৪৮ দলের মহারণ শুরু ১১ জুন

বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬

৪৮ দলের মহারণ শুরু ১১ জুন

গাজীপুর কণ্ঠ, খেলা ডেস্ক

আর মাত্র এক দিনের অপেক্ষা। এর পরই শুরু হবে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সবচেয়ে বেশি দর্শকনন্দিত ক্রীড়া আয়োজন- ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬। ১১ জুন পর্দা উঠছে ফুটবলের এই মহাযজ্ঞের। এবার শুধু আরেকটি বিশ্বকাপ নয়, এটি হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে দীর্ঘ এবং সবচেয়ে বিস্তৃত আসর। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দেশ অংশ নিচ্ছে বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে।

প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ যৌথভাবে আয়োজন করছে টুর্নামেন্ট আর প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হবে ১০৪টি ম্যাচ। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিশ্বকাপকে ঘিরে ইতোমধ্যেই বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে উৎসবের আমেজ। কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর চোখ এখন উত্তর আমেরিকার দিকে।

নতুন যুগে প্রবেশ বিশ্বকাপ: ১৯৩০ সালে

উরুগুয়েতে প্রথম বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল মাত্র ১৩টি দল নিয়ে। এরপর ধীরে ধীরে বিশ্বকাপের পরিধি বেড়েছে। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০২২ পর্যন্ত বিশ্বকাপে অংশ নেয় ৩২টি দল। তবে ফুটবলের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা, নতুন নতুন দেশের উত্থান এবং বিশ্বব্যাপী অংশগ্রহণ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে ফিফা এবার দলসংখ্যা বাড়িয়ে করেছে ৪৮।

নতুন ফরম্যাটে ৪৮টি দলকে ১২টি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি গ্রুপে থাকছে চারটি দল। গ্রুপ পর্ব শেষে প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ দুই দল এবং সেরা আটটি তৃতীয় স্থানধারী দল মিলিয়ে মোট ৩২টি দল উঠবে নকআউট পর্বে। এরপর শুরু হবে রাউন্ড অব ৩২. রাউন্ড অব ১৬. কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল এবং ফাইনালের লড়াই। ফিফার মতে, এই পরিবর্তনের ফলে এশিয়া, আফ্রিকা এবং উত্তর আমেরিকার দেশগুলো আরও বেশি সুযোগ পাবে বিশ্বকাপের মূল পর্বে অংশ নেওয়ার। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বকাপে জায়গা না পাওয়া অনেক দেশ এবার নিজেদের সামর্থ্য দেখানোর সুযোগ পেয়েছে।

তিন দেশের যৌথ আয়োজন বিশ্বকাপ ২০২৬

আয়োজন করছে তিন প্রতিবেশী দেশ-যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ একসঙ্গে এই আয়োজনের দায়িত্ব পেয়েছে। মোট ১৬টি শহরে অনুষ্ঠিত হবে ম্যাচগুলো।

যুক্তরাষ্ট্রের ভেন্যুসমূহ: নিউইয়র্ক-নিউজার্সি, লস অ্যাঞ্জেলেস, ডালাস, হিউস্টন, আটলান্টা, সিয়াটল, মায়ামি, বোস্টন, ফিলাডেলফিয়া, সান ফ্রান্সিসকো (সান্তা ক্লারা) এবং কানসাস সিটি।

কানাডার ভেন্যু: টরন্টো এবং ভ্যাঙ্কুভার।

মেক্সিকোর ভেন্যু: মেক্সিকো সিটি, গুয়াদালাহারা এবং মনতেরে।

সবচেয়ে বেশি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রে। যুক্তরাষ্ট্রে। ১০৪টি ম্যাচের মধ্যে ৭৮টি ম্যাচই হবে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সিটিতে।

উদ্বোধন থেকে ফাইনাল: বিশ্বকাপের উদ্বোধনী

ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে ১১ জুন, মেক্সিকো সিটির কিংবদন্তি এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামে। এটি এমন একটি স্টেডিয়াম, যেখানে অতীতে পেলের ব্রাজিল এবং দিয়েগো ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতেছিল। ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১৯ জুলাই, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক-নি-উজার্সি অঞ্চলের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। প্রায় ৮২ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার এই স্টেডিয়ামকে বিশ্বকাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। 

রেকর্ড গড়ছে মেক্সিকো : বিশ্বকাপ ২০২৬ মেক্সিকোর জন্যও ঐতিহাসিক। ১৯৭০ এবং ১৯৮৬ সালের পর এবার তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ আয়োজন করছে দেশটি। এর আগে কোনো দেশ তিনবার বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ পায়নি। অন্যদিকে এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামও গড়তে যাচ্ছে অনন্য এক রেকর্ড। এটি হবে বিশ্বের প্রথম স্টেডিয়াম, যেখানে তিনটি আলাদা বিশ্বকাপের ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে।

কারা শিরোপার দাবিদার : বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই আলোচনায় সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়নদের নাম। সবচেয়ে বেশি আলোচিত দল বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। ২০২২ সালে কাতারে দীর্ঘ ৩৬ বছরের অপেক্ষা ঘুচিয়ে শিরোপা জিতেছিল লিওনেল মেসির দল। এবারও শক্তিশালী স্কোয়াড নিয়ে মাঠে নামছে আর্জেন্টিনা।

ইউরোপের শক্তিধর ফ্রান্সও অন্যতম ফেভারিট। টানা দ্বিতীয় বিশ্বকা জয়ের খুব কাছে গিয়েও ২০২২ সালে ফাইনালে হেরে যায় তারা। কিলিয়ান এমবাপ্পেকে ঘিরে আবারও শিরোপা জয়ের স্বপ্ন দেখছে ফরাসিরা।

স্পেন, ইংল্যান্ড এবং জার্মানিও রয়েছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তরুণ প্রতিভায় সমৃদ্ধ হয়েছে এই দলগুলো। অন্যদিকে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল দীর্ঘদিন ধরে শিরোপা-খরায় ভুগছে। ২০০২ সালের পর আর বিশ্বকাপ জিততে পারেনি সেলেসাওরা। তাই ২০২৬ বিশ্বকাপ ব্রাজিলের জন্যও বড় পরীক্ষা।

পর্তুগালও আলোচনায় রয়েছে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর কারণে। যদি তিনি খেলেন, তাহলে এটি হতে পারে তার ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ এবং সম্ভবত রেকর্ড ষষ্ঠ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ।

নতুন তারকাদের বিশ্বকাপ : বিশ্ব ফুটবলের প্রজন্ম বদলের একটি বড় মঞ্চও হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপ ২০২৬। মেসি ও রোনালদোর যুগ শেষ হওয়ার পথে। তাদের উত্তরসূরি হিসেবে ইতোমধ্যেই আলোচনায় উঠে এসেছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে, জুড বেলিংহ্যাম, লামিন ইয়ামাল, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, এরলিং হালান্ড, জামাল মুসিয়ালা, ফিল ফোডেনসহ একঝাঁক তরুণ ফুটবলার।

বিশ্বকাপের মতো মঞ্চেই সাধারণত জন্ম নেয় নতুন কিংবদন্তি। তাই ফুটবলবিশ্বের নজর থাকবে তরুণদের ওপরও।

অর্থনীতির বিশ্বকাপ : বিশ্বকাপ এখন শুধু ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি একটি বিশাল অর্থনৈতিক আয়োজন। বিশ্লেষকদের ধারণা, বিশ্বকাপ ২০২৬ থেকে ফিফার আয় ১৩ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। টেলিভিশন সম্প্রচার, স্পন্সরশিপ, বিজ্ঞাপন, টিকিট বিক্রি এবং পর্যটন খাত থেকে বিপুল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হবে। আয়োজক তিন দেশের বিভিন্ন সিটিতে লাখ লাখ পর্যটক সমাগমের আশা করা হচ্ছে। হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন এবং খুচরা ব্যবসায়ও এর বড় প্রভাব পড়বে।

বিশ্বজুড়ে উৎসবের অপেক্ষা : বিশ্বকাপ মানেই শুধু ফুটবল নয়; এটি আবেগ, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং বৈশ্বিক মিলনমেলার নাম। চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত এই প্রতিযোগিতার জন্য অপেক্ষা করে থাকে গোটা পৃথিবী। আফ্রিকার গ্রাম থেকে ইউরোপের নগরী, লাতিন আমেরিকার সমুদ্রতীর থেকে এশিয়ার জনপদÑসবখানেই বিশ্বকাপ ঘিরে তৈরি হয় এক অনন্য উন্মাদনা।

বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। দেশের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী ইতোমধ্যে প্রিয় দলের পতাকা টাঙাতে শুরু করেছেন। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন কিংবা পর্তুগালের সমর্থকদের মধ্যে শুরু হয়েছে তর্ক-বিতর্ক, বিশ্লেষণ আর স্বপ্ন দেখা।

২০২৬ বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর। ১১ জুন যখন মেক্সিকো সিটির আকাশে উদ্বোধনের আলো জ্বলে উঠবে, তখন শুরু হবে এক মাসেরও বেশি সময়ব্যাপী সেই মহারণ, যার দিকে তাকিয়ে থাকবে সমগ্র পৃথিবী। আর ১৯ জুলাই ফাইনালের বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে ফুটবল বিশ্ব পাবে নতুন এক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন অথবা পুরোনো কোনো শক্তির নতুন করে প্রতিষ্ঠা।