গাজীপুর কণ্ঠ, খেলা ডেস্ক
ম্যাচের তখন ৮২ মিনিট চলছে। বক্সের ঠিক বাইরে ফ্রি কিক পেল যুক্তরাষ্ট্র। দারুণ এক মাপা শটে গোলকিপারকে পরাস্ত করলেন আসরে তাদের সেরা পারফরমারদের একজন মালিক টিলম্যান। গর্জনে ফেটে পড়ল যেন গোটা সেটডিয়াম। ধারাভাষ্যকার বললেন, “এই স্টেডিয়ামের যদি ছাদ থাকত, এই গর্জনে তা এখন উড়ে যেত।”
ওই গোলের আগেও যুক্তরাষ্ট্র এক গোলে এগিয়ে ছিল। তবে একজন কম নিয়েও খেলতে হচ্ছিল তাদের। প্রথমার্ধে গোলটি যিনি করেছিলেন, সেই ফ্লোরিয়ান বালোগন হয়ে উঠছিলেন নায়ক থেকে খলনায়ক। ৬৪তম মিনিটে বাজে ফাউল করে লাল কার্ড দেখেন এই বিশ্বকাপে তিন গোল করা তারকা। তবে তাকে খলনায়ক হয়ে উঠতে দেননি সতীর্থরা। বরং ১০ জনের দলও করল আরেকটি গোল।
স্যান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়া স্টেডিয়ামে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে ২-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় পৌঁছে গেল যুক্তরাষ্ট্র।
গোটা ম্যাচে গোলে আটটি শট নিলেও স্রেফ দুটি লক্ষ্যে রাখতে পারে তারা। কাজ হয়ে যায় সেই দুটিতেই। আরও দুবার অবশ্য জালে বল পাঠিয়েছিল তারা। গোল হয়নি অফসাইডের কারণে।
গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচেই প্রথম ১১ মিনিটের মধ্যে গোলের দেখা পেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। সেই ধারায় ছেদ পড়ে এই ম্যাচে। প্রথম গোলের জন্য অপেক্ষা করতে হয় প্রথমার্ধের শেষ পর্যন্ত। তবে ম্যাচ তারা জিতে নিয়েছে ঠিকই।
বালোগনের লাল কার্ডের পর নির্ধারিত সময়ের বাকি ২৬ মিনিট ও যোগ করা সময়ের ১১ মিনিট ১০ জন নিয়ে খেলেও গোল হজম করেনি মৌরিসিও পচেত্তিনোর দল।
সেরা তৃতীয় স্থানের দলগুলির একটি হিসেবে গ্রুপ পর্ব উতরানো বসনিয়া থেমে গেল এখানেই।
বসনিয়ার কিংবদন্তি এদিন জেকোর এটি ছিল ১৫১তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুর দিকে চোট নিয়ে মাঠ ছাড়েন তিনি। ৪০ বছর বয়সী স্ট্রাইকার হয়তো ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচটি খেলে ফেললেন।
বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার সকালে ম্যাচের প্রথম ১০ মিনিটে দুই দলই চেষ্টা করে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার। প্রথম গোলে শট নেয় বসনিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের টিলম্যান দ্রুতগতিতে বসনিয়ার বক্সে ঢুকলেও বলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। গোলরক্ষকের কাছ থেকে লম্বা কিক নিয়ে বসনিয়া আক্রমণে ওঠে। দারুণ দক্ষতায় বলটি নিয়ন্ত্রণে নেন জেকো। তার কাছ থেকে বল পেয়ে শট নেন এরমেদিন দেমিরোভিচ, তবে বল বাইরে পাঠিয়ে দেন গোলকিপার ম্যাট ফ্রিজ।
পরের মিনিটে কেরিম আলাইরবেগোভিচের সুইঙ্গিং কর্নারও ঠেকান ফ্রিজ।
অষ্টাদশ মিনিটে ডান দিক দিয়ে ফাঁকা জায়গায় ক্রস করেন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্টন ম্যাককেনি। তবে ঘুষি মেরে বল ক্লিয়ার করার চেষ্টা করেন বসনিয়া গোলকিপার নিকোলা ভাসিলি। অ্যান্টোরি রবিনসনের গায়ে লেগে বল বারের সামান্য উপর দিয়ে চলে যায়।
বালোগন ততক্ষণে যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণের প্রাণ হয়ে উঠেছেন বরাবরের মতোই। ৩১তম মিনিটে জালের দেখাও পান ২৪ বছর বয়সী স্ট্রাইকার। তবে ডান পায়ে বল ধরে বাম পায়ে তার দারুণ ফিনিশিংয়ের সঙ্গে সঙ্গেই অফসাইডের পতাকা উঠে যায়।
গোল না হলেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ রয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রেরই। তবে ৪৫ মিনিট পর্যন্ত দুই দল মিলিয়ে লক্ষ্যে শট ছিল একটিই, সেই শুরুতে বসনিয়ার। কিন্তু এরপরই যুক্তরাষ্ট্রের গোল।
কিছুটা সৌভাগ্যের ছোঁয়া ছিল গোলের প্রেক্ষাপটে। মাঝমাঠের ওপর থেকে থ্রু বল বাড়ান টিলম্যান। বসনিয়ার দুজেনর পায়ে লেগে বক্সের ভেতর বল পান বালোগন। দুই ডিফেন্ডার আর আগুয়ান গোলকিপারকে ফাঁকি দিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় বল জালে জড়ান মোনাকোর স্ট্রাইকার।
যোগ করা সময়ের অষ্টম মিনিটে সার্জিনিও দেস্তের হেডে বল পেয়ে খুব কাছ থেকে বালোগনের শট ক্রস বারে লেগে চলে যায় বাইরে।
দ্বিতীয়ার্ধের প্রথম ১৮ মিনিটে উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটেনি। এরপরই বালোগনের বিদায়। বলের লড়াইয়ে পেছন মাড়িয়ে দেন তিনি তারিক মুহারেমোচের পা। রিপ্লে দেখে যদিও মনে হয়নি ইচ্ছাকৃত, তবে বেশ বাজে ফাউলই ছিল। ভিএআর দেখে সরাসরি লাল কার্ড দেন রেফারি।
হতাশ বালোগন জার্সিতে মুখ ঢেকে ১৫-২০ সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে আস্তে আস্তে মাঠ ছাড়েন। তাকে সান্ত্বনা দেন সতীর্থরা।
একজন বেশি নিয়েও বসনিয়া পরিষ্কার সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। উল্টো ৭৮তম মিনিটে ম্যাককেনির বাড়ানো বলে কাছ থেকে বল জালে পাঠান ক্রিস্তিয়ান পুলিসিক। তবে চোট কাটিয়ে শুরুর একাদশে ফেরা তারকা ছিলেন অফসাইড।
দ্বিতীয় গোলটি ধরা দেয় এর পরপরই। টিলম্যানের ফ্রি কিকে জোর অনেক ছিল না, তবে ছিল মাপা। ডাইভ দিয়ে বলে হাত ছোঁয়ালেও বাঁচাতে পারেননি গোলকিপার ভাসিলি।
১০ জনের দলের বিপক্ষেও বক্সে ঢুকতে পারছিল না বসনিয়া। শেষ দিকে দূর থেকে কয়েকটি শট নিলেও তা বাইরে চলে যায়। শেষ বাঁশির পর গ্যালারি আর মাঠের উৎসব হয়ে ওঠে একাকার।
কোয়ার্টার-ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে সিয়াটলে আগামী মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় সকাল ৬টায় যুক্তরাষ্ট্র লড়বে বেলজিয়ামের বিপক্ষে।