অবশেষে ট্রাম্প এবার নোবেল শান্তি পুরস্কার পেতে চলছে?

গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক : চলতি বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছেন অন্তত চারজন, যাদের মধ্যে রয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।
ট্রাম্প নিজেই মনে করেন, তিনি এই পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য। তবে, তিনি এটাও বিশ্বাস করেন যে, আন্তর্জাতিক মহল তাকে এই সম্মান দেবে না।
গত মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, “আমি যত কিছুই করি না কেন, আমি নোবেল শান্তি পুরস্কার পাব না।”
শান্তির প্রতিশ্রুতি, বাস্তবায়ন বিতর্কিত
শপথ গ্রহণের সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি হবেন শান্তির দূত ও জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার নেতা। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের অবসান, ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক শান্তিচুক্তি এবং ইসরায়েল-গাজা সংঘাত সমাধানের।
তার প্রথম মেয়াদে তিনি ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তি আব্রাহাম অ্যাকর্ডস স্বাক্ষর করেছিলেন। ট্রাম্পের দাবি, শুধুমাত্র এ চুক্তির জন্যই তিনি শান্তি পুরস্কারের দাবিদার।
“আমি চার-পাঁচবার নোবেল পাওয়ার যোগ্য ছিলাম,” বলেছিলেন তিনি।
তিনি বহুবার এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, বিশেষ করে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার শান্তি পুরস্কার পাওয়া নিয়ে। “যদি আমার নাম হতো ওবামা, তাহলে ১০ সেকেন্ডেই পুরস্কারটা দিয়ে দিত,” বলেছেন ট্রাম্প।
ওবামার পুরস্কার নিয়ে বিতর্ক, ট্রাম্পের তুলনা
২০০৯ সালে ওবামাকে প্রেসিডেন্ট হওয়ার মাত্র নয় মাসের মাথায় শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়। নোবেল কমিটি জানিয়েছিল, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং মানুষের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য তার চেষ্টা বিবেচনায় পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
তবে অনেকেই এই সিদ্ধান্তকে ‘অকালপক্ব’ বলেছিলেন। এমনকি কমিটির তৎকালীন সেক্রেটারি গেইর লুন্ডেস্টাড ২০১৫ সালে জানান, পুরস্কারটি দেওয়া ভুল ছিল এবং ওবামাও এতে চমকে গিয়েছিলেন।
ইতিহাস বলছে, নোবেল কমিটি ডানপন্থীদের অবহেলা করে
রাষ্ট্রপতি বিষয়ক ইতিহাসবিদ ক্রেইগ শার্লি বলেছেন, ট্রাম্পের অর্জন ওবামা বা উইলসনের তুলনায় অনেক বড়। তার দাবি, “ওবামা পুরস্কার পেয়েছেন শুধুমাত্র ‘ওবামা’ হওয়ায়।”
তিনি অভিযোগ করেন, নোবেল কমিটি ডানপন্থীদের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট। তার মতে, ডগলাস ম্যাকআর্থার ও রোনাল্ড রিগানের মতো ব্যক্তিত্বরা শান্তির জন্য অনেক কিছু করলেও পুরস্কার পাননি, কারণ তারা রক্ষণশীল ছিলেন।
মনোনয়ন ও সমর্থনের হিরিক, কিন্তু সময়সীমা পেরিয়ে গেছে অনেকাংশেই
২০২৫ সালের শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন জানুয়ারিতেই শেষ হয়ে গেছে। ট্রাম্পকে যেসব ব্যক্তি বা রাষ্ট্র মনোনয়ন দিয়েছে, তাদের অনেকেই তা পাঠিয়েছে সময়সীমা পার হওয়ার পর।
তবে ইসরায়েলি বংশোদ্ভূত আইনজীবী আনাত আলোন-বেক জানিয়েছেন, তিনি সময়মতো মনোনয়ন দিয়েছেন। তার ভাষায়, “ট্রাম্প গাজায় জিম্মি মুক্তির প্রচেষ্টা, ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।”
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়ে মনোনয়ন দিয়েছেন, যেখানে তিনি লিখেছেন, “তিনি এখনো একটির পর একটি দেশ ও অঞ্চল শান্তির পথে এগিয়ে নিচ্ছেন।”
আফ্রিকার পাঁচজন রাষ্ট্রপ্রধানও ট্রাম্পের মনোনয়নকে সমর্থন দিয়েছেন হোয়াইট হাউসে এক বৈঠকে। গ্যাবনের প্রেসিডেন্ট ব্রাইস ওলিগি এনগেমা বলেন, “তিনি এমন এক অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে এনেছেন, যেখানে সেটা কখনোই সম্ভব মনে হয়নি।”
সমালোচকরাও কম নয়
সমালোচকরা বলছেন, ট্রাম্প প্রকৃত শান্তি অর্জনে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি গাজায় মানবিক সংকট উপেক্ষা করেছেন, ইরানে বোমাবর্ষণে মানুষের প্রাণ গেছে, এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে তার কোনো দৃশ্যমান কূটনৈতিক অগ্রগতি নেই।
অস্ট্রেলিয়ার গবেষক ড. এমা শর্টিস লিখেছেন, “ট্রাম্প যদি এই পুরস্কার পান, তাহলে তা নোবেল শান্তি পুরস্কারের সব মর্যাদা মুছে ফেলবে। বরং আন্তর্জাতিক আইন ভাঙার স্বীকৃতিতে পরিণত হবে।”
তাহলে কি ট্রাম্প পুরস্কার পাবেন?
বর্তমানে বাজির দুনিয়ায় ট্রাম্প রয়েছেন দ্বিতীয় অবস্থানে — সম্ভাব্যতা ৩২%। তার ওপরে রয়েছেন রুশ বিরোধী নেতা আলেক্সেই নাভালনির স্ত্রী ইউলিয়া নাভালনিয়া (৩৫%)।
তবে রাজনীতি, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং নোবেল কমিটির পূর্ব অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিলে, বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন —ট্রাম্প নোবেল শান্তি পুরস্কার পাবেন না, এমনকি যোগ্যতা থাকলেও নয়।
তবুও, আলোচনার কেন্দ্রে থাকা, আন্তর্জাতিক নেতাদের মনোযোগ পাওয়া এবং নিজের দাবি প্রতিষ্ঠায় ট্রাম্প সফল হয়েছেন — এই দিকটি কেউ অস্বীকার করতে পারছে না।
নোবেল শান্তি পুরস্কার ২০২৫-এর বিজয়ীর নাম ঘোষণা হবে ১০ অক্টোবর। ততদিন ট্রাম্পও নিশ্চয়ই অপেক্ষায় থাকবেন, পুরস্কারটি তার দিকে এগিয়ে আসে কি না।



