গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক
কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার একটি হোটেলে আগুন লেগে নিহতদের মধ্যে কতজন বাংলাদেশি, সেই তথ্য নিয়ে অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের বরাত দিয়ে ভারতের বার্তা সংস্থা এএনআই প্রথমে জানিয়েছিল, নিহত ৯ জনের সবাই বাংলাদেশি। চিকিৎসার জন্য তারা কলকাতায় গিয়েছিলেন।
তবে কয়েক ঘণ্টা পর সেই তথ্য সংশোধন করে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো। এনডিটিভির খবরে বলা হয়, নিহত একজনকে ভারতে ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিকও রয়েছেন । আর আনন্দবাজারের খবরে বলা হয়, নিহতদের ‘অধিকাংশিই’ বাংলাদেশি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম বলেন, “কলকাতায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৯ জনের মধ্যে ৮ জন বাংলাদেশি বলে আমরা শুনেছি।
“এর মধ্যে ৫ জন বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। বাকি তিনজনও বাংলাদেশি বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।”
নিহত বাংলাদেশিদের মধ্যে রয়েছেন শণশিষ দত্ত, আফসানা শিম্মিন, দেবাশীষ দত্ত ও মোহাম্মদ আকরাম আলী। তারা সবাই বাংলাদেশের কুষ্টিয়ার বাসিন্দা বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে আহমেদ বাবু নামে আরও একজন নিহত হয়েছেন। তিনি ঢাকার সাভারের আমিনবাজারের বেগুনবাড়ি এলাকার বাসিন্দা। তার বাবার নাম আদম আলী।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় একটি হোটেলে আজ ভোরে অগ্নিকাণ্ডে কয়েকজন বাংলাদেশি নাগরিকের প্রাণহানি ঘটেছে বলে সংবাদপত্র/মিডিয়াসূত্রে জানা গিয়েছে। এ খবর জানার সাথেসাথেই কলকাতাস্থ বাংলাদেশ উপ-হাই কমিশন থেকে কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে মৃত ও আহতদের সম্পর্কে তথ্য যোগাড় করার চেষ্টা করেছেন।
“স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্যানুসারে, এ যাবৎ এ অগ্নিকাণ্ডে মোট নয়জন মারা গেছেন। তাদের মধ্যে পাঁচ জন বাংলাদেশি বলে স্থানীয় পুলিশ তাদের পরিচয় নিশ্চিত করেছে।”
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “উপ-হাই কমিশন থেকে নিহতদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে চারজনই এক পরিবারের সদস্য বলে জানা গেছে। বাকিদের পরিচয় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি। এছাড়াও আহত ছয় জন বাংলাদেশি নাগরিককে প্রাথমিক চিকিৎসার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।”
বাংলাদেশিদের বিষয়ে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা দিতে উপ-হাইকমিশনের কর্মকর্তারা হাসপাতাল ও স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করছে এবং উপ-হাইকমিশন একটি সার্বক্ষণিক হেল্প লাইন চালু করেছে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, বুধবার রাত প্রায় ২টার দিকে নগরীর নিউ মার্কেটের কাছে মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি ভবনের তৃতীয় তলায় হোটেল শিখা ইন-এ আগুনের সূত্রপাত হয়। পরে তা আশপাশের ভবনগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে।
আগুন যখন লাগে, হোটেলের অতিথিরা তখন ঘুমিয়ে ছিলেন। হোটেলের ঘরগুলো ধোঁয়ায় ভরে গেলে আতঙ্কিত অতিথিরা ছুটাছুটি শুরু করেন।
ওই হোটেলের কাছেই কলকাতার ফায়ার সার্ভিসের সদর দপ্তর। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি গাড়ি ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নেভাতে কাজ শুরু করে। নিউ মার্কেট থানা পুলিশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দলও উদ্ধারকাজে যোগ দেয়।

স্থানীয়দের বরাত দিয়ে আনন্দবাজার লিখেছে, অগ্নিকাণ্ডের সময় বাইরে থেকে আগুনের শিখা দেখা যাচ্ছিল না। গলগল করে শুধু কালো ধোঁয়া বের হতে দেখা যাচ্ছিল।
আগুন লেগেছে বুঝতে পেরে হোটেলের অতিথিরা বাইরে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন। কিন্তু গলির মধ্যে ওই ভবনে ঢোকা বা বের হওয়ার পথ খুবই সঙ্কীর্ণ। সে সময় সেখানে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়।
পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ওই ভবন থেকে ৬০ জনকে উদ্ধার করেন। তাদের অনেকেই ধোঁয়ায় অচেতন হয়ে পড়েছিলেন; তাদের হাসপাতালে পাঠানো হয়।
যে নয়জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে, তাদের মধ্যে ছয়জন পুরুষ, দুজন নারী এবং একজন শিশু।
হাসপাতালের বরাত দিয়ে আনন্দবাজার লিখেছে, মৃতদের শরীরে পোড়া বা ঝলসে যাওয়ার চিহ্ন তেমন নেই। চিকিৎসকদের প্রাথমিক অনুমান, ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়ে তাদের মৃত্যু হয়েছে। তবে ময়নাতদন্তের পরই মৃত্যুর আসল কারণ স্পষ্ট হবে।
এ ঘটনায় আহতদের কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ অন্যান্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম বলছে, ওই পাঁচ তলা ভবনের বিভিন্ন ফ্লোরে আরও আবাসিক হোটেল আছে। চিকিৎসার জন্য যে বাংলাদেশিরা কলকাতায় যান, তাদের অনেকেই এসব হোটেলে থাকেন। তবে অগ্নিকাণ্ডের সময় সেখানে মোট কতজন ছিলেন, তা স্পষ্ট নয়।
আনন্দবাজার লিখেছে, হোটেলগুলো গলির মধ্যে। ফলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ির বেশি ভেতরে ঢোকার সুযোগ ছিল না। প্রথমে বাইরে থেকে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন তারা। পরে হোটেলের ভেতরে ঢুকে উদ্ধারকাজ শুরু করেন।
হোটেলের একজন অতিথি আনন্দবাজারকে বলেছেন, আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে সবাই হোটেল ছেড়ে বার হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু কোন রাস্তা দিয়ে বের হবেন, ধোঁয়ায় তা অনুমান করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
কেউ কেউ টয়লেটে ঢুকে পড়েন। জানলা ভেঙেও বের হওয়ার চেষ্টা করেন কেউ কেউ।
ওই অতিথি বলেন, “দমকলকর্মীরা না এলে আমরাও হয়ত বাঁচতে পারতাম না।”
ওই ভবনের চতুর্থ তলার আরেক হোটেলের অতিথি ইজাজ আহমেদ আনন্দবাজারকে বলেন, রাত সাড়ে ১২টা নাগাদ খাওয়া সেরে তারা ঘুমিয়ে পড়েন। রাত সোয়া ২টার দিকে দুই নারীর আর্তনাদ শুনে তাদের ঘুম ভাঙে। তারা দরজা খুলতেই ধোঁয়া ঢুকে পড়ে।
ইজাজ বলেন, ‘‘ঘর থেকে বেরিয়ে যে বারান্দা, তা খুব সরু। ধোঁয়ায় ঢেকে গিয়েছিল সেটা।”
ওই ভবনের একদম উপরের তলায় একটি পরিবার থাকে। তাদেরকেও উদ্ধার করা হয়েছে।
ওই পরিবারের একজন নারী বলেন, তাদের যখন নিচে নামানো হয়, তখন আগুন নিভে গিয়েছিল।
তার অভিযোগ, হোটেলগুলোকে বার বার অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা লাগাতে বলা হয়েছে। কিন্তু কেউ নিয়ম মানেনি। প্রশাসনকে অভিযোগ জানিয়েও লাভ হয়নি।
কীভাবে আগুন লাগল, তা নিয়ে দুই রকম তথ্য এসেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে।
আনন্দবাজার লিখেছে, শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লাগতে পারে বলে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের প্রাথমিক ধারণা।
আবার এনডিটিভি লিখেছে, একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসি বিস্ফোরণ থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে।
ওই হোটেল বা তার আশপাশের হোটেলগুলোতে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে পুলিশের। ইতোমধ্যে হোটেল এবং আশপাশের এলাকা ঘিরে ফেলে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
কলকাতার বিজেপি নেতা সন্তোষ পাঠক অভিযোগ করেছেন, হোটেলগুলো বিধি মেনে তৈরি হয়নি। হোটেলের ঘরের সংখ্যা বাড়াতে পিলার কেটে জায়গা বাড়ানো হয়েছে, ফলে ভবনটি দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
তিনি বলেন, “এগুলো মূলত আবাসিক ভবন ছিল। সেটাকে বেআইনি ভাবে বাণিজ্যিক করা হয়েছে।”