আইইইএফএর পর্যবেক্ষণ: বিপিডিবির সবচেয়ে বড় বোঝা এখন পায়রা!

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র (আইপিপি) থেকে বিদ্যুৎ ক্রয় বাবদ গত অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) ব্যয় বেড়েছে ৫৮ শতাংশ। সংস্থাটির এ ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল পায়রা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের। গত অর্থবছরে এখান থেকে প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুৎ ৮ টাকা ৬০ পয়সা করে কিনেছে বিপিডিবি। আগের অর্থবছরে এ ব্যয় ছিল প্রতি কিলোওয়াট ৬ টাকা ৩০ পয়সা করে। সে হিসেবে গত অর্থবছরে পায়রা থেকে বিদ্যুৎ কেনায় বিপিডিবির কিলোওয়াটপ্রতি ব্যয় বেড়েছে আগের অর্থবছরের তুলনায় সাড়ে ৩৬ শতাংশ।

দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট সক্ষমতার পরিমাণ ২৫ হাজার ২৩৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতাই বেশি। যদিও গত অর্থবছরে আইপিপি থেকেই বেশি বিদ্যুৎ ক্রয় করেছে বিপিডিবি। এর প্রভাবে সংস্থাটির পরিচালন ক্ষতি গত অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে দ্বিগুণে। বড় এ ক্ষতি পোষাতে গিয়ে গত অর্থবছরে শুধু বিপিডিবির পেছনেই সরকারের দেয়া ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়ায় রেকর্ড ১১ হাজার ৭০০ কোটি টাকায়।

জ্বালানিবিষয়ক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ) এক পর্যবেক্ষণ দিয়ে বলেছে, আইপিপি থেকে বিদ্যুৎ ক্রয় বাবদ বিপিডিবির খরচ গত অর্থবছরেই প্রথমবারের মতো সংস্থাটির মোট পরিচালন ব্যয়ের অর্ধেকেরও বেশিতে দাঁড়ায়। এক্ষেত্রে প্রধানতম ভূমিকাটি ছিল পায়রা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের। পায়রা থেকে শুধু বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য বাবদই বিপিডিবির ব্যয় বেড়েছে সাড়ে ৩৬ শতাংশ। এর সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির সক্ষমতা বাবদ দেয়া অর্থসহ অন্যান্য ব্যয় যুক্ত হয়ে সংস্থাটিকে আর্থিকভাবে আরো নাজুক অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে।

উৎপাদন সক্ষমতার বিচারে দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র পটুয়াখালীর পায়রা তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প। সঞ্চালন ব্যবস্থা প্রস্তুত না হওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটির একটি ইউনিটকে এখন বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ব্যবহূত ও অব্যবহূত সক্ষমতার জন্যও বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করে যাচ্ছে বিপিডিবি। গত অর্থবছরেও পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানকে এ বাবদ মাসে প্রায় ১৩০ কোটি টাকা করে পরিশোধ করেছে বিপিডিবি। সে হিসেবে বিদ্যুৎ কেনা ছাড়াও গত অর্থবছরে শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রটির সক্ষমতা বাবদই দেড় হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ ব্যয় করেছে সংস্থাটি।

বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিচালনা করছে বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিসিপিসিএল)। ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট উৎপাদনে আসে ২০২০ সালের জুনে। একই বছরের ডিসেম্বরে উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত হয়ে ওঠে দ্বিতীয় ইউনিটও। কিন্তু সঞ্চালন অবকাঠামো প্রস্তুত না হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে কাজে লাগানো যাচ্ছে না ইউনিটটিকে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদন সক্ষমতার বিষয়টি মাথায় রেখেই এটিকে যথাসময়ে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে সঞ্চালন লাইন নির্মাণের প্রকল্পও হাতে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু সে লাইনের কাজ যথাসময়ে শেষ করতে পারেনি পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)। ফলে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটকে বসিয়ে রাখতে হয়েছে। বর্তমানে সঞ্চালন লাইন প্রকল্পের পদ্মা নদী ক্রসিংয়ের কাজ চলমান রয়েছে।

পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক শাহ আব্দুল মাওলা বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পুরোদমে উৎপাদন সক্ষম হয়েছে বহু আগে। তবে সঞ্চালন লাইনের কারণে আমরা এখানকার বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারছি না। বর্তমানে দৈনিক ৪৫০-৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে। পিজিসিবি জানিয়েছে, চলতি বছরের ডিসেম্বর নাগাদ তারা লাইন নির্মাণের কাজ শেষ করবে।

মোট সক্ষমতার অর্ধেক ব্যবহূত হওয়ায় অনেক আইপিপিকেই এখন বসিয়ে রেখে অর্থ দিতে হচ্ছে বিপিডিবিকে। একই সঙ্গে বিদ্যুতের মূল্য পরিশোধ করার পাশাপাশি জীবাশ্ম জ্বালানির অস্থিতিশীল বাজারের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতার কারণে সংস্থাটির আর্থিক অবস্থার দিন দিন অবনতি হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বর্তমান বাস্তবতায় বিপিডিবির পরিচালন ক্ষতি বাড়তে থাকায় সামনের দিনগুলোয় সরকারি ভর্তুকি ও ট্যারিফের ওপরও চাপ বাড়তে থাকবে। সংস্থাটি নিজেও জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরে বিপিডিবির সরকারি ভর্তুকির প্রয়োজন পড়তে পারে ২০ হাজার কোটি টাকা।

২০২০-২১ অর্থবছরে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বাবদ বিপিডিবিকে অর্থ গুনতে হয়েছে ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। যদিও এ সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে মোট সক্ষমতার অর্ধেক।

বিদ্যুতের নীতি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, সক্ষমতা বাবদ ব্যয় কমানোর বিকল্প পথ একটিই। সেটি হলো ব্যক্তিমালিকানাধীন কোম্পানি থেকে বেরিয়ে আসা এবং সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা। তবে দুই ক্ষেত্রেই সক্ষমতার ব্যয় পরিশোধ করতে হয়। ব্যক্তিমালিকানাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রে তা আলাদা করে পরিশোধ করা হয় বলে এ হিসাবটা দেখা যায়। কিন্তু সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে সরকারিভাবেই পরিশোধ করা হয় বলে তা বোঝা যায় না। তবে বিদ্যুতের রিজার্ভ মার্জিন কমানো গেলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর বিনিয়োগটা কমে আসবে। সেক্ষেত্রে সক্ষমতা বাবদ ব্যয়ও কম হবে।

বিপিডিবির এ আর্থিক চাপ এসে পড়ছে ভোক্তাদের ওপরও। জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি ও বিদ্যুৎ ক্রয়ে ব্যয় বাড়ার কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) গত মাসেই বিদ্যুতের পাইকারি মূল্য ৬৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বিপিডিবি। সংস্থাটি বারবার বলছে, বিদ্যুতের মূল্য না বাড়ানো হলে প্রতিষ্ঠানটির ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ৩২ হাজার ৫০০ কোটি টাকায়।

সংস্থাটির গত অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে মোট ১২ হাজার ৯৬৭ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন রয়েছে। সব মিলিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষ নাগাদ ১৯ হাজার ৬৫১ মেগাওয়াট (বর্তমানে নির্মাণাধীনগুলোসহ) সক্ষমতা যোগ করার পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থাটির। যদিও এ সময়ের ভেতর পুরনো সক্ষমতার মধ্যে অবসরে যাবে মাত্র ৩ হাজার ৯৯০ মেগাওয়াট। তবে এ সময়ের মধ্যে উৎপাদন বাড়বে সক্ষমতার চেয়ে অনেক ধীরগতিতে। অর্থাৎ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতার ব্যবহারের হার দিনে দিনে আরো কমতে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে যদি বিদ্যুৎ উৎপাদন ১২ শতাংশ হারেও বাড়ে, সার্বিকভাবে সক্ষমতার ব্যবহার নেমে আসবে মাত্র ৩৮ শতাংশে।

 

সূত্র: বণিক বার্তা