গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক
বিভিন্ন পক্ষের আপত্তির মধ্যেই চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় দুবাইভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে কনসেশন চুক্তি সই হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (০৮ অক্টোবর) বিকাল ৩টায় ইনভেস্ট বাংলাদেশ অডিটোরিয়ামে এ চুক্তি সই হয়।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তরফে চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মনিরুজ্জামান এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের তরফে কোম্পানির চেয়ারম্যান ঈসা কাজিম চুক্তিতে সই করেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান, ঢাকায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ আলী আল হুমুদি, ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী।

এ চুক্তির বিরোধিতা করে এদিন দুপুর থেকে ইনভেস্ট বাংলাদেশ অডিটোরিয়ামের সামনে অবস্থান নিয়েছে বেশ কয়েকটি বামপন্থি রাজনৈতিক দল ও সংগঠন।
তাদের মধ্যে আছে-বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, বাংলাদেশ জাসদ, বাসদ (মার্কসবাদী), বাংলাদেশ সাম্যবাদী আন্দোলন, সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট, গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট, গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি।
ইনভেস্ট বাংলাদেশ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) জমি, অবকাঠামো, মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে রেখে দুবাই সরকারের মালিকানাধীন আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ১৫ বছর মেয়াদে টার্মিনালের ‘পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার’ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
চুক্তি শেষে ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, চুক্তির শুরুতে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার অগ্রিম ফি বং প্রথম ১০ বছরে আধুনিকায়ন, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিতে ১,০০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের অঙ্গীকার রয়েছে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ রাজস্ব ভাগ ও নির্ধারিত বার্ষিক ফি পাবে।
কেপিআই, নিয়মিত প্রতিবেদন এবং লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে আর্থিক জরিমানার ব্যবস্থা থাকবে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ মনিটরিং, নিরীক্ষা ও নির্ধারিত প্রতিবেদনের মাধ্যমে তদারকি অব্যাহত রাখবে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশ জানিয়েছে, নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, ইমিগ্রেশন, কাস্টমসসহ রাষ্ট্রীয় সংস্থার নিরাপত্তা প্রটোকল আগের মতোই থাকবে।

অনুষ্ঠানে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, “সরকারের লক্ষ্য বিদ্যমান গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের সক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি করা যাতে আধুনিক যন্ত্রপাতি, ডিজিটাল ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক মানের ব্যবস্থাপনা এবং বৈশ্বিক লজিস্টিক সংযোগের মাধ্যমে এনসিটিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করা যায়।
“আমাদের বৃহত্তর নীতিগত লক্ষ্য হলো বিভিন্ন টার্মিনালে একাধিক আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত করে সেবার মান ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সাপ্লাই চেইনে স্থিতিশীলতা আনা।”
ডিপি ওয়ার্ল্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান ঈসা কাজিম বলেন, “আমরা বাংলাদেশ সরকার ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানাই সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে এই পরিচালনা স্বত্ব প্রদানের জন্য। বাণিজ্য ও উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। দেশের এই অগ্রযাত্রায় সহায়তা করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
“এই অংশীদারত্বের মাধ্যমে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বৈশ্বিক বন্দর, লজিস্টিকস অবকাঠামো ও সরবরাহব্যবস্থার সেবা নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সংযোগ আরও সহজ ও নিরবচ্ছিন্ন হবে।”
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মনিরুজ্জামান বলেন, “সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশের নৌ ও বাণিজ্য অবকাঠামো শক্তিশালী করার অঙ্গীকারের প্রতিফলন এই অংশীদারত্ব। দেশের বাণিজ্য ও লজিস্টিকস ব্যবস্থায় নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
“এই চুক্তি টার্মিনালের পরিচালন দক্ষতা বাড়াবে, লজিস্টিকসের প্রতিবন্ধকতা কমাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংযোগ আরও জোরদার করবে। দেশীয় শিল্পের সহায়ক পরিবেশ তৈরি ও পণ্য পরিবহন আরও গতিশীল করার মাধ্যমে এই অংশীদারত্ব আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য আরও সুদৃঢ় ভিত্তি তৈরি করবে।”
ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, “আমাদের লক্ষ্য দেশের বাণিজ্যকে বৈশ্বিক গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে নেওয়া। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে যুক্ত করা সেই লক্ষ্যে একটি বড় পদক্ষেপ। বন্দরের এই গুরুত্বপূর্ণ পিপিপি উদ্যোগে সহায়তা করতে পেরে আমরা আনন্দিত।
“দেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য প্রবেশদ্বারে আমরা আরও দ্রুত কার্যক্রম, শক্তিশালী সংযোগ ও উন্নত সেবার মান চাই। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বন্দরব্যবস্থাকে এমন সক্ষমতায় উন্নীত করতে চাই, যা আমাদের কাঙ্ক্ষিত বাণিজ্য সম্প্রসারণের চাহিদা পূরণ করতে পারে।”
চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠা-নামার চারটি প্রধান টার্মিনালের মধ্যে এনসিটি সবচেয়ে বড়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) এবং সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি) কাঠামোর অধীনে এনসিটি পরিচালনার কাজ ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে সেসময় ওই উদ্যোগ পরিণতি পায়নি।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এনসিটির দায়িত্ব বিদেশি অপরাটেরের হাতে দেওয়ার কার্যক্রম আবার শুরু করে। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এ বিষয়ে চুক্তির জোর আলোচনা শুরু হলে আন্দোলনে যায় বন্দরের শ্রমিক কর্মচারীরা। এর প্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকার ৮ ফেব্রুয়ারি এনসিটি বিদেশি অপারেটরকে ইজারা দেওয়ার কার্যক্রম স্থগিত করে।
পরে বিএনপির নতুন সরকার গেল ৪ জুন দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়। সরকারের নির্দেশনার পর আলোচনা প্রক্রিয়ায় সহায়তা করার জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ১২ সদস্যের একটি সাপোর্ট টিমও গঠন করে।
এনসিটির ইজারা প্রক্রিয়া বন্ধের দাবিতে কয়েক মাস ধরে বন্দর রক্ষা কমিটি গণঅনশন, বিক্ষোভ মিছিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে। গত সেপ্টেম্বরে একই দাবিতে আন্দোলনে নামার ঘোষণা দেয় বন্দর শ্রমিক দল ও বন্দর রক্ষা পরিষদ।
এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি অপারেটরকে দেওয়ার পেছনে সরকারের যুক্তি হচ্ছে, বন্দরের অপারেশনাল দক্ষতা বাড়াতে এবং আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও গতিশীল করা। লজিস্টিকস ও পোর্ট অবকাঠামো খাতে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে আসা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিধি ও প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা। একইসঙ্গে বিশ্বমানের ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে স্থানীয় জনবলের দক্ষতা উন্নয়ন এবং আধুনিক বন্দর ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা অর্জন।
অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের ভাষ্য, এনসিটি পরিচালনার ভার বিদেশিদের দিলে চট্টগ্রাম বন্দর যেমন লোকসানের দিকে যাবে ও দক্ষ কর্মশক্তি হারাবে তেমনিভাবে ভূ-রাজনৈতিক ভাবেও বাংলাদেশ বিপদের সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা আছে। এছাড়া বহুজাতিক কোম্পানিকে ইজারা দিলে সরকার আয় থেকে বঞ্চিত হবে, দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাচার হয়ে যাবে এবং ‘কনসেশন’ চুক্তির কারণে বিপজ্জনক পণ্য খালাসেরও আশঙ্কা রয়েছে।
সূত্র: বিডিনিউজ