সংগীতের আমির খুসরো

‘খুসরো নিজাম কে বাল বাল যাইয়ে,

মোহে সুহাগন কীনি রে, মোসে ন্যেয়না মিলাইকে’

আমির খুসরো সম্পর্কে না জানলেও সংগীতপ্রেমীদের কাছে এ লাইন দুটো পরিচিত। ‘ছাপ তিলাক’ শিরোনামের গানটিতে নিজামকে উদ্দেশ করে খুসরো যা বলেছেন তা মূলত সুফি ধারায় পীরকে উদ্দেশ করে বলা ভক্তের বক্তব্য। সুফি ধারায় পীরকে মাধ্যম ধরে স্রষ্টার বন্দনা করা হয়। দিল্লির বিখ্যাত সাধক হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া ছিলেন চিশতিয়া তরিকার অন্যতম প্রবর্তক। আমির খুসরোর একটি পরিচয় কবি কিন্তু এর চেয়েও বড় পরিচয় তিনি একজন সংগীতকার। তুতি-ই-হিন্দ খ্যাত খুসরোর ভারতীয় সংগীতে অবদান অনস্বীকার্য। আমির খুসরো বহু বাদ্যযন্ত্র তৈরির পাশাপাশি কাওয়ালির আনুষ্ঠানিক রীতির প্রবর্তন করেছিলেন। মূলত আজমীর, দিল্লি প্রভৃতি স্থানে আল্লাহ এবং তার নবীর সিফত (গুণগান) গাওয়া বহু পুরনো রীতি। আমির খুসরো সেখানে নতুন ধরনের প্রকাশভঙ্গি তৈরি করেন।

আরবি ‘কওল’ শব্দটির শাব্দিক অর্থ ‘কথা’। কাওয়ালি এখান থেকেই এসেছে, তবে পরিভাষা করতে গিয়ে বলা হয় ‘কওল’ মানে নবী মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কিত কথা। আজ কাওয়ালি বলতে নির্দিষ্ট নিয়মে দলবদ্ধভাবে গাওয়া গানকে বোঝায়, যেখানে আল্লাহ, নবীর পাশাপাশি সুফি তরিকার সাধকদের গুণগানও করা হয়। কাওয়ালির উৎস সন্ধানে গেলে ইমাম গাজ্জালি এবং শেখ সাদি রচিত নাতের কথা উঠে আসে। সাদি রচিত ‘বালাগাল উলা’-কে আমাদের দেশে রাসুলের সালাম বলে মনে করা হলেও এটি একটি নাত, যা কাওয়ালির ঢঙে গাওয়া হয়।

কাওয়ালির ঢঙে যাওয়ার আগে খুসরোয় ফিরে আসা প্রয়োজন। আমির খুসরো মূলত একজন কবি যার জীবন বহু উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ছিল নিজামুদ্দিন আউলিয়ার শিষ্যত্ব এবং সান্নিধ্য লাভ করার মাধ্যমে তার মধ্যে আধাত্ম্যভাবের আবির্ভব এবং এর ফলে তার কবিতা রচনার ধারাও পরিবর্তিত হয়। খুসরোর কবিতায় প্রকৃতি, লৌকিক প্রেমের পাশাপাশি স্রষ্টার গুণকীর্তন লক্ষিত হয়। এক্ষেত্রে তার প্রকাশটা সরল ছিল না বরং রূপকের আশ্রয় নিয়ে তিনি তা প্রকাশ করতেন। যেমন এ লেখার শুরুতে উল্লিখিত কবিতায় যদিও মনে হয় খুসরো এখানে নিজামের স্তুতি করছেন, কিন্তু মূলত খুসরো বলছেন নিজামের চোখে চোখ মিলিয়ে তিনি অরূপের সন্ধান পেয়েছেন। এ অরূপকে খোদার নূরও বলা যেতে পারে। মূলত তিনি বলতে চান নিজাম খোদার এতটাই নৈকট্য লাভ করেছেন যে নিজামের মাধ্যমে তিনিও সে নৈকট্য লাভ করতে চান। ‘মোহে আপনে হি রাঙ্গ মে রাঙ্গ লে নিজাম’ তথা ‘আমাকে তোমার রঙে রাঙাও নিজাম’ বলতে এ কথাই বলা হয়েছে।

ভারতে (এমনকি পারস্যে) সুফি-সাধকদের দরবারে গান-বাজনা অতি সাধারণ বিষয়। নিজামের দরগায় খুসরোর কবিতাগুলো সুর দিয়ে গাওয়া হতো। কিছু কবিতা স্বয়ং খুসরো আবৃত্তি করতেন কিংবা গাইতেন। সংগীতে খুসরোর জ্ঞান ও আগ্রহ ছিল সমান। ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে তার জানাশোনা ভালো ছিল, ফলে পারস্যের ‘সামা’ তাকে আকৃষ্ট করে এবং তিনি সেখান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কাওয়ালি প্রবর্তন করেন। গানের এ ধারায় নবী, পীর, দরবেশ বা ওলি-আল্লাহর গুণকীর্তন দিয়ে শুরু হয়ে স্রষ্টার মহীমার গভীরতা এবং স্রষ্টার সঙ্গে গায়কের নিবিড় সম্পর্কের কথা বলা হয়। কাওয়ালির গঠনের দিকে তাকালে দেখা যায় এতে কয়েকটি ধাপ থাকে। প্রথম ধাপ মূলত মহানবীর (সা.) স্তুতি দিয়ে শুরু করা হয়। যদিও তত্ত্ব অনুসারে ‘হামদ’-এর মাধ্যমে কাওয়ালি শুরু হওয়ার কথা কিন্তু সে হামদ (আল্লাহ্র প্রশংসা) আসলে নাতের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। এরপর ‘মানকুবাত’ যেখানে আলী (রা.) থেকে শুরু করে সুফিদের প্রশংসা-গীত হয়। অতঃপর মার্সিয়া, গজল, কাফি ও শেষে মোনাজাতের মধ্য দিয়ে কাওয়ালি শেষ হয়।

দরগাহে গাওয়া এ গানের জন্য দলবদ্ধ সংগীত তৈরি করেন খুসরো। তিনি ভারতীয় সংগীতকে বেশকিছু বাদ্যযন্ত্র দিয়েছিলেন যার মধ্যে সেতার অন্যতম। তবে বাদ্যযন্ত্রের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা থাকায় কাওয়ালির সূচনায় বাদ্যযন্ত্র ব্যবহূত হতো না। কিন্তু গানের ক্ষেত্রে তাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই হাততালি দেয়ার মাধ্যমে তাল ঠিক রাখা হতো। কাওয়ালি দল তৈরি করার এটিও একটি কারণ। আবার অনেক ক্ষেত্রে খুসরো ও অন্য কবিরা এমন কিছু কাওয়ালি লিখেছিলেন, যা কথোপকথের মধ্য দিয়ে এগোয়। পাঞ্জাবের ‘কাফি’ এ ধরনের হয়ে থাকে, যা পরে কাওয়ালিতে অন্তর্ভুক্ত হয়। কথোপকথন এবং সওয়াল-জওয়াব (আল্লামা ইকবালের ‘শিকওয়াহ’ ও ‘জওয়াব-এ-শিকওয়াহ’ উল্লেখযোগ্য) দিয়ে তৈরি কাওয়ালিতে দলবদ্ধ উত্তর এবং কখনো কখনো কোরাস তোলার প্রয়োজন হতো। এ কারণে মূল কাওয়ালের (কখনো কখনো দুজন) বাইরে বাকিরা একত্রে একটি লাইন গেয়ে ওঠেন। এ দলকে ‘হামনাওয়া’ বলা হয়। উর্দু শব্দটির শাব্দিক অর্থ ‘সাথী’। কেউ কেউ বলেন কাওয়ালির দলে ১১ জন থাকতে হয়। তবে এমন কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। ছয়-সাত, দশ-বারোজনের দলও হতে পারে।

কাওয়ালির গঠন, ভাষা ও উপমার ব্যবহারে মহানবীকে (সা.) কল্পনা করা হয়, তাকে সম্বোধন করা হয়। পীরকে তার চেয়েও সরাসরি সম্বোধন করা যায়। কাওয়ালিতে খেয়াল করলে দেখা যাবে ‘ইয়া মুইনউদ্দীন’ (হে মুইনউদ্দীন), ‘ইয়া খাজা’ (হে খাজা) বলে সম্বোধন করা হয়। কাওয়ালির শুরুর দিকে কখনো কখনো রীতিমতো কুরআনের আয়াত পাঠ করা হয়। মধ্যভাগে হাদিসের উদ্ধৃতি দেয়াও বিচিত্র নয়। আল্লাহকে কখনো সরাসরি আবার কখনো উপমার মাধ্যমে সম্বোধন করা হয়। খুসরো প্রবর্তিত কাওয়ালির (যা এখনো চলে আসছে) একটি বৈশিষ্ট্য হলো সূচনার ভাষা জটিল হলেও এরপর তুলনামূলক সহজ কথ্য ভাষা ব্যবহূত হয়। গানের সূচনায় হারমোনিয়াম বাজানো হয়, কখনো কখনো কোনো বাদ্যই বাজে না কিন্তু মধ্যভাগে বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার হয়। এ পর্যায়ে শব্দের উচ্চারণ ও স্বরগ্রাম উচ্চ হতে থাকে। গানের শেষ দিকে ধীরতা ফিরে আসে এবং মোনাজাত বা দোয়া করার মাধ্যমে শেষ হয়।

আমির খুসরোর তত্ত্বাবধানে নিজামুদ্দিন আউলিয়ার দরগাহে নিয়মিত কাওয়ালির আয়োজন হতো। খুসরো তার দলবল নিয়ে ভারতের প্রান্তে প্রান্তে ঘুরে কাওয়ালি প্রচার করেননি কিন্তু কাওয়ালি জনপ্রিয় করার পেছনে তার অবদানের একটি বিশেষ দিক হলো তার ভাষা। ফার্সির সঙ্গে হিন্দি, ব্রজবুলি ভাষা ব্যবহার করার কারণে মানুষের কাছে তা সহজবোধ্য হয়। পরবর্তী সময়ে হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতে ‘খেয়াল’ নামে যে শাখার সৃষ্টি হয় তা খুসরোরই অবদান। এছাড়া ‘তারানা’ও খুসরোর আবিষ্কার। ভারতে প্রচলিত নানা প্রকার বীণা দেখে নিজস্ব সংগীতজ্ঞান থেকে তিনি তিন তারের বীণা তৈরি করেন যা আজ সেতার নামে পরিচিত। এ বাদ্যযন্ত্রগুলো নানাভাবে বিশেষায়িত হয়েছে এবং কাওয়ালিতে বর্তমানে তবলা, হারমোনিয়াম, সেতার বহু কিছুই ব্যবহার করা হয়। কাওয়ালিতে খুসরোর আরেকটি অবদান ‘কাওয়াল বাচ্চো কা ঘরানা’। খুসরোর সময়ে কাওয়ালি দলের সদস্যদের মধ্য দিয়ে এ ঘরানার যাত্রা। খুসরো নিজে ১২ জন শিষ্যকে কাওয়ালির তালিম দিয়েছিলেন। পরে তাদের উত্তরপুরুষরা ধারাটি জারি রাখেন।

খুসরোকে যদিও উর্দু সাহিত্যের জনক বলা হয়, হিন্দিতে তার অবদান কম নয়। গানের ধারার সঙ্গে সঙ্গে খুসরোর হাতে হিন্দি ভাষার উন্নতি সাধিত হয়। আজ যাকে আমরা হিন্দি বলে জানি খুসরোর সময়ে তা ‘হিন্দভি’ নামে পরিচিত ছিল। খুসরো তার কাওয়ালিকে মানুষের কাছাকাছি আনতে পরিচিত রূপক ব্যবহার করেন। ব্রজবুলির পাশাপাশি ‘হোলি’, ‘রঙ’ এমনকি গানে বর্ষার রূপ বর্ণনা মানুষকে কাওয়ালির সঙ্গে আরো যুক্ত করেছে। এ কারণে ‘আজ রাঙ্গ হ্যায়’ গানটির সঙ্গে মানুষ এ যুগেও নিজেকে একাত্ব করতে পারে। খুসরো তার কাওয়ালিতে রূপকের ব্যবহারে অনেক ক্ষেত্রে স্রষ্টা ও সৃষ্টিকে যথাক্রমে পুরুষ ও নারী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। সেসব ধারার কাওয়ালি কথোপকথন বা নিবেদনের ভাষায় রচিত। গায়ক নিজেকে স্রষ্টার কাছে নিবেদন করে। কখনো দ্বিতীয় গায়ক এর উত্তর দেয়। পাশাপাশি তার কাওয়ালিতে সুফি-সাধকদের সম্মান জানানো হয়। কেবল নিজামুদ্দিন নন, দিল্লি, পাঞ্জাব, সিন্ধু, আফগানিস্তানের পরিচিত, অপরিচিত পীরদের তিনি সম্মান জানিয়েছেন। উল্লিখিত কাওয়ালিতে তিনি নিজামুদ্দিন থেকে শুরু করে কুতুবউদ্দীন বখতিয়ার, ফরিদউদ্দীন, খাজা মুইনউদ্দীন চিশতিকে স্মরণ করেছেন। তার কাওয়ালির মধ্য দিয়ে এ সাধকরা বেঁচে আছেন মানুষের মাঝে।

খুসরো মূলত সংগীতের মধ্য দিয়ে খোদাকে খুঁজেছেন, প্রশংসা করেছেন তাদের, যারা আল্লাহর দিদার লাভ করতে জীবনভর সাধনা করেছেন। এর মধ্যে খুসরো সরাসরি পেয়েছিলেন নিজামকে। নিজামুদ্দিনও খুসরোকে আধ্য্যাত্মিক জগতের সন্ধান দিয়েছিলেন। কিংবদন্তি আছে, মৃত্যুর আগে নিজামুদ্দিন তার অনুসারীদের বলেছিলেন, ‘খুসরোকে আমার কবরের কাছে আসতে দিয়ো না। তার ক্রন্দন শুনে তাকে জড়িয়ে ধরতে আমি হয়তো দুনিয়ার নিয়ম ভেঙে উঠে আসা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারব না।’ নিজামুদ্দিন সমাধিস্থ হওয়ার কয়েক মাস পরই খুসরো মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু রেখে গেছেন অগণিত শিষ্য, অনুসারী, কবিতা, গান, কাওয়ালি ও কাওয়াল, সুর, রাগ এবং বাদ্যযন্ত্র। এখনো ভারতীয় উপমহাদেশ এমনকি তার বাইরেও খুসরোর কালাম গাওয়া হয়। সেতারে সুর খেলে। তার রচিত কাওয়ালি শুনে ভক্তরা কান্নায় ভাসতে থাকে। নিজামুদ্দিনের দরগাহে ঘুমিয়ে থাকা খুসরো মিশে থাকেন এতসব কিছুর মধ্যে।

আলী আমজাদ: লেখক