গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : প্রায় ১৮ বছরের প্রতিকূলতা অতিক্রম করে এখন স্বস্তির পথে হাঁটছে বিএনপি। শুধু তা-ই নয়, রাজনৈতিক শক্তি নিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে দলটি। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকার গঠনের স্বপ্নও দেখছে। এমন পরিস্থিতিতে আজ বিএনপির ৪৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শোভাযাত্রার পাশাপাশি ভোটের বার্তা দিয়ে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের উজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিয়েছে দলটি।
সোমবার (০১ সেপ্টেম্বর) সব জেলা ও মহানগরে শোভাযাত্রা হবে। আগামীকাল মঙ্গলবার ঢাকায় র্যালি করবে বিএনপি।
বস্তুত, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রাজনীতিতে বিএনপির বিপর্যয় শুরু হয়। ওয়ান-ইলেভেন সরকারের রোষানলে পড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তও হয় দলটি। ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে। ক্ষমতায় এসে তারা ২০১৪, ১৮ ও ২৪ সালে তিনটি একতরফা প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন করে বিএনপিকে ক্ষমতায় বাইরে রাখার পথ তৈরি করে। শুধু বিএনপি নয়, এই সময়ে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনীতি করার ক্ষমতাও সীমিত হয়ে পড়ে।
বিএনপির দপ্তর সূত্র জানায়, ২০০৯ সালের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ১ লাখ ৪২ হাজার ৯৮৩টি মামলা হয়। এসব মামলায় ৫৯ লাখ ২৯ হাজার ৪৯২ জনকে আসামি করা হয়। শুধু ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে তিন মাসের মধ্যে সারা দেশে ১ হাজার ৬৪৫ মামলায় প্রায় ৭০ হাজার নেতা-কর্মীকে আসামি করা হয়েছিল। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মীকে পাইকারি হারে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি গণহারে মামলার সাজা দেওয়া শুরু হয়। সেই সময়ে প্রায় দুই হাজার নেতা-কর্মীকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেন ঢাকার বিভিন্ন আদালত। সাড়ে ১৫ বছরের আন্দোলনে বিএনপির ২ হাজার ২৭৬ জনকে ক্রসফায়ারে হত্যা এবং ১৫৩ জনকে গুম করা হয়। এসব কারণে বিএনপি অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ছিল। কিন্তু তারপরও বিএনপি কখনো আন্দোলনে থেমে থাকেনি।
২০১৪ সাল থেকে লাগাতার বিভিন্ন ইস্যুতে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। বিশেষ করে ২০১৪-১৫ সালে লাগাতার আন্দোলন করে আওয়ামী লীগ সরকারকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। তা সত্ত্বেও সেই সময়ে শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের পতন হয়নি। এরপর ২০১৮ সালে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে বিএনপি সমঝোতার পথে গিয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি। কারণ ওই সময়ে আওয়ামী লীগসহ কূটনৈতিক মহলে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের বিষয়ে যে আলোচনা ছিল, তাও আওয়ামী সরকারের কারণে হতে পারেনি। রাজনৈতিক মহলে আলোচনা আছে, সেই সময়ে আসন ভাগাভাগির দূরবর্তী আলোচনা হয়েছিল। সেই ওয়াদাও শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ পালন করেনি। কিন্তু ওই ওয়াদা পালন না করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেষ পেরেক ঠোকা হয়েছিল বলেও মনে করেন পর্যবেক্ষকরা। তারা মনে করেন, ২০১৮ সালের নির্বাচন যদি ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য হতো তাহলে আওয়ামী লীগকে এমন পরিণতি ভোগ করতে হতো না। তখন বিএনপি বিরোধী দল বা সরকারে থাকত। পার্লামেন্ট থাকত, গণতন্ত্র থাকত। দেশে ও বিদেশে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট দুর্নামও হয়তো হতো না। কিন্তু ইতিহাস বলে কোনো ফ্যাসিস্ট বা স্বৈরাচারের চিরস্থায়ী ক্ষমতায় থাকার নজির নেই। সাড়ে ১৫ বছর পর ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার প্রবল আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগের একই পরিণতি হয়েছে। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে গিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও নবগঠিত এনসিপিসহ দল-মত নির্বিশেষে সবার ভূমিকা ছিল। অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে ছাত্ররা থাকলেও আগামী নির্বাচনে বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ জনসমর্থন, ভোট ও নেতা-কর্মী হিসেবে বিএনপি সব দলের চেয়ে বেশি অগ্রগামী বলে রাজনীতিতে আলোচনা আছে। আগামী নির্বাচনের জন্যও বিএনপি সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে। অন্য রাজনৈতিক দলগুলোও প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে। তবে জুলাই সনদে পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন, গণভোট, গণপরিষদ নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য, নারী আসনে নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে দলগুলোর মধ্যে কিছুটা বিভেদ দেখা যাচ্ছে। বিএনপি মনে করছে, এই বিভেদ তারা শেষ পর্যন্ত কাটিয়ে উঠতে পারবে। সরকার যথাসময়ে নির্বাচনের উদ্যোগ নেবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ৪৭ বছরের ইতিহাসে বিএনপি বহু উত্থান-পতনের সাক্ষী। চব্বিশের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে দলটির সামনে অবারিত সুযোগ যেমন আছে, তেমনি রয়েছে কঠিন চ্যালেঞ্জও। প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো ভোটারদের আস্থা ফেরানো, বিশেষত নতুন প্রজন্মকে সঙ্গে আনা। রাজনৈতিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন করা এবং সহিংসতা ও অস্থিরতা এড়িয়ে সুষ্ঠু ভোট আদায় করা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার আদর্শ ধরে রেখেই বিএনপিকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। আগামী দিনে দলের দুর্নাম যাতে না হয়, সে জন্য তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের আরও কন্ট্রোল করতে হবে। তিনি মনে করেন, বিদেশ থেকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে এলে হয়তো অনেক কিছুর পরিবর্তন হবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে ধারণ করে আগামী দিনে বিএনপির রাজনীতি করা উচিত।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ইতোমধ্যে নেতা-কর্মীদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘আগামী নির্বাচন যতটা সহজ হবে ভাবছেন, ততটা সহজ নয়।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী রোববার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘তারেক রহমান দেশের উন্নয়নের জন্য সুস্পষ্ট পরিকল্পনা দিয়েছেন। আমাদের এখন শুধু আন্দোলন নয়, জনগণের কাছে উন্নয়নের এ পরিকল্পনাও পৌঁছে দিতে হবে এবং তাদের সম্পৃক্ত করতে হবে। আমাদের সচেতনভাবে সেই পথে চলতে হবে। মাঠে যেতে হবে, গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়তে হবে। আন্দোলন যেমন জরুরি, তেমনি দেশ গড়ার পরিকল্পনায় জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করাও জরুরি।’
তিনি বলেন, অনেক ষড়যন্ত্র ও বাধা-বিপত্তির মুখেও তারেক রহমান আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তিনি জিয়াউর রহমানের দেখানো স্বপ্নই আজকের প্রজন্মকে দেখাচ্ছেন।
বিএনপির গণশিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, বিএনপি হচ্ছে জনগণের দল। বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি এখন অনেক সুসংগঠিত ও শক্তিশালী। ১৯৭৫ সাল থেকে ২০২৪ পর্যন্ত আন্দোলন-সংগ্রামের বিবেচনায় বাংলাদেশে তারেক রহমান ও বিএনপি এখন অনিবার্য। বিএনপি আবারও জনগণের ভোটে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাবে ইনশআল্লাহ।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, মত ও পথের অনুসারীদের একত্র করে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। সোমবার দলটির ৪৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হবে। এ উপলক্ষে সকালে কেন্দ্রীয় ও জেলা কার্যালয়ে দলীয় পতাকা উত্তোলন, শেরেবাংলা নগরে জিয়াউর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন শীর্ষ নেতারা। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আজ সব জেলা ও মহানগরে শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে।
মঙ্গলবার ঢাকায় র্যালি করবে দলটি। এ ছাড়া বিভিন্ন গণমাধ্যমে ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে দলটি।
প্রতিষ্ঠার পর বিএনপিতে প্রথম সংকট তৈরি হয় ১৯৮১ সালের ৩০ মে সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান শহিদ হওয়ার পর। ওই পরিস্থিতিতে কিছু সময়ের জন্য দলের হাল ধরেন তৎকালীন উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার। কিন্তু পরের বছর ২৪ মার্চ জেনারেল এইচ এম এরশাদের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থান হলে আবদুস সাত্তার ক্ষমতাচ্যুত হন। এতে বিএনপি আরেক দফা সংকটে পড়ে। দলের প্রভাবশালী বেশ কয়েকজন নেতা ওই সময় এরশাদের সঙ্গে চলে গেলে সংকট আরও বাড়ে। বলা হয়েছিল যে, জিয়াউর রহমানের শাহাদতের পর তার অবর্তমানে বিএনপি টিকবে না। তবে সে ভবিষ্যদ্বাণী ভুল প্রমাণিত হয়েছিল । এরপর নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে ১৯৮৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া দলের হাল ধরেন। তার নেতৃত্বে বিএনপি তিনবার ক্ষমতায় যায়। এরপর থেকে টানা ৩৬ বছর নেতৃত্ব দিয়ে খালেদা জিয়া দলটিকে মানুষের কাছে নিয়ে গেছেন। হয়েছেন তিনবার প্রধানমন্ত্রীও। দলের নেতা-কর্মী ও দেশবাসীর কাছেও বেগম জিয়া ছিলেন ব্যাপক জনপ্রিয়। কিন্তু বর্তমানে বেগম জিয়া রাজনীতি থেকে অনেকটাই দূরে। তবে দেশের সার্বিক বিষয়ে তিনি খোঁজখবর রাখছেন সব সময়।
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে গেলে দলের নেতৃত্ব দেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার নেতৃত্বে দলটি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। দলের নেতা-কর্মীদের সুসংগঠিত করেছেন এবং সর্বোচ্চ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন। শেখ হাসিনার পতনের আন্দোলনেও তারেক রহমান নেতৃত্ব দিয়েছেন। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পরও সুধী সমাজেও তার গ্রহণযোগ্যতাও বেড়েছে। এমনকি তিনি এখন পর্যন্ত কারও ব্যাপারে কোনো বিরূপ মন্তব্য করেননি। দেশ-বিদেশে প্রতিনিয়ত তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। প্রতিষ্ঠার ৪৭ বছরে এসে তাই বলা হচ্ছে, আগামী দিনেই তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিশ্বের বুকে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ, এগিয়ে যাবে বিএনপি। অতীতের ভুলভ্রান্তি ভুলে জিয়াউর রহমানের ইমেজকে ধরে রেখেই সবাইকে নিয়েই আগামীর পথ হাঁটবে বিএনপি।