ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণের বাইরে, তিন সপ্তাহেই সংকটে যুক্তরাষ্ট্র

ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণের বাইরে, তিন সপ্তাহেই সংকটে যুক্তরাষ্ট্র

রয়টার্স : ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া যুদ্ধের তিন সপ্তাহ পার হতে না হতেই গভীর সংকটে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্য লাফিয়ে বাড়ছে, মিত্র দেশগুলো মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এবং “স্বল্পমেয়াদি অভিযান” বলে ঘোষণা দেওয়া যুদ্ধে আরও হাজার হাজার সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি চলছে।

হরমুজ প্রণালি সুরক্ষায় নৌবাহিনী পাঠাতে অস্বীকার করায় ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোকে “কাপুরুষ” বলে কটাক্ষ করেছেন ট্রাম্প। শুক্রবার তিনি দাবি করেন, যুদ্ধ “সামরিকভাবে জেতা হয়ে গেছে”। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে — ইরান এখনও হরমুজ প্রণালি দিয়ে উপসাগরীয় তেল ও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রেখেছে এবং আঞ্চলিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রেখেছে।

রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় প্রশাসনে মধ্যপ্রাচ্য আলোচক হিসেবে কাজ করা অ্যারন ডেভিড মিলার বলেছেন, “ট্রাম্প নিজেকে ইরান যুদ্ধ নামের একটি বাক্সে আটকে ফেলেছেন। বের হওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছেন না — এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় হতাশার কারণ।”

হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা অবশ্য এই মূল্যায়ন প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর দাবি, ইরানের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বড় অংশ নিহত হয়েছেন, নৌবাহিনীর অধিকাংশ জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার মূলত ধ্বংস হয়ে গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মিত্র দেশগুলোর অনীহার পেছনে শুধু যুদ্ধে না জড়ানোর ইচ্ছাই নয়, গত ১৪ মাসে ঐতিহ্যবাহী মার্কিন জোটকে ক্রমাগত খাটো করে দেখার প্রতিশোধও রয়েছে।

ইসরায়েলের সঙ্গেও মতবিরোধ দেখা দিচ্ছে। ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েলি হামলার বিষয়ে ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি আগে থেকে কিছু জানতেন না। অথচ ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলছেন, হামলাটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করেই পরিচালিত হয়েছিল।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এখন ট্রাম্পের সামনে দুটি পথ খোলা আছে — তবে দুটোই কঠিন।

প্রথমত, অভিযান আরও জোরালো করা — ইরানের খার্গ দ্বীপের তেলকেন্দ্র দখল বা ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার ধ্বংসে সৈন্য মোতায়েন। কিন্তু এতে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সম্পৃক্ততার ঝুঁকি আছে, যা আমেরিকান জনমত সমর্থন করবে না।
দ্বিতীয়ত, বিজয় ঘোষণা দিয়ে সরে আসা। কিন্তু তাতে উপসাগরীয় মিত্ররা একটি ক্ষতিগ্রস্ত ও ক্ষুব্ধ ইরানের মুখোমুখি একা পড়ে যাবে — যে ইরান এখনও পারমাণবিক সক্ষমতার দিকে এগোতে পারে এবং উপসাগরে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম।

রয়টার্স জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে আরও হাজার হাজার মেরিন ও নৌসেনা পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে, যদিও ইরানে সরাসরি সেনা প্রবেশের বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

রিপাবলিকান কৌশলবিদ ডেভ উইলসন সতর্ক করেছেন, “গ্যাসের দাম যত বাড়বে, মানুষ ততই প্রশ্ন তুলতে শুরু করবে — কেন আমাকে এত দাম দিতে হচ্ছে? হরমুজ প্রণালি কেন আমার ছুটি নির্ধারণ করবে?”

নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসে সংকীর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রক্ষার চাপেও রয়েছে রিপাবলিকান দল।

ওবামা প্রশাসনের সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ব্রেট ব্রুয়েন মন্তব্য করেছেন, “তিনি সংবাদ চক্র নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না — যেটায় তিনি অভ্যস্ত ছিলেন। কেন এই যুদ্ধে গেলেন এবং এরপর কী হবে — এটা তিনি এখনও ব্যাখ্যা করতে পারছেন না। তাঁর বার্তায় আগের সেই জোর নেই।”

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধে প্রশাসনের ভেতরেই স্বীকার করা হচ্ছে, সংঘাতের পরিণতি আগে থেকে ভালোমতো যাচাই করা হয়নি।