বিশেষ প্রতিনিধি : গাজীপুর পরিবহন মালিক-শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি সুলতান উদ্দিন সরকারের বিরুদ্ধে পরিবহনে চাঁদাবাজি ও জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে।
সড়ক-মহাসড়কে গাড়ি চলানোর জন্য কথিত ভর্তি ও নবায়ন ফি, স্ট্যান্ড খরচের (জিবি) নাম করে ছোট-বড় গাড়ি থেকে তার নিজস্ব বাহিনী দিয়ে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ তুলে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে সংবাদ সম্মেলন করেছে ভূক্তভোগীরা।
মঙ্গলবার (০৩ জানুয়ারি) জয়দেবপুর শহরে একটি রেস্টুরেন্টে অয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন ভূক্তভোগীরা।
তবে, সুলতান আহমেদ সরকার সকল অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবী করেছেন।
সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে পাঠ করেন গাজীপুর মহানগরী কাশিমপুর এলাকার গৃহবধূ নুরুন্নাহার সাথী। এছাড়াও সম্মেলনে ভূক্তভোগী সিএনজি মালিক ও চালক মিলে আরো ৭ জন উপস্থিত ছিলেন। তারা সুলতান উদ্দিন সরকারের পক্ষে চাঁদা আদায়কারী ম্যানেজার, লাইনম্যান ও সিরিয়ালম্যানদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বিভিন্ন মামলার নথিপত্রও উপস্থাপন করেন।
লিখিত বক্তব্যে ও সংবাদ সম্মেলনে তারা অভিযোগ করে বলেন, ৯১ সালে বিএনপি সরকারের আমলে সাবেক এক প্রতিমন্ত্রীর হাত ধরে গাজীপুরের পরিবহনের নেতা হয়ে উঠেন সুলতান সরকারের পিতা শামসুদ্দিন সরকার। পিতার মৃত্যুর পর ২০১৩ সালে সুলতান সরকার গাজীপুর জেলা পরিবহন শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি হয়ে তিনি জেলার পরিবহনের একচ্ছত্র নেতা বনে যান। এ কমিটির সাধারণ সম্পাদকও তার আপন ভাই ফয়সাল সরকার গাজীপুর মহানগর শ্রমিক দলের আহবায়ক।
সংবাদ সম্মেলনে গজারিয়া পাড়ার সিএনজি চালক জামাল উদ্দিন, রাজেন্দ্রপুরের পারভেজ ও রুদ্র্রপুর এলাকার গোলাপ মিয়া অভিযোগ করেন, সুলতান সরকারের সহযোগীরা লাইনম্যান, সিরিয়াল মাস্টার, অফিস সহকারীসহ বিভিন্ন পরিচয়ে বাস, ট্রাক, সিএনজি স্ট্যান্ড থেকে দৈনিক ও মাসিক চাঁদা আদায় করে থাকেন। তাদের নিয়ন্ত্রানাধীন স্ট্যান্ডগুলোতে নতুন কোন গাড়ি নামানোর ক্ষেত্রে এককালীন এন্ট্রি ফি ৮-১০ হাজার, দৈনিক সিরিয়াল বাবদ ৫০-২০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। আর বাসের ক্ষেত্রে এন্ট্রি ফি ৪০-৫০ হাজার টাকা এবং দৈনিক চাঁদার পরিমাণ ৩৫০-৭৫০টাকা। মহানগরীর চন্দনা চৌরাস্তা, ভোগড়া, রাজেন্দ্রপুর, কোনাবাড়ী ফ্লাইওভার, মাস্টার বাড়ি, মিরের বাজার, বোর্ডবাজার এলাকায় এসব চাঁদা আদায় করার জন্য সুলতান সরকারের লোকজন কাজ করে থাকে। হাইওয়ে মিনি নামে গাজীপুরের তাকওয়া পরিবহন থেকে প্রতিদিন ৭৫০ টাকা করে জিপি ফান্ডের নামে চাঁদা আদায় করা হয়। এভাবে প্রতিদিন গড়ে ওই নেতা ৮/৯ লাখ টাকার চাঁদা আদায় করে থাকেন।
ভূক্তভোগীরা আরো অভিযোগ করেন, এসব চাঁদাবাজির ঘটনায় সুলতান সরকারের সহযোগীদের নামে ৩টি মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় ধৃত আসামিদের কেউ কেউ সুলতান সরকারের নাম উল্লেখ করে ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দী দিয়েছেন। এরপরও তিনি ধরা ছোয়ার বাইরে। উল্টা যারা প্রতিবাদ করে বা চাঁদা দিতে অস্বীকার করে তাদের শারীরিক নির্যাতন ও মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানী করা হয়।
সে সকল মামলার এজাহার ও নথিপত্র সূত্রে জানা গেছে, গ্রেফতার ও পলাতক আসামিরা তাকওয়া পরিবহনের বাস থেকে দৈনিক ৭৫০ টাকা করে, ভোগড়া বাইপাস এলাকায় বিভিন্ন ভ্যান-ট্রাক ও সিএনজি হতে ১০০ টাকা, চান্দনা চৌরাস্তা, রাজেন্দ্রপুর চৌরাস্তা এলাকা দিয়ে চলাচলকরা বিভিন্ন আন্ত:জেলা বাস সার্ভিস থেকে দৈনিক ৫০০ টাকা, গাজীপুর কাপাসিয়া-শিববাড়ী সড়কে চলাচলকারী রাজদুত ও পথের সাথী পরিবহন পরিবহন হতে ৫০০ টাকা করে , রাজেন্দ্রপুর থেকে ময়মনসিংহ অভিমুখী বাস-মিনিবাসসহ মহানগরের উপর দিয়ে চলাচলকারী বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে পরিবহন থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হয়।
ভূক্তভোগী সাথী আরো অভিযোগ করেন, সুলতান সরকার ও তার সহযোগী জনৈক ইমতিয়াজ করিম শুভ মহানগরীর কাশিমপুর এলাকায় তাদের এক একর আশি শতাংশ জমি দখলের জন্য তাদের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত বিভিন্ন থানায় প্রায় ২৭টি মামলা করেছে। মামলার পর পুলিশ আসামি গ্রেফতার করে আদালতে পাঠায়।
কিন্তু গত প্রায় সাত বছর যাবত এসব মামলার কোন তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেনি। অনেকে এসব মিথ্যা মামলার পরোয়ানা নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন এবং কাজকর্ম করতে না পেরে মানবতার জীবন যাপন করছেন।
আরো অভিযোগ করেন, এসব বিষয়ে ন্যায় বিচার চেয়ে তিনি গাজীপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার বরাবর লিখিত আবেদন করেছেন। তাদের দাবী মামলার তদন্ত করে যদি তারা নির্দোষ হয় তাহলে যেন তাদেরকে দ্রুত অব্যাহতি দেওয়া হয়। তিনি এ সময় ন্যায় বিচারের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
অভিযোগের বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন থেকে গাজীপুর পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি সুলতান উদ্দিন সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সংবাদিকদের বলেন, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর কোনো সত্যতা নেই। প্রয়োজনে আপনারা তদন্ত করুন। যে সব অভিযোগ করা হয়েছে তার সব মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট।
গাজীপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোল্যাা নজরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, একটি পরিবারকে হয়রানির অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগ তদন্ত করে দোষী সাব্যস্ত হলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যায়ভাবে কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয়, সে দিকটি সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণে থাকবে। এছাড়া পরিবহনে চাঁদাবাজির বিষয়ে যে মামলা হয়েছে।