সাব-রেজিস্ট্রার মনিরুল ফের আলোচনায় : প্রশাসন ক্যাডারে নিয়োগের গুঞ্জন!

৭৬৯ জনের তালিকায় মনিরুল ইসলামের নাম নেই। তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের দাবি, শিগগিরই তাঁর নিয়োগের গেজেটও প্রকাশ হবে—এমনটাই তিনি তাঁদের জানিয়েছেন।

সাব-রেজিস্ট্রার মনিরুল ফের আলোচনায় : প্রশাসন ক্যাডারে নিয়োগের গুঞ্জন!

বিশেষ প্রতিনিধি

দুর্নীতি, জাল দলিল ও ভূমি রেজিস্ট্রেশনে অনিয়মের একাধিক অভিযোগে অভিযুক্ত সাব-রেজিস্ট্রার মনিরুল ইসলাম আবারও আলোচনায় এসেছেন। ২০১৪ সালের ৩ জানুয়ারি থেকে নিবন্ধন অধিদপ্তরে সংযুক্ত থাকা এই কর্মকর্তা এবার প্রশাসন ক্যাডারে নিয়োগ পেতে যাচ্ছেন—এমন গুঞ্জন ছড়িয়েছে তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল থেকেই।

তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল ও একাধিক সূত্র জানিয়েছে, মনিরুল ইসলাম ২৭তম বিসিএস পরীক্ষায় সপ্তম স্থান পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। কিন্তু ২০০৭ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে ওই বিসিএসের প্রথম মৌখিক পরীক্ষার ফল বাতিল করে নতুন করে পরীক্ষা নেয়, যাতে নিয়োগবঞ্চিত হন ১ হাজার ১৩৭ জন প্রার্থী—তাঁদের একজন ছিলেন মনিরুল নিজেও। পরে ২০১২ সালের ৫ মে তিনি সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। যোগদানের সময় নিজেকে ঢাকার বাসিন্দা দাবি করলেও নথিপত্র অনুযায়ী তিনি মূলত যশোরের অভয়নগর থানার মশহরহাটির বাসিন্দা। এরপর তিনি বেলাবো, তারাকান্দা ও মনোহরদী হয়ে সর্বশেষ গাজীপুর সদরে (দ্বিতীয় যুগ্ম) সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

নিয়োগবঞ্চিতরা আদালতের দ্বারস্থ হলে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই হাইকোর্ট প্রথম মৌখিক পরীক্ষা বাতিলকে বৈধ ঘোষণা করেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীরা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করলে ২০ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ বঞ্চিতদের নিয়োগের নির্দেশ দেন। এর ধারাবাহিকতায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় দুই দফায়—২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর ৬৭৩ জন এবং ২০২৬ সালের ১৩ মে মাসে আরও ৯৬ জনকে নিয়োগ দিয়ে গেজেট প্রকাশ করে। 

তবে এই ৭৬৯ জনের তালিকায় মনিরুল ইসলামের নাম নেই। তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের দাবি, শিগগিরই তাঁর নিয়োগের গেজেটও প্রকাশ হবে—এমনটাই তিনি তাঁদের জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা অবশ্য এতে দ্বিমত পোষণ করছেন। তাঁদের মতে, দুদক ও বিভাগীয় মামলা মাথায় থাকায় এবং নিয়োগ প্রজ্ঞাপনে পরবর্তী সময়ে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিরূপ তথ্য পাওয়া গেলে আদেশ বাতিলের সুযোগ সংরক্ষিত থাকায় তাঁর নিয়োগ প্রক্রিয়া কার্যত অনিশ্চিত। নিয়োগের আগেই সরকারি বিভিন্ন সংস্থা তাঁর দুর্নীতি ও বিভাগীয় মামলার তথ্য পাঠিয়েছে বলেও জানা গেছে। 

এ বিষয়ে জানতে মনিরুল ইসলামের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়, ফলে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

যুগান্তরের অনুসন্ধানে যা উঠে এসেছিল

এর আগে ২০২২ সালের ১৩ ডিসেম্বর দৈনিক যুগান্তর “দেশে ফিরে স্বপদে যোগদানে মরিয়া: সাবরেজিস্ট্রার মনিরুলের ‘পলায়ন’ কাণ্ড” শিরোনামে এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। 

নিবন্ধন অধিদপ্তর ও আইন মন্ত্রণালয়ের নথিপত্রের সূত্র ধরে করা সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, ছুটিতে থাকা অবস্থায় তিনি ভূমি দলিল করেছেন, নিজের তহবিলের অর্ধকোটি টাকা খরচ করে আইন বিষয়ে পড়াশোনার কথা বলে দুই বছরের শিক্ষাছুটি নিয়েছেন, যুক্তরাজ্যে পড়তে যাওয়ার কথা থাকলেও সেখানে না গিয়ে পরিবারসহ চলে গেছেন অস্ট্রেলিয়ায়, এবং দুই বছরের ছুটি শেষে ফেরার কথা থাকলেও ফিরেছেন তিন বছর পর। 

যুগান্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর মধ্যেই তাঁর বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও প্রতারণার মামলায় পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দেয় এবং দুদক তাঁর অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানে নামে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এই অবস্থায় অতি গোপনে দেশে ফিরে উচ্চ আদালত থেকে আগাম জামিন নিয়ে তিনি স্বপদে ফেরার মরিয়া চেষ্টা চালান।

যুগান্তরের প্রতিবেদন প্রকাশের পরই ৫ ডিসেম্বর আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিচার শাখা-৬ থেকে মনিরুল ইসলামের কাছে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা তলব করা হয়। সিনিয়র সহকারী সচিব মো. শফিউল আলমের সইকৃত তলবি চিঠিতে বলা হয়, সংযুক্তির পর যোগদান না করা, অনুমতি ছাড়া দেশত্যাগ ও অননুমোদিত বিদেশ অবস্থান সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী যথাক্রমে ‘অসদাচরণ’ ও ‘পলায়ন’-এর পর্যায়ভুক্ত হওয়ায় কেন তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে না, তার ব্যাখ্যা ১০ কার্যদিবসের মধ্যে দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে যুগান্তরকে নিবন্ধন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক শহীদুল আলম ঝিনুক বলেছিলেন, তাঁর জানামতে মনিরুল ইসলাম তখনো যোগদান করেননি। যোগদানপত্র জমা দিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হবে বলে তিনি জানান, তবে যেহেতু আইন মন্ত্রণালয়ই তাঁর নিয়োগ কর্তৃপক্ষ, তাই এর বেশি কিছু বলার এখতিয়ার তাঁর নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।

যুগান্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী

আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, গাজীপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রার থাকা অবস্থায় ২০১৯ সালের ১৫ জুলাই যুক্তরাজ্যের কভেন্ট্রি ইউনিভার্সিটিতে আইন বিষয়ে পড়ার জন্য দুই বছরের শিক্ষাছুটির আবেদন করেন মনিরুল ইসলাম। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯ সালের ১ আগস্ট থেকে ছুটি মঞ্জুর হয় এবং তিনি ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২১ সালের ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছুটিতে ছিলেন। 

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে ছুটিতে না গিয়ে তিনি বিধিবহির্ভূতভাবে আরও এক মাস অফিস করেন এবং এই সময়ে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে অসংখ্য দলিল রেজিস্ট্রেশন করে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগ। সরকারি বনভূমিও ব্যক্তিমালিকানায় নিবন্ধন করে দেওয়ার অভিযোগ আছে তাঁর বিরুদ্ধে। এ সময় করা বেশ কিছু জাল দলিল নিয়ে পরে মামলাও হয়।

নিবন্ধন অধিদপ্তরের একাধিক সূত্র জানায়, যুক্তরাজ্যে পড়াশোনার কথা বলে ছুটি নিলেও তিনি সেখানে না গিয়ে পরিবারসহ অস্ট্রেলিয়ায় চলে যান এবং দুর্নীতির অর্থ সেখানে পাচার করে পরিবারকে স্থায়ী করেন। দুই বছর পর ই-মেইলে আরও এক বছর ছুটি বাড়ানোর আবেদন করলেও মন্ত্রণালয় তা গ্রহণ করেনি।

দুদক সূত্রে জানা যায়, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে সংস্থাটি অনুসন্ধানে নামে। সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকা-২ থেকে গত ১৯ জানুয়ারি নিবন্ধন অধিদপ্তরে চিঠি দিয়ে তিনি ছুটি শেষে দেশে ফিরেছেন কি না জানতে চাওয়া হলে বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনে তোলপাড় শুরু হয়। চিঠিতে তাঁর স্থায়ী-অস্থায়ী ও বিদেশে অবস্থানের ঠিকানাও জানতে চাওয়া হয়।

মন্ত্রণালয়ের নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ছুটি মঞ্জুরের প্রজ্ঞাপনে ভিসাপ্রাপ্তি সাপেক্ষে ছুটি কার্যকরের কোনো শর্ত ছিল না। তা সত্ত্বেও ২০১৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর এক চিঠির (স্মারক নম্বর ১৭৯) মাধ্যমে তাঁকে নিবন্ধন অধিদপ্তরে সংযুক্ত করা হয় এবং ১২ সেপ্টেম্বর তাঁকে সরকারি আন্তর্জাতিক পাসপোর্ট করার অনুমতি দেওয়া হয়। তবে তাঁর ব্যক্তিগত নথিতে যোগদানপত্র জমা বা তা গৃহীত হওয়ার কোনো প্রমাণ মেলেনি, আর বিদেশযাত্রার জন্য তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবমুক্ত করার কোনো তথ্যও নেই। কভেন্ট্রি ইউনিভার্সিটির কোনো সুপারিশ ছাড়াই মেইলযোগে ছুটি বাড়ানোর আবেদন করেন তিনি।

মামলা ও চার্জশিট

আইন মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ভূমি রেজিস্ট্রেশনের অভিযোগে গাজীপুরের কাশিমপুর থানায় মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা আছে। গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর (স্মারক নম্বর ৪৭৩৩) পুলিশ এই মামলায় চার্জশিট দাখিলের অনুমতি চেয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর চিঠি পাঠায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৪ মার্চ মন্ত্রণালয়ের বিচার শাখা তদন্ত কর্মকর্তাকে চার্জশিট দাখিলের অনুমতি দেয়, এরপরই পুলিশ আদালতে তাঁকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল করে।

আরও জানা যায়, তিনি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কথা বলে ছুটি নিয়েছিলেন, সেখানে তাঁর কোনো বৃত্তি ছিল না। পুরো খরচ নিজেকে বহন করতে হতো, যার পরিমাণ দুই বছরে ন্যূনতম ৫১ হাজার পাউন্ড—তৎকালীন বিনিময় হারে প্রায় ৫১ লাখ টাকা। একজন সাব-রেজিস্ট্রারের বেতনে এত অর্থের সংস্থান কীভাবে হলো, তা নিয়েই মূল প্রশ্ন তুলেছে প্রশাসনিক নোট। এ ছাড়া ছুটিতে যাওয়ার আগে এক মাসে করা দলিলগুলোর আইনি বৈধতাও প্রশ্নবিদ্ধ বলে নোট শিটে উল্লেখ করা হয়।

এখন কোথায় মনিরুল

অনুসন্ধানে জানা যায়, সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিরে কাশিমপুর থানার মামলায় হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নেন মনিরুল ইসলাম। এরপর অতি গোপনে মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালীদের মাধ্যমে স্বপদে যোগদানের চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ। সূত্র জানায়, কয়েক দিন আগে তিনি নিবন্ধন মহাপরিদর্শকের কার্যালয়ে সাক্ষাৎ করতে গেলে তাঁর সঙ্গে কথা না বলেই তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

নিবন্ধন অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রচলিত ধারণা, মনিরুল ইসলাম আদৌ যুক্তরাজ্যের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাননি—শিক্ষাছুটির অপব্যবহার করে পরিবারসহ অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, যেখানে তাঁর বাড়ি ও ব্যবসা রয়েছে। তিন বছর সেখানে কাটিয়ে স্ত্রী-সন্তানদের রেখে সম্প্রতি দেশে ফিরে তিনি ফের স্বপদে যোগ দিতে চাইছেন। এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, সাব-রেজিস্ট্রার পদে অবৈধ অর্থ উপার্জনের যে সুযোগ, প্রবাসে ব্যবসা করে তা অর্জন সম্ভব নয়।

দেশে ফেরার পর থেকে তিনি প্রায় সবার সঙ্গে যোগাযোগ এড়িয়ে চলছেন বলে জানান তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা। এক সপ্তাহ চেষ্টা করেও ঢাকায় তাঁর সুনির্দিষ্ট অবস্থান নিশ্চিত করা যায়নি, আর তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরেও বারবার চেষ্টা করে তা বন্ধ পাওয়া গেছে বলে যুগান্তরের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরো জানতে….