বিশেষ প্রতিনিধি : রাজনীতিতে কিছু মুহূর্ত থাকে, যা কেবল জয়-পরাজয়ের হিসেব নয়, বরং দীর্ঘ বঞ্চনার ইতি টানার দলিল। গাজীপুর-৩ আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী অধ্যাপক ডা. এস এম রফিকুল ইসলাম বাচ্চুর বিজয় ঠিক তেমনই এক ঐতিহাসিক ঘটনা।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠাতার প্রায় ৪৭ বছর পর ৬১ হাজার ৪০৮ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে প্রথমবার শ্রীপুরের মাটিতে জন্ম নেওয়া কোনো মানুষ ধানের শীষ প্রতীকে সংসদে যাচ্ছেন।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সন্ধে পেরিয়ে রাত গভীর হচ্ছিল, কিন্তু থামেনি মানুষের প্রতীক্ষা। উপজেলা সভাকক্ষের বাইরে জমা হাজারো মানুষ, চায়ের দোকানে আড্ডা কিংবা ঘরে বসে রাতের খাবার খেতে খেতেও সবার মনে একই প্রশ্ন — ‘এবার কি তবে আমাদেরই লোক? আমাদের মাটির সন্তানই কি যাচ্ছেন সংসদে?’
শ্রীপুর উপজেলার এক পৌরসভা, আট ইউনিয়ন ও গাজীপুর সদরের তিন ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত গাজীপুর-৩ আসনটি দীর্ঘদিন ধরেই ছিল প্রত্যাশা আর আক্ষেপের জায়গা।
আগেও এখান থেকে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন, কিন্তু তাঁরা ছিলেন বাইরের মানুষ।
স্থানীয় কর্মীরা ঘাম ঝরিয়েছেন, মিছিল টেনেছেন, ভোট চেয়েছেন — কিন্তু প্রতিনিধিত্ব থেকে গেছে অন্যের হাতে। সেই বঞ্চনার ক্ষত নীরব থাকলেও গভীর ছিল।
এবার বিএনপি মনোনয়ন দিল শ্রীপুরের টেপিরবাড়ি গ্রামের সন্তান অধ্যাপক ডা. রফিকুল ইসলাম বাচ্চুকে।
দলের দুঃসময়ে রাজপথে থাকা এই চিকিৎসক ও রাজনীতিবিদকে মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত যে ঠিক ছিল, তা প্রমাণিত হলো বৃহস্পতিবারের ফলাফলে।
শুরুতে দলে আট জন মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকলেও বাচ্চুর নাম ঘোষণার পর দৃশ্যপট পাল্টে যায়।
প্রকাশ্য বিরোধিতার জায়গায় আসে ঐক্যের বার্তা।
স্থানীয়দের ভাষায়, ”এবার লড়াইটা ছিল নিজেদের মানুষকে জেতানোর।”
সাত প্রার্থীর লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত ব্যবধান তৈরি হয় স্পষ্ট। ক্লিন ইমেজের ডা. বাচ্চুকে মনোনয়ন দেওয়ার পর থেকেই হাটবাজার, চায়ের দোকান, গ্রামের উঠান — সব জায়গায় ছিল এক ধরনের সংযত উচ্ছ্বাস। যেন মানুষ চেঁচিয়ে নয়, গভীর স্বরে বলছে — ‘অবশেষে’।
ডা. বাচ্চুর রাজনৈতিক জীবন চার দশকেরও বেশি পুরনো। ১৯৮১ সালে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ ছাত্রদল থেকে শুরু। ছাত্রনেতা থেকে পেশাজীবী সংগঠনের দায়িত্ব, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর নেতৃত্ব, রাজনৈতিক দুঃসময়ে সোচ্চার ভূমিকা — সব মিলিয়ে তাঁর পথ সহজ ছিল না। আওয়ামী লীগের আমলে প্রতিহিংসার শিকার হয়ে পিজি হাসপাতাল থেকে চাকরিচ্যুত হওয়া, গ্রেফতার, মামলা, দীর্ঘদিন কারাবাস — সবই তাঁর জীবনের অংশ।
তবে তাঁর পরিচয়ের আরেকটি মাত্রা আছে — চিকিৎসক হিসেবে মানবিক উপস্থিতি। করোনাকালে ব্যক্তিগত সাহায্য, অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো — এসব স্মৃতি ভোটারদের মনে দাগ কেটেছে।
বিজয়ের পর অধ্যাপক ডা. রফিকুল ইসলাম বাচ্চু বলেন, ”আজ আমার চোখে জল, বুকে শুধু কৃতজ্ঞতার ঢেউ। এই বিজয় কোনো পদ-পদবীর নয়, এটি আমাদের স্বপ্নের বিজয়, আমাদের বিশ্বাসের বিজয়।
এ অঞ্চলের মানুষের প্রতিটি ভালোবাসা আজ আমার কাঁধে বিশাল দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ভোট শুধু একটি প্রতীকে নয়, এটি ছিল আমার উপর মানুষের আস্থা, আশা, চোখের স্বপ্ন।”
তিনি আরও বলেন, ”আমি চিরকৃতজ্ঞ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির কাছে। আমার প্রতি অগাধ বিশ্বাস রেখে তারা আমাকে এ আসনে মনোনয়ন দিয়েছে।
আমি প্রতিজ্ঞা করছি, দলের আস্থা এবং মানুষের স্বপ্ন ভেঙে যেতে দেব না। আমার প্রতিটি নিঃশ্বাস, প্রতিটি সিদ্ধান্ত হবে মানুষের কল্যাণের জন্য।”
স্থানীয়রা বলছেন, এই ফলাফল গাজীপুর-৩-এর রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। ৪৭ বছরের ইতিহাসে প্রথমবার শ্রীপুরের মাটিতে জন্ম নেওয়া এক লড়াকুর সংসদে যাত্রা — এ শুধু সাংগঠনিক সাফল্য নয়, আত্মপরিচয়ের পুনরুদ্ধার।
এখন প্রশ্ন একটাই — এই আস্থা কতটা বাস্তবে রূপ পাবে। কারণ বিজয় ইতিহাস লেখে ঠিকই, কিন্তু প্রতিশ্রুতিই ইতিহাসকে স্থায়ী করে। অধ্যাপক ডা. রফিকুল ইসলাম বাচ্চু শুধু ইতিহাস লিখতে চান না, ইতিহাসকে স্থায়ীও করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
নির্বাচন কমিশন সূত্র জানিয়েছে, গাজীপুর-৩ সংসদীয় আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক ডা. এসএম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু পেয়েছেন ১ লাখ ৬২ হাজার ৩৪৩ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত জোটের (বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস) প্রার্থী মাওলানা এহসানুল হক পেয়েছেন ১ লাখ ৫৩৯ ভোট।
এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ২৭ হাজার ৩৫৯ জন। পোস্টাল ভোট গণনা কেন্দ্রসহ মোট ১৮১টি ভোট কেন্দ্রে ৩ লাখ ৩ হাজার ৯৭২ জন ভোট দিয়েছেন। এর মধ্যে ৮ হাজার ২৮০ ভোট বাতিল হয়েছে। বৈধ ভোট সংখ্যা ২ লাখ ৯৫ হাজার ৬৯২। যা মোট ভোটের ৫৭.৬৪ শতাংশ।