রাখতে ২২শে ফেব্রুয়ারি রাতে শহীদ মিনার নির্মাণের পরিকল্পনা করেন ছাত্র নেতৃবৃন্দ। সিদ্ধান্ত হয়, ওই মিনার নির্মিত হবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ চত্বরে।

পঞ্চায়েত প্রধান পিয়ারু সরদারের অন্যতম পেশা ছিল ঠিকাদারি। ওই সময় তিনি ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ সম্প্রসারণ কাজের ঠিকাদার। এ জন্য কলেজ হোস্টেল এলাকায় প্রচুর ইট, বালু ও অন্যান্য নির্মাণ-উপকরণ এনে রেখেছিলেন তিনি। এগুলো ছিল খোলা জায়গায়। ওদিকে শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য ইট, বালু ছাড়াও দরকার রড, সিমেন্ট প্রভৃতির। সেগুলো ছিল গুদামে তালাবদ্ধ। রড না হোক, সিমেন্ট ছাড়া নির্মাণকাজ সম্ভব নয়। তাই গুদামে রাখা সিমেন্ট আর খোলা জায়গায় রাখা ইট, বালু ব্যবহারের অনুমতি নিতে ছাত্ররা যান হোসেনী দালানে পিয়ারু সরদারের বাসা কাম অফিসে। শহীদ মিনার নির্মাণকাজে সাহায্য-সহায়তা চান তার। সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রদের হাতে গুদামের চাবি তুলে দিয়ে বলেন সিমেন্ট, ইট, বালুসহ সবকিছু প্রয়োজনমতো ব্যবহার করতে। তারপর কাজ শেষ হলে গুদামের চাবি তাকে ফেরত দিতে। তখন পরিণাম কী হবে ভাবেননি তিনি। প্রশাসনের রক্তচক্ষুর শঙ্কাও জাগেনি তার মনে।

প্রথম শহীদ মিনার ও পিয়ারু সরদার: পরের ঘটনা আজ ইতিহাস। সেদিন ছিল এই ইতিহাসেরই উত্থান-পর্ব। ২৩শে ফেব্রুয়ারি বিকালে শুরু হয় শহীদ মিনারের নির্মাণকাজ। বাইরের কারফিউ উপেক্ষা করে রাতের মধ্যে তৈরি হয় ১০ ফুট উঁচু, ৬ ফুট চওড়া শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ। ২৪শে ফেব্রুয়ারি ভোরে শেষ হয় কাজ। তারপর উদ্বোধন করেন সাংবাদিক-সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ আবুল কালাম শামসুদ্দীন। তিনি ছিলেন পূর্ববঙ্গ পরিষদের সদস্য। পুলিশের গুলিবর্ষণে ছাত্রহত্যার প্রতিবাদে ওই পদ তিনি ত্যাগ করেছিলেন ২২শে ফেব্রুয়ারি। তার সঙ্গে উদ্বোধন করেন শহীদ শফিউর রহমানের পিতা। ২৬শে ফেব্রুয়ারি সকালে পুলিশ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় শহীদ মিনার। প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি আরও দু’বার ভেঙে চুরমার করেছে শহীদ মিনার। কিন্তু প্রথম শহীদ মিনার যে স্মৃতিকে জাগরূক রাখার চেতনা সৃষ্টি করেছিল তা-ই এক দুর্মর শক্তি হয়ে এগিয়ে নিয়ে গেছে আমাদের মুক্তি সংগ্রামকে। কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ তখন লিখেছিলেন: ‘স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার, ভয় কি বন্ধু, আমরা তো আছি চার কোটি পরিবার।’ এ সেই স্মৃতির মিনার যা পিয়ারু সরদারের সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়া নির্মাণ করা সম্ভব ছিল না কোনোমতেই।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button