গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : কালীগঞ্জের খলাপাড়া এলাকায় অবস্থিত এমিগো বাংলাদেশ লিমিটেডে (এবিএল) চাকুরির ইন্টারভিউতে গিয়ে গত ২৩ নভেম্বর সুমন দেবনাথ (২১) নামে এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনাকে পুলিশ আত্মহত্যা বললেও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
সম্প্রতি পাওয়া ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, “উচ্চতা থেকে পড়ে বা আত্মঘাতী কোন কারণে সুমন দেবনাথের মৃত্যু হয়নি। মৃত্যুর আগে বুকে আঘাতের ফলে হওয়া রক্তক্ষরণের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। অধিকতর তদন্তের মাধ্যমে তদন্তকারী কর্তৃপক্ষকে মৃত্যুর কারণ চিহ্নিত করতে হবে।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ”ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে সুমন দেবনাথের মৃত্যুর ঘটনাকে হত্যা বলেই ধরে নেয়া যায়।”
জানা গেছে, ঘটনার পর সুমন দেবনাথের স্বজনরা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করতে গেলেও পুলিশ তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে ফিরিয়ে দেন। পরে অপমৃত্যু মামলা দায়ের করে লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায় পুলিশ।
নিহত সুমন দেবনাথ কালীগঞ্জের জামালপুর ইউনিয়নের চুপাইর এলাকার হরিলাল দেবনাথের ছেলে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ ডিসেম্বর গাজীপুর জেলা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আমলি আদালতে হরিলাল দেবনাথ বাদী হয়ে এবিএল কোম্পানির চারজনসহ পাঁচ জনকে আসামি করে হত্যা মামলার আবেদন করলে তা আমলে নিয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত (সিআর মামলা নং ৩৪৮/২১)।
অভিযুক্তরা হলো, এমিগো বাংলাদেশ লিমিটেডের (এবিএল) এডমিন অফিসার মাহমুদুল হাসান (৩৪), মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হাবিবুর রহমান (২৫), গাড়ি চালক ইসরাফিল খাঁন (২০) ও ক্লার্ক জান্নাত আরা (৩০) এবং স্থানীয় বীরেন্দ্র দেবনাথ (৫০)।
জানা গেছে, গত ২৩ নভেম্বর সুমন দেবনাথ চাকুরির ইন্টারভিউ দিতে এবিএল কোম্পানিতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয় সকাল ৭টার দিকে। এরপর সারাদিন তার কোন খোঁজ ছিলোনা পরিবারের কাছে। পরে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে এবিএল কোম্পানি থেকে সুমন দেবনাথের বাবাকে ফোন করে জানানো হয়েছে তার ছেলে হাসপাতালে রয়েছে। পরে তিনি হাসপাতালে গিয়ে লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। সে সময় তিনি সুমন দেবনাথের দেহে একাধিক আঘাতের চিহ্ন দেখতে পান। যদিও তাকে সে সময় জানানো হয় সুমন দেবনাথের চাকুরির ইন্টারভিউ ভালো না হওয়ায় সে পাঁচ তলা থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে বলে।
মৃত্যুর কিছুদিন আগে সুমন দেবনাথ নিজের ছবিসহ তার ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস পোস্ট করছে। ফেসবুক পোস্টে সে লিখেছে, ”আর কতো বসে থাকবো এবার একটা চাকরির প্রয়োজন, চাকরিটা abl হতে হবে নইলে চাকরি করবো না না না।”
আরো জানা গেছে, ঘটনার পর এবিএল কোম্পানি থেকে অভিযুক্তরা সুমন দেবনাথকে সিলভার রঙের ঢাকা মেট্রো-চ ১৯-৯৬১৪-এই নাম্বারের একটি হাইস গাড়িতে উঠিয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গিয়েছিল।
গাড়ি চালক টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের পাইখার খাঁন পাড়া এলাকার মৃত আব্দুল জলিলের ছেলেই সরাফিল খাঁন। তিনি বর্তমানে গাজীপুরা এলাকায় বসবাস করেন।

সুরতহাল প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে পুলিশ উল্লেখ করেছে, “সুমন দেবনাথ ২৩ নভেম্বর সকাল ৮টার সময় চাকুরির জন্য এবিএল গার্মেন্টস এর তৃতীয় তলার ‘এইচআরএম’ কক্ষে নিয়োগ পরীক্ষার জন্য যায়। নিয়োগ পরীক্ষায় সংশ্লিষ্ট পদে মনোনীত না হওয়ায় হতাশাগ্রস্থ হয়ে ওইদিন বিকেলে ৪টা ২০ মিনিটে এবিএল কোম্পানির ভবনের সিঁড়ির দেয়াল থেকে লাফ দিয়ে সে আত্মহত্যা করে।”
সুরতহাল প্রতিবেদনে জখমের বর্ণনায় পুলিশ উল্লেখ করেছে, “নিহত সুমন দেবনাথের মাথা ও কপাল স্বাভাবিক, মুখমণ্ডল গোলাকার, মুখে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি ও মোছ রয়েছে। মুখ খুলে উপরের দাঁত দেখা যায়, ঠোঁট স্বাভাবিক, ঘাড় ভাঙ্গা, ডান হাতের কব্জি ও কুনই ভাঙ্গা। কুনইয়ের নিচে রক্তাত জখম রয়েছে। কব্জির কাছে জখমের দাগ রয়েছে। বাম হাত স্বাভাবিক, বুকের ডান পাশ ফুলা এবং ডান পাশে কালো দাগ রয়েছে। ডান পায়ের হাটুর নিচে ভাঙ্গা, বাম পাশের উপর মাঝ বরাবর ভাঙ্গা, দুই পা লম্বালম্বি অবস্থায় ও পিঠ স্বাভাবিক রয়েছে।”
মামলার আবেদনে বাদী উল্লেখ করেছে, ”সুমন দেবনাথ দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। পরিবারের অর্থিক অনটন এবং করোনা মহামারীর কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। সে সময় সুমন দেবনাথ বিভিন্ন স্থানে কাজকর্ম খুঁজে বেড়ায়। এই সুযোগে অভিযুক্ত ৫নং আসামি বীরেন্দ্র দেবনাথ ভালো চাকুরি দেয়ার প্রলোভন দেখায় সুমনকে এবং এবিএল কোম্পানিতে বীরেন্দ্র দেবনাথের পরিচিত লোক আছে এই বলে চাকুরি দেয়ার কথা বলে সুমন দেবনাথকে। বীরেন্দ্র দেবনাথ আরো বলে এক লাখ টাকা দিলে মাসিক ১৫ হাজার টাকা বেতনের অফিশিয়াল চাকুরি নিয়ে দিবে। পরে বিষয়টি সুমন তার বাবা-মাকে জানায়। তারা বলে এত টাকা দেয়া সম্ভব নয়। এতে মন খারাপ করে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেয় সুমন। একপর্যায়ে সুমনের বাবা ৫০ হাজার টাকা সংগ্রহ করে সুমনকে দেয়। ওই ৫০ হাজার টাকা নিয়ে ২৩ নভেম্বর সকাল ৭টার দিকে চাকুরি পাওয়ার উদ্দেশ্যে বীরেন্দ্র দেবনাথের সাথে বাড়ি থেকে এবিএল কোম্পানিতে যাওয়ার পর সুমন দেবনাথের আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরে ওইদিন সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে এবিএল কোম্পানি থেকে মোবাইল ফোনে তার বাবাকে জানানো হয় সুমন দেবনাথ কালীগঞ্জ উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি আছে। এ ঘটনা শুনে তার বাবা মারাত্মকভাবে বিমর্ষ হয়ে পড়ে এবং সিএনজিতে করে কালীগঞ্জ উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখে সুমন মারা গেছে। সে সময় তার বাবা সুমনের দেহে হাত দিয়ে দেখে ডান হাতের বিভিন্ন স্থানে একাধিক আঘাত, ২ পা ভাঙ্গা, বুক, পিঠ, মাথায়, গলায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে সুমনের বাবাকে জাননো হয় সে চাকুরির ইন্টারভিউ দিতে কোম্পানিতে গেলে তার ইন্টারভিউ ভালো না হওয়ায় সুমন দেবনাথ পাঁচ তলা থেকে লাফ দিয়ে পরে আত্মহত্যা করেছে। সুমনের বাবা এ কথা বিশ্বাস না করে চিৎকার করে বলতে থাকে অভিযুক্ত পাঁচ আসামি সুমনকে খুন করেছে। সে সময় সুকৌশলে আসামিরা পুলিশকে খবর দেয় এবং আসামিরা তাদের ইচ্ছামতো একটি কাগজে বাদীর স্বাক্ষর নেয়। সুমনের বাবা পরে জানতে পারে স্বাক্ষরিত কাগজটিতে অপমৃত্যু বিষয়ে লেখা ছিলো। পরে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পুলিশ এসে সুমনের লাশ দেখে এবং ডাক্তারি পরীক্ষার (ময়নাতদন্ত) জন্য লাশ গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের (মর্গ) পাঠায়। ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর লাশ বাড়িতে নিয়ে এসে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দাহ করা হয়। পরবর্তীতে বাদী সুমনের মৃত্যুর কারণ জানার জন্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজখবর নিতে থাকে। একপর্যায়ে তিনি জানতে পারেন ৫ নং আসামী ১ থেকে ৪ নং আসামী সাথে যোগসাজসে চাকরি দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এক লাখ টাকা আদায়ের উদ্দেশ্যে সুমনকে নিয়ে যায়। ঘটনার দিন সুমন সম্পূর্ণ টাকা সাথে না নেয়ায় আসামিরা ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে মারপিট করলে সুমন অজ্ঞান হয়ে পড়ে। সে সময় তাকে মৃত ভেবে পাঁচতলার ছাদ থেকে কোম্পানির ভেতরে পাকা স্থানে ফেলে দেয় আসামিরা। বিষয়টি বাদীকে না জানিয়ে লাশ হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে কোন উপায় না পেয়ে আসামিরা জানায় সুমন কোম্পানির পাঁচ তলা থেকে পড়ে আত্মহত্যা করছে।”
”আসামিরা পরিকল্পিতভাবে চাকুরির প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আদায়ের উদ্দেশ্যে সুমনকে হত্যা করে প্যানেল কোডের ৩০২/৩৪/৪০৬ ধারা অনুযায়ী অপরাধ সংঘটিত করেছে। এ বিষয়ে থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা গ্রহণ করেনি। তাই আদালতে মামলা দায়ের করেন।”

মামলার বাদী হরিলাল দেবনাথ বলেন, ”ঘটনার পর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করতে গেলে পুলিশ আমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে ফিরিয়ে দেন। পরে আদালতে মামলা দায়ের করেছি।”
বাদী পক্ষের আইনজীবি গাজীপুর জেলা জজ আদাতের ভারপ্রাপ্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মকবুল হোসেন কাজল বলেন, এবিএল কোম্পানির চারজনসহ পাঁচ জনকে আসামি করে গাজীপুর জেলা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (আমলি) আদালতে হত্যা মামলার আবেদন করা হয়। আবেদন আমলে নিয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্ত করে আগামী ২৩ জানুয়ারি প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।”
অভিযুক্ত এবিএল কোম্পানির এডমিন অফিসার মাহমুদুল হাসান বলেন, ”ঘটনার সময় আমি ঘটনাস্থলেই উপস্থিত ছিলাম না। দুর্ঘটনার পর খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে নিচে পড়ে থাকতে দেখি। কোম্পানির এডমিন অফিসার হিসেবে দায়িত্বের অংশ হিসেবে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম।”
অভিযুক্ত এবিএল কোম্পানির গাড়ি চালক ইসরাফিল খান বলেন, ”ঘটনার দিন বিকেল আমি গাড়ি নিয়ে কারখানার ভেতরে পার্কিং লটে অবস্থান করেছিলাম। সে সময় হঠাৎ আনুমানিক ৪টা থেকে পৌণে পাঁচটার মধ্যে সিকিউরিটি ইনচার্জ অচিন্ত্য দাশ আমাকে ডেকে বলেন দ্রুত গাড়ি নিয়ে যেতে। পরে আমি ব্লক ১ এবং ২ এর মধ্যবর্তী স্থানে গেলে সুমনকে গাড়িতে উঠায়। পরে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাই।”
অভিযুক্ত অপর তিন আসামি এবিএল কোম্পানির মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হাবিবুর রহমান, ক্লাক জান্নাত আরা এবং স্থানীয় বীরেন্দ্র দেবনাথের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের পাওয়া যায়নি।
ঘটনার দিন কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্তব্যরত চিকিৎসক ইউনুস কবির বলেছিলেন, ”বিকেল পাঁচটার সময় সুমন দেবনাথকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে। সে সময় তার হা-পা ভাঙ্গা অবস্থায় ছিলো। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি আরো বলেছিলেন, সুমনকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছিল মাহমুদুল হাসান নামে এক ব্যক্তি।”
সুরতহাল প্রস্তুতকারী কর্মকর্তা কালীগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) এইচ এম ইমন বলেন, ”ঘটনার দিন হাসপাতাল থেকে লাশ উদ্ধার করা হয়। ওই সময় হাসপাতালে লাশ থাকা অবস্থায় সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। সাক্ষীদের সাক্ষ্য অনুযায়ী আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হয়েছিল সে সময়। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেয়েছি। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী আইনি কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।”
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) গাজীপুর শাখার পরিদর্শক আব্দুল কাদের বলেন, ”মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলছে। তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।”
এ সংক্রান্ত আরো জানতে………….
কালীগঞ্জে ‘চাকুরির ইন্টারভিউ’ দিতে গিয়ে লাশ হয়ে ফিরল সুমন দেবনাথ!