গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক
সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার ১৮০ দিন পূর্তি উপলক্ষে সোমবার (১৭ আগস্ট) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় সরকারের গত ছয় মাসের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড, অর্জন, সংস্কার উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন।
তিনি বলেন, সরকারের ১৮০ দিন পূর্তি কেবল সময়ের হিসাব নয়, এটি জনগণের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রতিফলন। তিনি তার বক্তব্যে সরকারের কর্মকাণ্ডকে ১০টি প্রধান ক্ষেত্রে তুলে ধরেন।
১. অভূতপূর্ব জনসমর্থন
গত ছয় মাসে সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন জনগণের প্রত্যক্ষ সমর্থন। দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থার পর জনগণ অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের পছন্দের দল ও প্রার্থীকে নির্বাচিত করেছে।
নির্বাচনি প্রচারণা থেকে দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভিন্ন কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে ব্যাপক জনসমাগম সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা ও সমর্থনের প্রতিফলন। বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় স্বাতন্ত্র্য হলো, নির্বাচনি ইশতেহারকে নিছক কথার কথা না রেখে, সেখানে দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে চলেছে।
২. সুদৃঢ় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ
সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রমে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, বাকস্বাধীনতা, মানবাধিকার ও আইনের শাসনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র।
তিনি বলেন, সংসদে প্রাণবন্ত আলোচনা, সমালোচনা ও মতপ্রকাশের সুযোগ তৈরি হয়েছে। সংসদের প্রথম অধিবেশনেই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার আলোকে বিভিন্ন অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তর করা হয়েছে।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের সংসদ কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করার সুযোগ, বীরশ্রেষ্ঠদের নামে সংসদের গ্যালারির নামকরণ এবং ভিন্ন মত, ধর্ম, বর্ণ ও পেশার মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
৩. ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন
সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির ভিত্তি হিসেবে বিএনপির ১৯ দফা, খালেদা জিয়ার ‘ভিশন ২০৩০’, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রণীত বিএনপির ২৭ দফা এবং যুগপৎ আন্দোলনের শরিক রাজনৈতিক দলগুলো নিয়ে আসা ৩১ দফার কথা তুলে ধরেন মাহ্দী আমিন।
তিনি জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকেই কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এতে প্রায় ১৩ লাখ কৃষক পরিবার উপকৃত হয়েছে।
এ ছাড়া কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, প্রবাসী কার্ড, জেলা পর্যায়ে অ্যামপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ, ধর্মীয় নেতাদের সম্মানী এবং খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির কথাও তুলে ধরা হয়।
৪. অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাফল্য
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধ, ঈদে শ্রমিক অসন্তোষ এড়ানো এবং জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, কোরবানির ঈদে দেশের পশুসম্পদে স্বয়ংসম্পূর্ণতা বজায় রাখা এবং দ্রুত বর্জ্য অপসারণে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ এবং নিরপেক্ষভাবে উত্তরপত্র মূল্যায়নের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রথম বাজেটে ৬০টির বেশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে ভ্যাট ও কর কমানোর উদ্যোগ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে অগ্রাধিকার এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরা হয়।
জ্বালানি সংকট প্রসঙ্গে মাহ্দী আমিন বলেন, একটি এফএসআরইউতে কারিগরি ত্রুটি এবং আগের সরকারের সময়ের জ্বালানি খাতের নানা সমস্যার কারণে বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। চীন, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা এবং পেট্রোনাসের মাধ্যমে গ্যাসসংকট মোকাবিলায় অগ্রগতির কথাও তিনি জানান।
৫. অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, সব শ্রেণি-পেশার মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন
সরকার সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কল্যাণে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে বলে দাবি করেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র।
অবসরপ্রাপ্ত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণ সুবিধার অর্থ পরিশোধে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার চেক হস্তান্তরের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
স্বাস্থ্য খাতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যাসংখ্যা বাড়ানো, এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা এবং দুরারোগ্য রোগীদের চিকিৎসা ব্যয়ে সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন বিষয় সংযোজন, ফ্রি ওয়াইফাই, শিক্ষার্থীদের স্কুল ড্রেস ও ব্যাগ, মিড-ডে মিল, মেয়েদের স্নাতক পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা এবং ক্রীড়া কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরা হয়।
এ ছাড়া তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ, স্টার্টআপ ফান্ডিং, ইনোভেশন গ্র্যান্ট, ফ্রিল্যান্সার কার্ড, দক্ষতা উন্নয়ন, বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালু এবং বিদেশি শ্রমবাজার সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়।
৬. আর্থিক খাতে সংস্কার
ভেঙে পড়া অর্থনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠনে সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে দাবি করেন মাহ্দী আমিন।
তিনি বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ বাড়ানো, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে কর কমানো, আমানতকারীদের সুরক্ষা, রপ্তানিমুখী শিল্পে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং ব্যবসায়িক লাইসেন্স নবায়ন সহজ করা হয়েছে।
দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে কাঁচামাল আমদানির ব্যয় কমানো এবং তৈরি পণ্যের আমদানি নিরুৎসাহিত করতে শুল্ক সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
প্রবাসী আয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতির উন্নতির কথাও বক্তব্যে তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনার কথা জানানো হয়।
৭. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক ছিল দাবি করে মাহ্দী আমিন বলেন, বর্তমানে পুলিশ ও প্রশাসনকে রাজনৈতিক হয়রানিমুক্ত ও জনবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুর দখলমুক্ত করা, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা, দীর্ঘদিনের আলোচিত হত্যাকাণ্ডের তদন্তে অগ্রগতি এবং বিভিন্ন মামলায় দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়ার কথা তিনি উল্লেখ করেন।
এ ছাড়া শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রত্যর্পণ আবেদন, জুয়া, মাদক, ধূমপান ও সাইবার অপরাধ দমনে আইনগত পদক্ষেপ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনার কথাও তুলে ধরেন।
৮. অবকাঠামো, পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন
ঢাকার যানজট কমাতে এআইভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থার পরীক্ষামূলক বাস্তবায়ন, নারীদের জন্য পিংক বাস সার্ভিস এবং ২০০টি ইলেকট্রিক বাস চালুর পরিকল্পনার কথা জানান মাহ্দী আমিন।
বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীদের জন্য ট্রেন ভাড়ায় বিশেষ ছাড়, নারীদের জন্য বিশেষ ট্রেন কামরা, তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণে অগ্রগতির কথাও তুলে ধরা হয়।
এ ছাড়া বাংলাদেশ-চীন ইকোনমিক করিডোর, সৌরবিদ্যুৎ, এসডিজি ভিলেজ, বৃক্ষরোপণ, খাল খনন এবং কার্বন ক্রেডিটের সঙ্গে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ যুক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়।
৯. রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদাপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি
সরকারের পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন হিসেবে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র।
তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক হবে সমতা, ন্যায্যতা ও পারস্পরিক মর্যাদার ভিত্তিতে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পর্যটন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চীন ও মালয়েশিয়া সফরে প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন বৈঠক এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের অবস্থান জোরদারের বিষয়টিও বক্তব্যে তুলে ধরা হয়।
১০. প্রধানমন্ত্রীর ভিন্নমাত্রিক নেতৃত্ব
মাহ্দী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রচলিত ভিআইপি সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তৃণমূল পর্যায়ে গিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন, খাল খনন কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন এবং শিশুদের সঙ্গে সরাসরি সময় কাটাচ্ছেন। তার সাদাসিধে ও মিতব্যয়ী জীবনযাপনও সরকারের নেতৃত্বের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে তুলে ধরা হয়।
বক্তব্যের শেষে মাহ্দী আমিন বলেন, দীর্ঘ সময়ের পুঞ্জীভূত সমস্যা মাত্র ছয় মাসে পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে সরকার প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা, দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহির সঙ্গে কাজ করছে।
তিনি আরও বলেন, সরকারের লক্ষ্য একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর, মানবিক, নিরাপদ, মেধাভিত্তিক ও জনকল্যাণমুখী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত এই সরকারের ক্ষমতার উৎস ও অনুপ্রেরণা জনগণই।