ক্ষমতায় ফিরতে ‘ইসরায়েলের এজেন্ট’ হয়ে উঠেছিলেন আহমেদিনেজাদ: নিউইয়র্ক টাইমস

কয়েক বছর ধরে ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্টকে ‘গোয়েন্দা সম্পদ’ হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছিল ইসরায়েল। যুদ্ধের প্রথমদিকে তাকে একটি ইসরায়েলি সেফ হাউসে নেওয়ার নাটকীয় চেষ্টাও চালানো হয়েছিল। কিন্তু শেষপর্যন্ত সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।

ক্ষমতায় ফিরতে ‘ইসরায়েলের এজেন্ট’ হয়ে উঠেছিলেন আহমেদিনেজাদ: নিউইয়র্ক টাইমস

গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক

২০২৪ সালের শুরুর দিকের কথা। বুদাপেস্টের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর হঠাৎ হাঙ্গেরি সরকারের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার কাছ থেকে চমকে দেওয়ার মতো অনুরোধ পেলেন।

রেক্টর অধ্যাপক গেরগেলি ডেলিকে ওই সরকারি কর্মকর্তা জানান, তাদের লুডোভিকা ইউনিভার্সিটি অভ পাবলিক সার্ভিস-এ জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে একটি সম্মেলন আয়োজন করতে হবে। আর সেখানে আমন্ত্রণ জানাতে হবে অপ্রত্যাশিত এক অতিথিকে—ইরানের বহুল আলোচিত-সমালোচিত সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ।

এর পেছনের কারণটা ছিল আরও বেশি চমকপ্রদ। ডেলিকে জানানো হয়, ওই সম্মেলন আসলে লোকদেখানো আবরণ! আসল উদ্দেশ্য হলো, বুদাপেস্টে আহমাদিনেজাদের সঙ্গে তার কট্টর শত্রু ইসরায়েলের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের গোপন বৈঠকের ব্যবস্থা করা।

ডেলি জানতেন, এই একটা আমন্ত্রণের তার নিজের ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ণ করতে পারে। কিন্তু এক সাক্ষাৎকারে এই অধ্যাপক বলেন, তার মনে হয়েছিল এর মাধ্যমে হয়তো অনেক মানুষের জীবন বাঁচানো যাবে।

‘দুই শত্রু যখন একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে চাইছে, তখন তাদের সেই আলোচনার ব্যবস্থা করে দেওয়াটাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ,’ বলেন তিনি।

২০২৪ সালে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে আহমাদিনেজাদের প্রথম সফর ও তার পরের বছর দ্বিতীয় সফর ছিল ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ। উদ্দেশ্য: সাবেক এই ইরানি প্রেসিডেন্টকে এমন এক ‘গোয়েন্দা সম্পদ’ হিসেবে গড়ে তোলা, যাতে সময়মতো তাকেই ইরানের নতুন নেতা হিসেবে ক্ষমতার মসনদে বসানো যায়। সংবেদনশীল এই অভিযান সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কয়েকজন মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে এ তথ্য জানান।

আহমাদিনেজাদকে দলে টানা ইসরায়েলের জন্য কতটা জরুরি ছিল, তার প্রমাণ মেলে আরেকটি ঘটনায়। সাবেক মার্কিন কর্মকর্তারা বলেন, ২০২৪ সালে খোদ তৎকালীন ইসরায়েলি গুপ্তচরপ্রধান ডেভিড বার্নিয়া নিজে হাঙ্গেরির রাজধানীতে গিয়েছিলেন আহমাদিনেজাদের সঙ্গে দেখা করার জন্য। এর পরপরই সিআইএকে ইসরায়েলের বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ জানায়, আহমাদিনেজাদের সঙ্গে তারা যোগাযোগ স্থাপন করেছে।

যে মানুষ একসময় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিয়েছিলেন, যিনি নিয়মিত ইসরায়েলকে ধ্বংস করার প্রকাশ্য হুমকি দিতেন এবং হলোকাস্টের অস্তিত্ব অস্বীকার করতেন, সেই আহমাদিনেজাদকে ঘিরেই ইরানে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ইসরায়েল। দুই দেশের বৈরী সম্পর্কের ইতিহাসে এর চেয়ে বড় ও নাটকীয় মোড় বোধহয় আর হতে পারে না।

মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, গত কয়েক বছরে ইসরায়েল গোপনে আহমাদিনেজাদের আবাসন ও ভ্রমণের জন্য অর্থ জুগিয়েছে। বুদাপেস্ট সফর ছাড়াও বিদেশে একাধিকবার তার সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছেন ইসরায়েলি গোয়েন্দারা।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা শুরু হয়। ওই সময় তেহরানে কড়া নজরদারির মধ্যে থাকা সাবেক এই নেতাকে সরিয়ে নেওয়ার এক দুঃসাহসিক অভিযানের মধ্য দিয়ে সেই দীর্ঘমেয়াদি চেষ্টা চূড়ান্ত রূপ পায়। ওই অভিযানের লক্ষ্য ছিল বর্তমান সরকারকে উৎখাত করে আহমাদিনেজাদকে ক্ষমতায় বসানো।

কিন্তু ওই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।

২৮ ফেব্রুয়ারি আহমাদিনেজাদের বাসভবন চত্বরে ইসরায়েলি বিমান হামলা হয়। তার দেহরক্ষীদের ভবন ও তার বুলেটপ্রুফ গাড়িটিকে নিশানা করা হয়েছিল। চারজন শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তা বলেন, হামলার পরপরই সেখানে একটি কালো পিউজো গাড়ি আসে। সেই বিশৃঙ্খলার মধ্যে আহমাদিনেজাদকে তুলে নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ছাড়ে গাড়িটি।

এই অভিযান সম্পর্কে ওয়াকিবহাল মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, গাড়িটি চালাচ্ছিলেন মোসাদ এজেন্টরা। আহমাদিনেজাদকে তারা ইরানের ভেতরেই একটি গোপন সেফ হাউসে নিয়ে যান।

কিন্তু ওই বিশৃঙ্খল উদ্ধার অভিযান নিয়ে সাবেক এই ইরানি প্রেসিডেন্ট বিরক্ত ছিলেন বলে জানান ঘটনার বিষয়ে অবগত ব্যক্তিরা। তাকে ক্ষমতায় ফেরাতে ইসরায়েলের পরিকল্পনা নিয়ে আহমাদিনেজাদের মোহভঙ্গ হয়েছিল বলে মনে হচ্ছিল।

শেষপর্যন্ত তিনি ওই সেফ হাউস ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। যদিও ঠিক কী পরিস্থিতিতে তিনি সেখান থেকে বের হন, তা আজও জানা যায়নি। এরপর থেকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি আহমাদিনেজাদকে। অবশেষে গত সোমবার নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজায় সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য তাকে দেখা যায়।

বর্তমানে তিনি ঠিক কী অবস্থায় আছেন, তা এখনও অস্পষ্ট। তবে চারজন শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তা বলেছেন, আহমাদিনেজাদ এখন ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) গোয়েন্দা শাখার হেফাজতে রয়েছেন। ইসরায়েলের সঙ্গে তার এই গোপন যোগাযোগের অনেক কিছুই এখন ইরান জেনে গেছে। সে কারণেই তাকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে।

তেহরান সরকারের পতন ঘটানোর বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ ছিল আহমাদিনেজাদকে ক্ষমতায় বসানোর এই পরিকল্পনা। তবে এ নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি ইসরায়েলি কর্মকর্তারা। এ প্রচেষ্টার আরেকটি অংশ ছিল উত্তর ইরাকে ঘাঁটি গেড়ে থাকা ইরানি কুর্দি বিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেওয়া। পরিকল্পনা ছিল, তারা পশ্চিম ইরানে ঢুকে ওই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজধানী তেহরানের দিকে অগ্রসর হবে। সেই পরিকল্পনাও আলোর মুখ দেখেনি।

নিউইয়র্ক টাইমসে আহমাদিনেজাদের এই ভূমিকার কথা প্রথম প্রকাশের পর গত মে মাসে পিবিএসে টক শো ‘ফায়ারিং লাইনে’ এ নিয়ে কথা বলেছিলেন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান তামির হেম্যান। তিনি বলেন, ইরানে সরকার পরিবর্তনের ওই পরিকল্পনায় ‘পরপর কয়েকটি বিশেষ অভিযান চালানোর কথা ছিল, যা সম্পূর্ণ অভিনব। সেই অভিযানেরই একটা অংশ ছিলেন আহমাদিনেজাদ।’

এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও মোসাদ কর্মকর্তারা সাড়া দেননি।

আহমাদিনেজাদের মুখপাত্র আলি আকবর জাভানফেকরও কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

ক্ষমতা ছাড়ার পর আহমাদিনেজাদের পরিবর্তন

২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন আহমাদিনেজাদ ছিলেন দেশটির সবচেয়ে বিখ্যাত কট্টরপন্থি রাজনীতিবিদ। ইসরায়েলকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার কথা বলতেন তিনি। তার আমলেই ইরান নতুন করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি শুরু করে। এতে সন্দেহ তৈরি হয়, গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে হাঁটছে তেহরান। ২০০৯ সালে তার পুনরায় নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে দেশে গড়ে ওঠা বিক্ষোভ কঠোর হস্তে দমন করেছিলেন তিনি। তার শাসনামলে অনেক ভিন্নমতাবলম্বীর ফাঁসি হয়েছিল, কারাদণ্ড হয়েছিল বহু বিরোধী ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে।

কিন্তু প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়ার পর ক্রমেই কট্টর অবস্থান থেকে সরে আসতে শুরু করেন আহমাদিনেজাদ। ইসরায়েল-বিরোধী কড়া বক্তব্য দেওয়া কমে আসে। নিজেকে মডারেট হিসেবে নতুন রূপে তুলে ধরতে চেষ্টা শুরু করেন। একের পর এক সাক্ষাৎকার দেন, ভাষণ দেন। সেখানে ইরানের পপ মিউজিক সংস্কৃতি নিয়ে নিজের মতামত জানান। এমনকি তিনি নিরাপত্তা বাহিনীর মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগেরও সমালোচনা করেন। আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে।

পরিবর্তন আসে তার পোশাকেও। চিরচেনা ঢিলেঢালা খাকি উইন্ডব্রেকার পোশাক ছেড়ে টেইলরড স্যুট পরতে শুরু করেন। অগোছালো দাড়ি ছেঁটে পরিপাটি করে ফেলেন। সম্ভবত বোটক্স চিকিৎসাও করিয়েছেন। ইংরেজি শিখতেও শুরু করেন তিনি।

তেহরানে নিজের অফিসে প্রতিদিন সকালে এক ঘণ্টা সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগ শুনতেন তিনি। সরকারি আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে পড়া অনেকে আসতেন তার সাহায্য চাইতে। কখনো কখনো আবেদনকারীদের ঋণ দিতে সুপারিশ করে বিভিন্ন সরকারি মন্ত্রণালয়ে চিঠিও লিখতেন তিনি। পাশাপাশি চলত দেশজুড়ে নিয়মিত সফর। শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম—সব জায়গায় গিয়ে দেখা করতেন সমর্থকদের সঙ্গে।

ইরান সরকারের সঙ্গে আহমাদিনেজাদের সম্পর্ক ছিল বেশ জটিল। শীর্ষ নেতারা তাকে একঘরে করে রেখেছিলেন, তার চলাফেরার ওপরও বিধিনিষেধ ছিল। তা সত্ত্বেও, সর্বোচ্চ নেতাকে পরামর্শ দেওয়ার জন্য যে উচ্চপর্যায়ের কাউন্সিল রয়েছে, সেখানে অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার জন্যও একটি আসন বরাদ্দ ছিল। ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েকদিন আগে ওই কাউন্সিলের বৈঠকেও উপস্থিত ছিলেন তিনি।

আহমাদিনেজাদের এই পরিবর্তনের পেছনে রাজনৈতিক সমীকরণ দেখেছিলেন ইরানের অনেকে। তাদের মতে, এটা ছিল নিজের পপুলিস্ট ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করার এবং শাসকগোষ্ঠীর থেকে নিজের দূরত্ব প্রমাণের চতুর কৌশল। তবে ইরানের শ্রমজীবীদের মধ্যে তার বড় সমর্থকগোষ্ঠী তখনো অটুট ছিল। আর তার উপদেষ্টারা নিশ্চিত ছিলেন, সাবেক এই প্রেসিডেন্টের লক্ষ্য ছিল আবারও ক্ষমতায় ফেরা।

আহমাদিনেজাদের একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও শীর্ষ উপদেষ্টা আবদুলরেজা দাভেরি টেলিফোন সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘টাকার জন্য আহমাদিনেজাদ এসব করবেন না। তার টাকা আছে, বিশাল অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক আছে। তিনি এসব করলে ক্ষমতার জন্যই করবেন। তিনি ক্ষমতার মসনদে বসতে চান।’ কয়েক বছর আগে আহমাদিনেজাদের সঙ্গে দাভেরির দূরত্ব তৈরি হয়।

আহমাদিনেজাদের ঘনিষ্ঠ বলয়ের একজন ব্যক্তি নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, বিদেশি শক্তির সহায়তায় ভবিষ্যতে ইরানের ক্ষমতায় বসার উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা কয়েকজন বিশ্বস্ত সহযোগী ও ঘনিষ্ঠ অনুচরকে জানিয়েছিলেন ইরানের সাবেক এই প্রেসিডেন্ট। 

ওই সহযোগী বলেন, তিনবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অযোগ্য ঘোষিত হওয়ার পর ইসলামি প্রজাতন্ত্র ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন আহমাদিনেজাদ। বুঝতে পারেন, বর্তমান ব্যবস্থা বহাল থাকলে তার পক্ষে আর কোনোদিনই ক্ষমতায় ফেরা সম্ভব নয়।

তিনি আরও বলে, আহমাদিনেজাদের আশঙ্কা ছিল, যুদ্ধ বা সরকার পরিবর্তন হলে আমেরিকা ও ইসরায়েল হয়তো দেশের বাইরে থাকা এমন কোনো বিরোধী নেতাকে বেছে নেবে, যার নিজের দেশ সম্পর্কে কোনো ধারণা থাকবে না। আর তার জেরে চরম অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে ইরান। ঘনিষ্ঠ মহলে আহমাদিনেজাদ নিজেকে একজন সংস্কারক হিসেবে তুলে ধরতেন। বলতেন, রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিনের মতো ঐতিহাসিক ভূমিকা নিতে পারেন তিনি। 

ওই সহযোগী আরও দাবি করেন, আহমাদিনেজাদ বলেছিলেন, তিনি ক্ষমতায় এলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের অংশ হিসেবে ইরান ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেবে এবং দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে।

আহমাদিনেজাদ ও ইরান সরকারের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হওয়ার বিষয়টির ওপর চোখ রাখছিল ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। ওই সময়কার গোয়েন্দা মূল্যায়নের সঙ্গে যুক্ত দুই ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেন, বিশেষ করে আয়াতুল্লাহ খামেনি ও অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের প্রতি আহমাদিনেজাদের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের ওপর ইসরায়েলের নজর পড়েছিল। ওই নেতারা তাকে ফের প্রেসিডেন্ট পদে লড়ার অযোগ্য ঘোষণা করেছিলেন।

বিদেশি হস্তক্ষেপ থেকে ইরানকে রক্ষার দায়িত্ব পালন করে আইআরজিসির গোয়েন্দা শাখা আল কুদস ফোর্স। ২০১৭ সাল থেকেই আহমাদিনেজাদের কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে সংস্থাটির সন্দেহ হতে শুরু করে। আইআরজিসির দুই সদস্য ও সংশ্লিষ্ট একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ২০১৭ সালে আহমাদিনেজাদ যখন ট্রাম্প এবং পরে সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানকে প্রকাশ্যে চিঠি পাঠাতে শুরু করেন, তখন থেকে সেই সন্দেহ আরও বাড়ে। ট্রাম্প এই দুই নেতারই ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। 

ওই চার কর্মকর্তার তথ্যমতে, চলতি বছর ইসরায়েলি হামলার সেই বিশৃঙ্খলার সুযোগে প্রথমে আইআরজিসির নজরদারি থেকে মুক্ত হয়েছিলেন আহমাদিনেজাদ। তারপরই ইসরায়েলের সঙ্গে তার গোপন যোগাযোগের সুতো মেলাতে তদন্তে নামে ইরানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। 

বিদেশে গোপন বৈঠক

ইসরায়েলি এজেন্টরা ঠিক কবে প্রথম আহমাদিনেজাদকে দলে টানার চেষ্টা করেছিল, তা স্পষ্ট নয়। তবে ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২৩ সালে অন্তত কিছুটা প্রাথমিক যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল। সে বছর পরিবেশ বিষয়ক এক সম্মেলনে যোগ দিতে গুয়েতেমালা সফরে গিয়েছিলেন আহমাদিনেজাদ। গুয়েতেমালা সরকারই তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশের তুলনায় ইসরায়েলের সঙ্গে গুয়েতেমালার কূটনৈতিক সম্পর্ক বেশি ঘনিষ্ঠ।

তেহরান বিমানবন্দরে নিরাপত্তা বাহিনী আহমাদিনেজাদকে বোর্ডিং পাস দিয়ে দেশ ছাড়তে দিতে রাজি না হওয়ায় তার ওই সফর প্রায় বাতিল হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। 

এর প্রতিবাদে আহমাদিনেজাদ বিমানবন্দরেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অবস্থান ধর্মঘট শুরু করেন। ব্যাপারটা প্রকাশ্য তামাশায় পরিণত হয়। সাধারণ ইরানি যাত্রী, এমনকি বিমানবন্দর ও এয়ারলাইন্সের কর্মীদের সঙ্গে ছবি তুলতে শুরু করেন তিনি। সেসব ছবি ও খবরের সর্বশেষ আপডেট সমানে পোস্ট হতে থাকে তার সোশ্যাল মিডিয়া পেজগুলোতে।

অবশেষে ইরানি কর্তৃপক্ষ আহমাদিনেজাদকে বিমানে ওঠার এবং ওই সম্মেলনে যোগ দেওয়ার অনুমতি দেয়। 

ওই সফরের একটি ভিডিওতে আহমাদিনেজাদকে বলতে শোনা যায়, ‘কিছু মানুষ আমাকে গুয়েতেমালা সফরে যেতে নিষেধ করেছিল। আমি তাদের বলেছি, ওখানকার পরিবেশমন্ত্রী আমার ভাইয়ের মতো, তিনি আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এটি লাতিন আমেরিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ।’

এর পরের বছর লুডোভিকা ইউনিভার্সিটির সম্মেলনে যোগ দিতে প্রথমবারের মতো হাঙ্গেরি যান তিনি। বুদাপেস্টে ডেভিড বার্নিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেন। বার্নিয়া গত মাস পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর মোসাদের নেতৃত্ব দিয়েছেন।

তৎকালীন কট্টর ডানপন্থি প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের নেতৃত্বাধীন হাঙ্গেরির সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক ইউরোপের যেকোনো দেশের চেয়ে ঘনিষ্ঠ ছিল। অরবান ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিয়মিত একে অপরের দেশে সফর করতেন। ২০২৫ সালের এপ্রিলে নেতানিয়াহু লুডোভিকা ইউনিভার্সিটিতে ভাষণ দিয়েছেন। 

এর দুই মাস পরে, ইরানে ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর মাত্র কয়েকদিন আগে, আবারও বুদাপেস্টে যান আহমাদিনেজাদ। আসলে এই সফরের আড়ালে ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের সঙ্গে বৈঠক করতে গিয়েছিলেন তিনি।

বিদেশ সফরে সবসময় আহমাদিনেজাদের সঙ্গী হতেন আইআরজিসির আনসার ইউনিটের দেহরক্ষীরা। তাদের রিপোর্ট বলছে, ২০২৫ সালের জুনের ওই সফরে অন্তত দুইবার নিরাপত্তারক্ষীদের চোখে ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘ বৈঠকের জন্য উধাও হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। 

ওই সফর নিয়ে দেওয়া এক প্রতিবেদনে দেহরক্ষীরা জানান, হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়ার বিষয়ে তারা আহমাদিনেজাদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন। জবাবে তিনি বলেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন তিনি। আইআরজিসির দুই সদস্য ও একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা নিউইয়র্ক টাইমসকে এসব তথ্য জানান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই সম্মেলনে ইংরেজিতে ভাষণ দেন ইরানের সাবেক এই প্রেসিডেন্ট। তবে সেদিন ভাষণের শুরুতে কোরআনের আয়াত পাঠ করার চিরাচরিত নিয়ম ঝেড়ে ফেলে উপস্থিত সবাইকে অবাক করে দিয়েছিলেন তিনি।

সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা ওই সফরের ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, গাঢ় নীল রঙের স্যুট পরা আহমাদিনেজাদ ‘অংশীদারিত্বমূলক মানবতা’ ও ‘পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থা’ নিয়ে কথা বলছেন। কীভাবে নতুন বিশ্বের উত্থান ঘটতে পারে, তা নিয়ে নিজের দৃষ্টিভঙ্গিও তুলে ধরেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর গত মাসে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, আহমাদিনেজাদকে আমন্ত্রণ জানানোর ক্ষেত্রে তিনি কেবল একজন ‘স্ট্রোমান’, অর্থাৎ ‘পুতুল’-এর ভূমিকা পালন করেছিলেন।

ফেব্রুয়ারির শেষদিকে তেহরানের বাড়ি থেকে কালো পিউজো গাড়িতে করে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে গত সপ্তাহ পর্যন্ত একবারও জনসমক্ষে দেখা যায়নি আহমাদিনেজাদকে।

অবশেষে গত সোমবার আয়াতুল্লাহ খামেনির জানাজার মিছিলে তার ঝটিকা উপস্থিতি দেখা যায়। মিছিলের ভিডিওতে দেখা যায়, ৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের হাঁসফাঁস গরমেও ভারী জ্যাকেট ও সার্জিক্যাল মাস্ক পরে আছেন আহমাদিনেজাদ। ইরানের অন্য দুই জীবিত সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি ও মোহাম্মদ খাতামিকে ওই মিছিলে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি; জানাজার কোনো অনুষ্ঠানে তারা উপস্থিতও ছিলেন না।

আহমাদিনেজাদ ওই মিছিলে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কারও সঙ্গে কথা বলেননি। চারপাশ থেকে তাকে যারা ঘিরে রেখেছিলেন, তাদের দেখে নিরাপত্তারক্ষী মনে হচ্ছিল।