ট্রাম্প কেন চান বিশ্ব বিশ্বাস করুক—ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘ধ্বংসপ্রাপ্ত’?

ট্রাম্প কেন চান বিশ্ব বিশ্বাস করুক—ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ‘ধ্বংসপ্রাপ্ত’?

সিএনএন : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জোরালোভাবে দাবি করছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি ‘ধ্বংসপ্রাপ্ত’। কিন্তু এই দাবির পেছনে রয়েছে দুটি মুখ্য রাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণ।

শক্তিশালী নেতা হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি রক্ষা

প্রথম কারণটি ট্রাম্পের ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্বধর্মী রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। তার পুরো প্রেসিডেন্সি নির্মিত হয়েছে একজন ‘অপরাজেয়, সাহসী ও দৃঢ়চেতা’ নেতার ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠার উপর। তাই যেকোনো তথ্য যা তার এই ভাবমূর্তিকে আঘাত করতে পারে, সেটি তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।

পুনরায় সামরিক অভিযান এড়াতে চাইছেন ট্রাম্প

দ্বিতীয়ত, যদি এটা প্রমাণ হয় যে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি বা ইরান এটি পুনরায় গড়ে তুলছে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে দাঁড়াবে আরেকটি কঠিন প্রশ্ন—পুনরায় সামরিক অভিযান চালানো কি জরুরি? ট্রাম্প এই প্রশ্ন এড়াতে চান, কারণ দীর্ঘমেয়াদী লড়াই ও একটি সম্ভাব্য যুদ্ধ তার ‘মাগা’ (MAGA) ভিত্তিকে ক্ষুব্ধ করতে পারে।

প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টে সন্দেহ

ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (DIA) প্রাথমিক ‘লো কনফিডেন্স’ রিপোর্ট বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের বোমাবর্ষণে ইরানের মূল পারমাণবিক কাঠামো ধ্বংস হয়নি, বরং কয়েক মাসের জন্য বিলম্বিত হয়েছে। এই রিপোর্টকে চ্যালেঞ্জ করে ট্রাম্প দাবি করছেন, “এটা একেবারে ‘অব্লিটারেশন’। অন্য কোনো সেনাবাহিনী এটি করতে পারত না।”

তথ্য গোপন ও রাজনৈতিক স্পিন

ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধানরা মিডিয়াকে আক্রমণ করে তথ্য গোপনের চেষ্টা করছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সিএনএন ও নিউ ইয়র্ক টাইমসকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যা দেন। ইসরায়েলের সেনাবাহিনী ও সিআইএ দাবি করেছে ইরানের কর্মসূচিতে ‘ব্যবস্থাগত’ ক্ষতি হয়েছে, কিন্তু তা ট্রাম্পের অতিরঞ্জিত বক্তব্যের সমর্থনে যথেষ্ট নয়।

গোপন পারমাণবিক স্থাপনা ও ইউরেনিয়াম সরানোর শঙ্কা

প্রশ্ন রয়ে গেছে—ইরান কি আগেই ইউরেনিয়ামের মজুত সরিয়ে ফেলেছিল? তাদের কি গোপন কেন্দ্র রয়েছে, যেখান থেকে তারা পুনরায় পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে যেতে পারে? এই প্রশ্নগুলোর কোনোটিরই উত্তর স্পষ্ট নয়।

গোয়েন্দা সংস্থার উপর রাজনৈতিক চাপের আশঙ্কা

প্রাথমিক রিপোর্টকে উড়িয়ে দিয়ে হোয়াইট হাউসের প্রতিক্রিয়া ইঙ্গিত দিচ্ছে যে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর উপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে, যেন তারা ট্রাম্পের দাবিকে সমর্থন করে তথ্য সরবরাহ করে। ইতিহাসে এই ধরনের আচরণ ভয়াবহ পরিণতি ডেকে এনেছে।

কূটনৈতিক সমাধানের ভবিষ্যৎ

ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে এবং তিনি একটি “সম্পূর্ণ শান্তিচুক্তি”র আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তবে তিনি আবার এটাও বলেছেন, “আমি জানি না কোনো চুক্তি সই করাটা জরুরি কিনা। তারা যুদ্ধ করেছে, এখন ফিরে গেছে। আমি চুক্তি হোক বা না হোক, সেটা আমার জন্য বড় কিছু নয়।”

বর্তমানে সত্য উন্মোচিত হতে সময় লাগবে। তবে যদি প্রমাণ হয় ইরান এখনো পারমাণবিক কর্মসূচির কিছু অংশ ধরে রেখেছে, তাহলে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে আবারো সামরিক অভিযান চালানোর রাজনৈতিক চাপ তৈরি হবে—যা তার আগের অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

২০ বছর আগে ইরাকে অস্ত্র থাকার ভুয়া গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ইতিহাসের সেই পুনরাবৃত্তি যেন আবার না ঘটে—এই আশঙ্কা থেকেই উঠছে প্রশ্ন: ট্রাম্প কি সত্যকে আড়াল করছেন?