গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক
দেশের বৃহত্তম সিটি কর্পোরেশন গাজীপুরে প্রতিষ্ঠার এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও গড়ে ওঠেনি ন্যূনতম অবকাঠামো ও মৌলিক নাগরিক সেবা। বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা, ডেঙ্গুর প্রকোপ, খানাখন্দে ভরা সড়ক, ফুটপাত দখল, তীব্র যানজট, দুর্বল ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বিশুদ্ধ পানির সংকটে ক্রমেই ভোগান্তির নগরীতে পরিণত হয়েছে এই সিটি করপোরেশন—এমনটাই জানিয়েছে বণিক বার্তা।
নগরবাসীর অভিযোগ, সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার সময় যে আধুনিক ও পরিকল্পিত নগর গড়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি। খণ্ড খণ্ড কিছু উন্নয়ন হলেও সামগ্রিকভাবে তার কোনো প্রভাব পড়েনি নগরীতে; বরং আগের তুলনায় ভোগান্তি বেড়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
টঙ্গী ও গাজীপুর পৌর এলাকা নিয়ে দেশের বৃহত্তম সিটি কর্পোরেশন হিসেবে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের যাত্রা শুরু হয় ২০১৩ সালের ১৬ জানুয়ারি। ৫৭টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এই সিটির আয়তন ৩২৯ দশমিক ৫৩ বর্গকিলোমিটার এবং জনসংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থ গাসিক?
শিল্পপ্রধান এলাকা হওয়ায় গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হওয়ার কথা ছিল বিজ্ঞানসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। কিন্তু গত ১৩ বছরে এর প্রাথমিক শর্তই পূরণ করতে পারেনি সংস্থাটি। বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহ, সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন নির্মাণ এবং ল্যান্ডফিলে বর্জ্য সম্পদে রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে গাসিক।
নগরীর বিভিন্ন সড়ক ও মহল্লায় নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য না ফেলা এবং পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি ও জনবলের অভাবে খোলা স্থানে ময়লার স্তূপ সৃষ্টি হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। অর্ধেকের বেশি ওয়ার্ডে নেই সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন, ফলে গৃহস্থালি ও শিল্প বর্জ্য গিয়ে পড়ছে আশপাশের নদী, খাল ও জলাশয়ে।
এ প্রসঙ্গে গাসিকের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা বলেন, ল্যান্ডফিল নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতা ছিল এবং যানযন্ত্রপাতি ক্রয়েও সমস্যা রয়েছে, তবে আগামী ছয় মাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি সমাধানে পৌঁছানোর আশা প্রকাশ করেন তিনি।
অল্প বৃষ্টিতেই টঙ্গী, বোর্ডবাজার, কোনাবাড়ী, কাশিমপুর ও পুবাইলসহ বিভিন্ন এলাকার সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও খাল দখল এর অন্যতম কারণ।

নেই কোনো পার্ক বা গণপরিসর?
প্রতিষ্ঠার এক যুগ পেরিয়ে গেলেও নগরবাসীর জন্য গড়ে ওঠেনি কোনো আধুনিক বিনোদন কেন্দ্র বা শিশু পার্ক। নগরীর একমাত্র বড় উন্মুক্ত স্থান ঐতিহাসিক রাজবাড়ি মাঠও এখন আর সাধারণ মানুষের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত নয়—এর একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে ভাসমান ব্যবসায়ীদের দখলে, বাকিটা প্রায়ই বরাদ্দ থাকে রাজনৈতিক সমাবেশ ও সরকারি অনুষ্ঠানের জন্য।
সিটি কর্পোরেশনের সাম্প্রতিক প্রকাশিত প্রকল্প তালিকাতেও বড় পরিসরের কোনো শিশু পার্ক বা নগর বিনোদন পার্কের উল্লেখ পাওয়া যায়নি। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নগরীতে অসংখ্য সরকারি খাসজমি ও ভাওয়াল রাজ এস্টেটের জমি বছরের পর বছর প্রভাবশালী মহলের দখলে রয়েছে, যার একটি অংশও জনস্বার্থে ব্যবহার করা হয়নি।
বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট মনোয়ার হোসেন রনি বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত গাসিতে কোনো শিশু পার্ক বা বিনোদন স্পট গড়ে না ওঠা হতাশাজনক, আর নাগরিকরা উন্মুক্ত জায়গার অভাবে হাঁটাচলাও করতে পারেন না। তিনি জানান, ঐতিহাসিক ভাওয়াল রাজদীঘি সংস্কারে একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা সিটি করপোরেশনের সহায়তায় বাস্তবায়িত হলে বিনোদনের সংকট কিছুটা কমতে পারে।
কর বাড়লেও, বাড়েনি সেবার মান?
প্রতি বছর করের আওতা ও রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি পেলেও সেই অনুপাতে নাগরিক সেবার মান বাড়েনি। প্রতি পাঁচ বছর পরপর হোল্ডিং কর পুনর্মূল্যায়ন এবং নতুন নতুন হোল্ডিং করের আওতায় আসায় রাজস্ব বাড়লেও, নগরবাসী এখনো মানসম্মত সড়ক, কার্যকর ড্রেনেজ, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ ও পর্যাপ্ত স্ট্রিটলাইট সুবিধা থেকে বঞ্চিত। সিটি করপোরেশন এলাকার বিস্তীর্ণ জনপদ এখনো পাকা সড়ক ও সড়কবাতির আওতার বাইরে, ফলে এসব এলাকা কাগজে-কলমে শহরভুক্ত হলেও বাস্তবে রয়ে গেছে প্রত্যন্ত গ্রাম হিসেবেই।
ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, এত বছর পরও বর্জ্য, গণপরিসর ও সড়ক অবকাঠামো গড়ে তুলতে না পারাটা বিস্ময়কর, এবং একে সরকারের চরম অবহেলা বলে আখ্যা দেন তিনি। তার প্রশ্ন, গাজীপুরের ব্যর্থতা প্রমাণিত হওয়ার পরও কেন একের পর এক নতুন সিটি করপোরেশন ঘোষণা করা হচ্ছে, যেখানে ফলাফল শুধু জনগণের ঘাড়ে করের বোঝা।
সড়কের হাল যেমন
সিটি কর্পোরেশনের আওতায় প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার সড়ক থাকলেও এর অধিকাংশই এখন বেহাল। কোথাও বড় খানাখন্দ, কোথাও ভাঙাচোরা কার্পেটিং, কোথাও আবার অর্ধসমাপ্ত উন্নয়নকাজ দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় দুর্ভোগে পড়েন কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী ও ব্যবসায়ীরা।
উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে জয়দেবপুর-সালনা সড়ক, যা দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে; সালনা-শিমুলতলী সড়ক, যার সংস্কারকাজ অর্ধসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে; ধীরাশ্রম সড়ক, যেখানে কার্পেটিং উঠে গিয়ে বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে; এবং গাজীপুর-পূবাইল সড়কসহ শিববাড়ি-রাজবাড়ি-হারিণাল ও শিববাড়ি-শিমুলতলী সড়ক। বর্ষায় এসব সড়কের গর্তে পানি জমে ছোট যানবাহন ও মোটরসাইকেল চালকদের দুর্ভোগ ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
গাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিলা খানম বলেন, সংস্থাটি এখন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দিচ্ছে এবং ওয়েস্ট-টু-এনার্জি প্রকল্পের দিকে এগোচ্ছে, যদিও স্থানীয় বাধার কারণে সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন নির্মাণ কঠিন হয়ে পড়ছে। ফুটপাত, হকার ব্যবস্থাপনা ও গণপরিসর নিয়েও কাজ চলছে বলে জানান তিনি। তার ভাষায়, উন্নত দেশে আগে পরিকল্পিত শহর গড়ে ওঠে, তারপর মানুষ বসবাস শুরু করে; বাংলাদেশে ঘটে উল্টোটা—আগে বসতি গড়ে ওঠে, পরে জনসংখ্যা বাড়লে তা সিটি করপোরেশন ঘোষণা করা হয়, যার ফলে ব্যবস্থাপনা জটিল হয়ে পড়ে।
সূত্র: বণিক বার্তা