গাজীপুরে নির্বাচনী সমীকরণ বদলেছে, মুখোমুখি বিএনপি ও জামায়াত

গাজীপুরে নির্বাচনী সমীকরণ বদলেছে, মুখোমুখি বিএনপি ও জামায়াত

বিশেষ প্রতিনিধি : আগামী বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে শিল্পঘন ও জনবহুল গাজীপুর জেলার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের আধিপত্য থাকলেও দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় এবারের নির্বাচনে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রেক্ষাপটে গাজীপুরের পাঁচটি সংসদীয় আসনেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠছে বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। অতীতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে যে লড়াই দেখা যেত, এবার সেখানে জামায়াত একটি শক্ত প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

মাঠে কারা সক্রিয়
ইতোমধ্যে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী পাঁচটি আসনেই প্রার্থী ঘোষণা করে প্রচার শুরু করেছে। জামায়াত আগেভাগেই একক প্রার্থী ঘোষণা করলেও বিএনপির প্রতিটি আসনে একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকায় দুটি আসনে অভ্যন্তরীণ বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে।

এছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ কয়েকটি ইসলামী দল নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় রয়েছে। তবে বাম দল ও জাতীয় পার্টির (জাপা) তৎপরতা তুলনামূলকভাবে কম।

গাজীপুর–১: পুরোনো দুর্গে নতুন চ্যালেঞ্জ

কালিয়াকৈর ও গাজীপুর সিটির একাংশ নিয়ে গঠিত গাজীপুর–১ আসনে ১৯৯১ সাল থেকে বিএনপি জয় পায়নি। প্রতিবারই আওয়ামী লীগ প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। এবার বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মজিবুর রহমানকে। তবে মনোনয়নকে ঘিরে দলীয় কোন্দল প্রকাশ্যে এসেছে।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী করেছে সাবেক সচিব মো. শাহ আলম বকশিকে। তিনি ইতোমধ্যে গণসংযোগ শুরু করেছেন।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই আসনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ জামায়াতকে সুবিধা দিতে পারে।

গাজীপুর–২: সীমানা জটিলতায় অনিশ্চয়তা

গাজীপুর সিটির অধিকাংশ এলাকা নিয়ে গঠিত গাজীপুর–২ আসনে বিএনপি প্রার্থী করেছে মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম মঞ্জুরুল করিম রনিকে। তিনি সাবেক ধর্মপ্রতিমন্ত্রী ও সাবেক সিটি মেয়র এম এ মান্নানের ছেলে। জামায়াত প্রার্থী করেছে মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমির হোসেন আলীকে।

এই আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ এবং পরে উচ্চ আদালতের রায়ে আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ায় বিএনপির একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী মনোনয়ন পুনর্বিবেচনার দাবি তুলেছেন। ফলে এখানে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

গাজীপুর–৩: সংগঠনের শক্তি পরীক্ষার আসন

শ্রীপুর ও সদর উপজেলার একাংশ নিয়ে গঠিত গাজীপুর–৩ আসনে বিএনপি প্রার্থী করেছে বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ও জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক এস এম রফিকুল ইসলামকে। জামায়াত প্রার্থী জেলা জামায়াতের আমির মো. জাহাঙ্গীর আলম। উভয় দলই সাংগঠনিক শক্তির ওপর ভর করে প্রচার চালাচ্ছে।

গাজীপুর–৪: স্থানীয় ভোটারই মূল নিয়ামক

স্বাধীনতার পর থেকে মূলত তাজউদ্দীন আহমদের পরিবারের নিয়ন্ত্রণে ছিল গাজীপুর-৪ আসন। কাপাসিয়া নিয়ে গঠিত গাজীপুর–৪ আসনে বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শাহ রিয়াজুল হান্নানকে। তার বাবা আ স ম হান্নান শাহ এই আসনে ১৯৯১ সালে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

জামায়াত প্রার্থী করেছে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মু. সালাহউদ্দিন আইউবীকে।

স্থানীয় ভোটারের আধিক্যের কারণে এখানে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও সংগঠন—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

গাজীপুর–৫: অভিজ্ঞতা বনাম সংগঠন

কালীগঞ্জ ও গাজীপুর সিটির একাংশ নিয়ে গঠিত গাজীপুর–৫ আসনে বিএনপি প্রার্থী করেছে জেলা বিএনপি আহ্বায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম ফজলুল হক মিলনকে।

জামায়াত প্রার্থী করেছে মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমির খায়রুল হাসানকে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতের সাংগঠনিক কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে জনপ্রিয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি গাজীপুরের সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোর একটি হতে পারে।

জামায়াতে ইসলামের গাজীপুর মহানগর আমির মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন বলেন, “আমরা পাঁচটি আসনেই প্রার্থী দিয়েছি এবং জনগণের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছি।”

অন্যদিকে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ড. মাজহারুল আলম বলেন, “গাজীপুরে বিএনপি বরাবরই জনপ্রিয়। আমরা আশা করছি পাঁচটি আসনেই আমাদের প্রার্থীরা জয়ী হবে।”

বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে গাজীপুরে ভোটের হিসাব পাল্টে গেছে। একদিকে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল, অন্যদিকে জামায়াতের সুসংগঠিত কাঠামো—এই দুই বিষয় নির্বাচনের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

ভাসমান ভোটার এবং আওয়ামী লীগ সমর্থক ভোটারদের অবস্থান শেষ পর্যন্ত কার পক্ষে যাবে, সেটিই নির্ধারণ করতে পারে গাজীপুরের নির্বাচনী ফল।