রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় নিহতদের মধ্যে দুজন বাংলাদেশি

হামলার জন্য ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের দায়ী করে ঘটনাটিকে 'যুদ্ধাপরাধ' বলে অভিহিত করেছে সৗেদি জোট।

রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় নিহতদের মধ্যে দুজন বাংলাদেশি

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের একটি বিমানবন্দরে হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৩০৯ জন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এ তথ্য জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে দুজন বাংলাদেশি রয়েছেন।

সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে সৌদি আরবের চারজন, বাংলাদেশের দুজন এবং যুক্তরাষ্ট্র, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সুদান ও মিসরের একজন করে নাগরিক রয়েছেন। হামলার পর কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে।

হামলার জবাব দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। হামলার জন্য ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের দায়ী করে ঘটনাটিকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ বলে অভিহিত করেছে সৗেদি জোট।

সম্প্রতি ইয়েমেনে সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনী ও হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘাত বেড়েছে। দেশটির বেশির ভাগ এলাকা হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানিয়েছে, শনিবার দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় দাম্মাম শহরের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছেও একটি ক্ষেপণাস্ত্র এসে পড়ে।

এর এক দিন আগে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, তার আগের দিন বিমানবন্দরে দুটি হামলায় পাইলটসহ সৌদি আরবের তিন নাগরিক নিহত হন। এর আগে ৬ ও ৭ অক্টোবর সৌদি আরবের দুটি বিমানবন্দরে হুথিদের হামলায় আরও তিনজন নিহত হন। ইরান-সমর্থিত হুথিদের বিরুদ্ধে এসব হামলার অভিযোগ করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।

শনিবারের বিবৃতিতে সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আহতদের কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বিমানবন্দরের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ চলছে।

হামলার পরে বিমানন্দরের পরিস্থিতি কেমন ছিল

দেশটির একটি সংবাদ সংস্থাকে এক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, তিনি বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ টার্মিনালে ছিলেন। এ সময় ৪০১ নম্বর গেটে হামলা হতে দেখেন তিনি। নিজের চোখের সামনেই মানুষকে আহত হতে দেখেছেন বলেও জানান ওই ব্যক্তি। তিনি বলেন, ‘সবাই দৌড়াচ্ছিলেন।’

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, হামলার পর এক ডজনের বেশি অ্যাম্বুলেন্স দ্রুত বিমানবন্দরে পৌঁছায়।

পরে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল মালিকি জানান, যাত্রী টার্মিনালের একটিতে হামলায় বেসামরিক যাত্রী ও বিমানবন্দরের কর্মীরা হতাহত হয়েছেন।

তিনি এ হামলাকে ‘পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধাপরাধ’ বলে অভিহিত করেন।

সৌদি আরবের ওপর এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। একই সঙ্গে তিনি নিশ্চিত করেছেন, হামলায় একজন মার্কিন নাগরিক নিহত হয়েছেন।

সৌদি আরবে অবস্থিত পশ্চিমা দেশগুলোর দূতাবাসগুলো নিজেদের নাগরিকদের বিমানবন্দর এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তর দেশটিতে থাকা ব্রিটিশ নাগরিকদের বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ওই এলাকা থেকে দূরে থাকতে বলেছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি বিমান সংস্থা রিয়াদ বিমানবন্দরে যাতায়াতকারী ফ্লাইট বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে ফ্লাইট বাতিল করেছে কুয়েত এয়ারওয়েজও।

বিমান চলাচল পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডারের তথ্য অনুযায়ী, রিয়াদগামী সব ফ্লাইট অন্য বিমানবন্দরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে অথবা বাতিল করা হয়েছে।

কেন সৌদি আরবে এমন হামলা চালাচ্ছে হুথিরা

ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে দেশটির সরকারি বাহিনীকে সমর্থন দেওয়ার কারণেই সৌদি আরবে আক্রমণ করার কথা জানিয়েছে হুথি বিদ্রোহীরা।

হুথিরা লোহিত সাগরের উপকূলের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকা দ্রুত দখল করার পর সংঘাত আরও বেড়ে যায়। এর মধ্যে ছিল বাব আল মান্দেব প্রণালির কাছে অবস্থিত মোকা বন্দর। লোহিত সাগরের এই প্রণালিটি আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করে।

ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সমর্থকেরা অবশ্য পরে দাবি করেন, লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তের এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ তারা নিশ্চিত করেছেন।

২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট গঠন করা হয়। আরব দেশগুলোকে নিয়ে গঠিত এই জোটের লক্ষ্য ছিল, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের কাছেই দেশটির নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা ও হুথিদের ঠেকানো।

বহু বছর ধরে চলা বিমান হামলা ও স্থলযুদ্ধে কয়েক লাখ মানুষ নিহত হওয়ার পর ২০২২ সালে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। দীর্ঘদিনের সংঘাতের কারণে ইয়েমেনে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটের জায়গায় পরিণত হয়েছে।

তবে গত জুলাইয়ে অনানুষ্ঠানিক এই যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়তে শুরু করে।

এরপর সৌদি আরবের ওপর ‘সমুদ্রপথে নিষেধাজ্ঞা’ আরোপ করার কথা জানায় হুথিরা।

তারা সৌদি আরবের বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা এবং লোহিত সাগরে চলাচলকারী তেলবাহী জাহাজ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে।

হুথিদের দাবি, সৌদি আরবের কয়েক বছর ধরে চলা অবরোধের জবাব দিতেই তারা এসব হামলা চালাচ্ছে। ইয়েমেনের রাজধানী সানার বিমানবন্দরে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলার প্রতিশোধ নেওয়ার কথাও জানিয়েছে তারা। সানা বর্তমানে হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

সূত্র: বিবিসি