গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘিরে দায়ের হওয়া শতাধিক মামলার অভিযোগ তদন্তে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। এ কারণে বাদীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে পুলিশ, এ সংবাদ জানিয়েছে টাইমস অফ বাংলাদেশ।
তদন্ত কর্মকর্তাদের বরাতে টাইমস অফ বাংলাদেশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মনগড়া অভিযোগ, ব্যক্তিগত শত্রুতা ও বানোয়াট ঘটনার কারণে প্রকৃত মামলার তদন্ত কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
তদন্তে দেখা গেছে, যাদের নিহত বলে মামলায় দেখানো হয়েছিল তাদের কেউ কেউ আসলে জীবিত ও সুস্থ আছেন। কিছু মামলা হয়েছে দাম্পত্য কলহের জেরে, আবার কিছু মামলার বাদীকেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
অধিকাংশ মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ আওয়ামী লীগের নেতা, শত শত পুলিশ সদস্য ও সাধারণ নাগরিককে ঢালাওভাবে আসামি করা হয়েছে বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন। এতে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনে সময় লাগছে অনেক বেশি।
আদালতে সরাসরি দায়ের করা ব্যক্তিগত মামলাগুলোতেই সবচেয়ে বেশি অনিয়ম মিলেছে বলে জানান তদন্ত কর্মকর্তারা।
এদিকে অনেক নিহতকে ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন করা হয়েছিল। পরে ফরেনসিক প্রমাণের জন্য লাশ উত্তোলনের উদ্যোগ নিলে পরিবারগুলো বাধা দেয়, ফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ নষ্ট হয়ে গেছে।
সরকারি গেজেট অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আন্দোলনে দেশের ৪৩৮টি স্থানে মোট ৮৪৪ জন নিহত হন। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে যাত্রাবাড়ী, সাভার, আশুলিয়া ও রংপুরে। মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে ১১৪ জন অজ্ঞাতপরিচয় নিহতের মরদেহ।
শত শত নির্দোষ ব্যক্তি এখন ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩এ ধারায় মিথ্যা মামলা থেকে নাম প্রত্যাহারের আবেদন করছেন।
পুলিশের সাবেক প্রধান বাহারুল আলম বলেন, নির্দোষ ব্যক্তিদের হয়রানি থেকে বাঁচাতেই এই ধারা যুক্ত করা হয়েছে, যাতে তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে অব্যাহতির সুপারিশ করতে পারেন।
৩০ জুন পর্যন্ত দায়ের হওয়া ১ হাজার ৮৬২টি মামলার মধ্যে মাত্র ২৫৪টির তদন্ত শেষ হয়েছে, অর্থাৎ নিষ্পত্তির হার ১৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
৭৯৯টি হত্যা মামলার মধ্যে তদন্ত শেষ হয়েছে ১০০টির — এর মধ্যে ৬৩টিতে ৫ হাজার ৭৯৩ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে এবং ৩৭টিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা পড়েছে। হত্যা মামলার নিষ্পত্তির হার ১২ দশমিক ৫২ শতাংশ।
অন্যদিকে অ-মৃত্যুজনিত ১ হাজার ৬৩টি মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ১৫৪টি (১৪ দশমিক ৪ শতাংশ); ১৩৬টিতে ১০ হাজার ২০২ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট এবং ১৮টিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।
সরকারি যাচাই-বাছাইয়ে রেকর্ড থেকে ১৩টি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে — মৃত দাবি করা পাঁচজনকে জীবিত পাওয়া গেছে, বাকি আটজনের নাম হয় দুবার এসেছে অথবা আন্দোলনের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততাই ছিল না।
আশুলিয়ায় কুলসুম বেগম দাবি করেছিলেন তার স্বামী আল-আমিন বাইপাইলে নিহত হয়েছেন, কিন্তু তদন্তে আল-আমিনকে জীবিত পাওয়া যায়।
পুলিশের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, এক প্রভাবশালী স্থানীয় রাজনীতিকের প্ররোচনায় তিনি ভুয়া মামলা করেছিলেন এবং আসামির তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার শর্তে টাকা আদায় করেছিলেন। পুলিশ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করলেও তিনি এখন পলাতক।
উত্তরায় নিহত গাড়িচালক মোহাম্মদ আসাদুল্লাহর মায়ের করা মামলায় দেখা যায়, ঘটনার সময় অভিযুক্তরা ভিন্ন স্থানে ছিলেন; পরে আসাদুল্লাহর স্ত্রী স্বীকার করেন, মামলা সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না।
মিরপুরে আহত চালক ইসরাইল মিয়ার করা মামলায় গুরুতর অসঙ্গতি পেয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সন্দেহ করছে, প্রথম মামলাটি নিয়ে ‘মামলা বাণিজ্য’ হয়েছিল।
পারিবারিক বিরোধের জেরে বিদেশি সংস্থার কর্মকর্তা সারওয়ার জাহান বাপ্পীকে হত্যা ও হত্যাচেষ্টা— দুই মামলাতেই ফাঁসানো হয়েছিল, যা পরে ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়।
মিরপুর-১০ গোলচত্বরে নিহত ইমন হোসেন আকাশের মামলায় ৬৩৭ জন এজাহারনামীয় ও ৬০ হাজার অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছিল। প্রায় দুই বছরের যাচাইয়ে ৫৪৯ জনের বিরুদ্ধে কোনো সত্যতা মেলেনি।
মৃত ব্যক্তিদেরও সমন পাঠানো হয়েছে এমন ঘটনাও উঠে এসেছে— বরিশালে মারজুক আহমেদ ২০২১-২৩ সালে মারা যাওয়া চারজনসহ ২৪৮ জন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করেন। দোহারে এক ব্যবসায়ীকে হত্যা মামলায় জড়ানো হয় যদিও ঘটনার সময় তিনি সিঙ্গাপুরে ছিলেন এবং এক দশকে দোহারেই যাননি।
পিবিআই আদালত থেকে পাওয়া মামলার প্রায় ৬৪ শতাংশেই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ পায়নি। ১৪২টি প্রতিবেদনের মধ্যে ৯০টিতে অভিযোগের সত্যতা মিললেও ৫২টিতে পর্যাপ্ত প্রমাণ ছিল না, ১৪টি সম্পূর্ণ বানোয়াট এবং ৩টি বাদীদের অসহযোগিতায় স্থগিত রয়েছে।
পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. মোস্তফা কামাল জানান, একটি দাম্পত্য বিরোধের মামলায় স্বামীর বাবা-মাকেও আসামি করা হয়েছিল, আবার যারা কখনো ঢাকায়ই আসেননি তাদেরও রাজধানীর হত্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ভুয়া মেডিকেল সনদ ও সন্দেহজনক সাক্ষ্যও পাওয়া যাচ্ছে, তবে মিথ্যা অভিযোগকারীদের শাস্তি নির্ভর করবে আদালতের ওপর।
অনেক থানায় একজন কর্মকর্তাকে একসঙ্গে ১০-১২টি হত্যা মামলার তদন্তের পাশাপাশি নিয়মিত দাপ্তরিক কাজও সামলাতে হচ্ছে। শুধু সাভার থানাতেই ৪৩টি হত্যা মামলার তদন্ত চলমান, অথচ এ পর্যন্ত মাত্র দুটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা পড়েছে।
ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামিমা পারভীন বলেন, নির্ভুল তদন্ত নিশ্চিতে পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।
নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সী জানান, তাদের জেলায় তদন্তাধীন ১১০টি মামলায় অভিযোগ ও আসামিদের পরিচয়ে ব্যাপক অসঙ্গতি পাওয়া গেছে।
ভুয়া মামলা ও দীর্ঘ আসামির তালিকা কাজে লাগিয়ে বিপুল অর্থ আদায়ের অভিযোগ বাড়ছে। কিছু ক্ষেত্রে বাদী ও তদন্তকারীদের যোগসাজশে অভিযুক্তদের অব্যাহতির নামে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবির অভিযোগ উঠেছে। এসব চুক্তি আনুষ্ঠানিক করতে বাদীরা ৩৫০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে ‘নির্দোষ’ ঘোষণা করে হলফনামা দিয়েছেন, যা পরে আদালত ও তদন্তকারীদের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।
অপরাধী শনাক্তে ময়নাতদন্তকে অপরিহার্য মনে করলেও জুলাই-আগস্টের সংঘর্ষে নিহত অধিকাংশকে তা ছাড়াই দাফন করা হয়েছিল। পরে আদালতের নির্দেশে লাশ উত্তোলনের উদ্যোগ নিলে জনতা বারবার বাধা দেয়— কুষ্টিয়া, পাবনা, জামালপুর ও সাভারে এমন উদাহরণ মিলেছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, পর্যাপ্ত ফরেনসিক প্রমাণের অভাবে প্রকৃত অপরাধীরা বিচারের সময় আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে পার পেয়ে যেতে পারে।