প্রকাশ্যে ধরে নিয়ে গেছে পুলিশ, পাঁচ বছরেও হদিস নেই ৪ আওয়ামী লীগ নেতার!

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : টেঁটা-বল্লমের রাজধানী নামে খ্যাত নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার বাঁশগাড়ি ইউনিয়ন। এটি রায়পুরা থেকে একটি বিচ্ছিন্ন ও দুর্গম মেঘনা নদীর চর এলাকা। এখানকার দুটি এলাকার নাম বালিয়াকান্দি ও রাজনগর। দুই এলাকার চারটি পরিবারের মানুষ গত প্রায় ৫ বছর ধরে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। তাদের প্রতিটা দিন ভয় ও আতঙ্ক নিয়ে শুরু হয়। স্বজন হারানো কষ্ট তাদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে প্রতিনিয়ত। বিকাল ৩টা বাজলেই তাদের মধ্যে একটা আতঙ্ক বিরাজ করে। নিস্তব্ধ হয়ে যায় তাদের চারপাশ।

কারণ ওই সময়টা এলেই মনে পড়ে যায় পাঁচ বছর আগের সেই ভয়াবহ দিনের কথা। তাদের অভিযোগ- ওই দিনটিতে এসব পরিবারের চারজন আওয়ামী লীগ নেতাকে পুলিশ প্রকাশ্যে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। এরপর থেকে তাদের আর সন্ধান মিলেনি। থানা থেকে শুরু করে আদালতপাড়া, জেলখানা এমনকি হাসপাতালের মর্গে ঘুরে বেড়িয়েছেন। কোথাও সন্ধান মিলেনি নিখোঁজ ব্যক্তিদের। বরং নিখোঁজদের সন্ধান করতে গিয়ে পরিবারের অন্যান্য স্বজনদের ওপর নেমেছে ভয়ঙ্কর খড়গ।

অভিযোগ আছে, যারাই নিখোঁজদের সন্ধান করেছেন পুলিশ মিথ্যা মামলায় তাদেরকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে নির্যাতন করেছে। নিজের মতো করে চিকিৎসা করানোর সুযোগ দেয়া হয়নি। তাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে ও ভেঙে দেয়া হয়েছিল। শুধু ওই চারটি পরিবারই নয়, তাদের প্রতি যারা সমবেদনা জানিয়েছেন তাদেরকেও মারধর, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১৭ সালের২৬শে মে। দিনটা ছিল শুক্রবার। জুমার নামাজ পড়ে দুপুরের খাবার খেয়ে বাঁশগাড়ি ইউনিয়নের বাসিন্দারা বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। কেউ কেউ ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত ছিলেন। হঠাৎ করেই ইউনিয়নের রাজনগর এলাকায় দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়। ততক্ষণে খবর ছড়িয়ে পড়ে আশেপাশের আরও কয়েকটি এলাকায়। চিৎকার দিয়ে চারদিক থেকে মানুষ ওই এলাকার দিকে ছুটছিল। স্থানীয়রা গিয়ে দেখতে পান রাজনগরের কান্দাপাড়া নদীর ঘাটের ট্রলার থেকে চারজনকে পুলিশ ধরে নিয়ে যাচ্ছে। এদের মধ্যে একজন ছিলেন বাঁশগাড়ি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি রুপ মিয়া (৫০)। তিনি ওই সময় ইউপি সদস্য ছিলেন। এ ছাড়া বাঁশগাড়ি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ক্রীড়া সম্পাদক হাবিবুর রহমান ওরফে হাবি মেম্বার (৪৮)। তিনিও এক সময় ইউপি সদস্য ছিলেন। বাঁশগাড়ি ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি জাকির হোসেন (৪৫) ও বাঁশগাড়ি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আজিজুল ইসলাম (৪০)। চারজনের মধ্যে রুপ মিয়ার নামে এলাকাভিত্তিক সংঘর্ষের মামলা ছিল। বাকিদের নামে কোনো মামলাও ছিল না। এলাকাবাসী তখন পুলিশের ওই সদস্যদের বলেন, যার নামে মামলা আছে তাদেরকে নিয়ে যান। কিন্তু যাদের নামে মামলা নেই তাদেরকে কেন নিয়ে যাচ্ছেন। এসব নিয়েই পুলিশ ও স্থানীয়দের মধ্যে বাকবিতণ্ডার সৃষ্টি হয়। উভয়পক্ষের মধ্যেই উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। স্থানীয়রা পুলিশের কাছ থেকে ওই চারজনকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন।

এতেই শুরু হয় সংঘর্ষ। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গুলি ছোড়ে। পুলিশের গুলিতে মুস্তফা নামের এক যুবক মারা যান। স্থানীয়রা চড়াও হয় পুলিশের ওপর। ওইদিন উপস্থিত গ্রামবাসীর সামনে থেকেই চার ব্যক্তিকে নিয়ে যায় পুলিশ। এরপর থেকে আর কোনো হদিস মেলেনি ওই চার নেতার। এ ছাড়া স্থানীয়রা সংঘর্ষের সময় পুলিশের এক সদস্যকে আটকে রেখেছিল। তাদের দাবি ছিল যাদেরকে আটক করা হয়েছে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হলে পুলিশ সদস্যকে ছেড়ে দেয়া হবে। পরে পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে পুলিশ সদস্যকে নিয়ে যান এবং আটকদের আইনি প্রক্রিয়ায় আনা হবে বলে আশ্বাস দেন।

স্থানীয়রা বলেন, ঘটনার পর কয়েক ঘণ্টা ওই চারজনকে বাঁশগাড়ি পুলিশ ক্যাম্পে রাখা হয়েছিল। তারপর রাতে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে একটি কালো গাড়িতে করে তাদেরকে কোথাও নিয়ে যাওয়া হয়। আটকদের স্বজন ও স্থানীয়রা ভেবেছিলেন হয়তো পরের দিন তাদের আদালতে তোলা হবে। কিন্তু তাদেরকে আদালতেও তোলা হয়নি, জেলেও পাঠানো হয়নি। এলাকাবাসী ও স্বজনদের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও পুলিশ বা অন্য কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ ঘটনার তদন্ত করেনি।

প্রকাশ্য শত শত মানুষের চোখের সামনে থেকে ওই চারজনকে তুলে নিলেও পুলিশ স্বজনদের বলেছে তারা তুলে নিয়ে যায়নি। বরং আটক করার পর স্থানীয়রা তাদেরকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। ঘটনার পরে রায়পুরা থানার এসআই মো. রইজুল আলম বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। ওই মামলার অভিযোগে তিনি বলেন, ওইদিন দায়িত্ব পালনকাল তিনি গোপন সংবাদের ভিত্তিতে খবর পান কুখ্যাত সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, টেঁটা বাহিনীর সর্দার রুপ মিয়া বাঁশগাড়ি ইউনিয়নের রাজনগর এলাকার কান্দাপাড়া নদীর ঘাটে অবস্থান করছে। পরে তিনি সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার বেলাল হোসাইনের নেতৃত্বে রায়পুরা থানার ওসি ও পুলিশ পরিদর্শকের (তদন্ত) সমন্বয়ে অন্যান্য অফিসার ও ফোর্সসহ বিকাল তিনটায় নদীর ঘাট থেকে রুপ মিয়াকে গ্রেপ্তার করে বাঁশগাড়ি পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের দিকে রওয়ানা দেন। এ সময় রুপ মিয়া মেম্বার পুলিশের কাছ থেকে তাকে ছিনিয়ে নেয়ার জন্য চিৎকার করে তার সমর্থকদের পুলিশ সদস্যদের ঘেরাও করার নির্দেশ দেন। রাজনগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে আসার পর নাম উল্লেখ করা ২৩ জন ও আরও ২০০-৩০০ অজ্ঞাত রুপ মিয়ার সমর্থক টেঁটা, বল্লম, ককটেল নিক্ষেপ ও বন্দুক দিয়ে গুলি করে রুপ মিয়াকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও নিখোঁজদের প্রতিবেশী আবদুল গফুর বলেন, ঘটনার দিন আমি মাঠে আলু তুলছিলাম। হঠাৎ করেই চিৎকার-চেঁচামেচি শুনতে পাই। তাড়াহুড়া করে গিয়ে দেখি চারজন ব্যক্তিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। এদের তিনজনকে আমি চিনি। বাকি একজনকে চিনতাম না। তিনজনের মধ্যে দু’জন ইউপি সদস্য ছিলেন। আর একজন নির্বাচন করে ফেল করেছিলেন। তারা সবাই গরিবদের দুঃখে সমব্যাথী ছিলেন। বিপদে পড়ে যে যখন ডাকতেন তাদেরকে পেতেন। তার অভিযোগ, চক্রান্ত করেই তাদেরকে গ্রেপ্তার করে গুম করা হয়েছে। তিনি বলেন, পাঁচ বছর ধরে কোনো ব্যক্তি তাদের খোঁজ নিতেও যেতে পারেনি। থানায় ঢুকতে পারে না। যারা যায় তাদেরকে পঙ্গু করে দেয়া হয়। তিনি বলেন, দলাদলি ও নির্বাচন নিয়েই সিরাজুল হক চেয়ারম্যানই এই চক্রান্ত করেছে। কিন্তু গুম হওয়া কেউই এটি বুঝতে পারেনি।

ঘটনার দিন পুলিশের ওই অভিযানে ছিলেন এবং আহত হয়েছিলেন এমন এক পুলিশ সদস্য জানিয়েছেন, সেই অভিযানে পুলিশের সঙ্গে তৎকালীন চেয়ারম্যান সিরাজুল হকের ৮ থেকে ৯ জন অনুসারীও ছিলেন। তাদের সবার পরনে পুলিশের পোশাক পরা ছিল। তাই এলাকার অনেকেই তাদের চিনতে পারেনি। যারা ছিল তাদের মধ্যে রয়েছেন সিরাজ চেয়ারম্যানের ছেলে আশরাফুল হক যিনি সদ্য ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন করেছেন। এছাড়া বাবুল, কবির, শিপন, আমির, হবি, সেলিম স্বপন ও আবু হানিফ ছিলেন। ওইদিন পুলিশের সঙ্গে ট্রলারে করে সিভিল পোশাকে তাদের কয়েকজন এসেছিলেন। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও মানবজমিনের কাছে এসেছে। এছাড়া ওই পুলিশ সদস্য ও স্থানীয়রা দাবি করেন, ঘটনার সময় নরসিংদী জেলা পুলিশ সুপার হিসেবে ছিলেন আমেনা বেগম। সার্কেল এএসপি ছিলেন বেলাল হোসাইন। রায়পুরা থানার ওসি ছিলেন আজহার। এই তিন কর্মকর্তা ঘটনার আদ্যোপ্রান্ত জানেন।

স্থানীয় এমপি রাজিউদ্দিন রাজুর ২০১৮ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি একটি বক্তব্য রুপ মিয়াসহ অন্য চারজনকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে এটা আরও স্পষ্ট হয়েছে। তিনি ওইদিন রায়পুরার নিলক্ষা ইউনিয়নের সফদর আলী খান উচ্চ বিদ্যালয়ে মাঠে এক সভার বক্তব্যে বলেছিলেন, নিলক্ষ্যায় আসার সময় আউয়াল মুন্সি ও তাজুলরে দেখলাম। সবার নাম কিন্তু আমার কাছে আছে। মনে রাইখো তোমরা মাছের পেটে যাইও না। বুঝছো মিয়া বড় বড় প্রধ্যাইন্যা রুপ মিয়া, টুপ মিয়ারা কই? পুলিশ কোথায় তাদের খাইয়া ফালাইছে কেউ জানে না। চার নেতা গুম হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘বাঁশগাড়ির রুপ মিয়াকে বুঝাইছিলাম সময় কিন্তু ভালো না। পুলিশ তোমার ওপর খ্যাপা। অন্য কোথাও চলে যাও। কিন্তু সে যায় নাই। আর শহিদ যদি মনে করে শহিদের বাড়ি একটা দুর্গ। এটা ঠিক না শহিদ মিয়া। পুলিশ করতে পারে না- এমন কোনো কাজ নাই। একদিন দেখবা টুপ কইরা তোমারে ধইরা নিয়ে গেছে।’

ঘটনার পর রায়পুরা আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের পক্ষ থেকে ফেসবুকে বিভিন্ন পোস্ট দেয়া হয়েছিল। ২০২০ সালের ২৭শে মে রায়পুরা যুবলীগের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে দেয়া পোস্টে বলা হয়, ওসি আজহার হাজারো জনতার মাঝ থেকে বাঁশগাড়ি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের চার নেতাকে ধরে নিয়ে যায়। আজ পর্যন্ত তাদের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। ওই পোস্টে আরও বলা হয়, ওসি আজহার বলতে পারবে তাদেরকে কোথায় রেখেছে।

অনুসন্ধান ও স্থানীয়দের তথ্যমতে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে বাঁশগাড়ি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি শাহেদ সরকার ও ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সিরাজুল হকের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছিল। ইউনিয়নের বাসিন্দারা দুইভাগে বিভক্ত। এক পক্ষ শাহেদের পক্ষে অন্যপক্ষ সিরাজের। তাদের গ্রুপের বাইরে থাকার সুযোগ ছিল না কারও। টানা ৩০ বছর চেয়ারম্যান ছিলেন সিরাজ। তিনি আশির দশকে জাতীয় পার্টির রাজনীতি করতেন। পরে যোগ দেন বিএনপিতে। আলোচনা আছে সিরাজ রায়পুরা উপজেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন। পরবর্তীতে স্থানীয় এমপি রাজিউদ্দিনের হাত ধরে ২০১৪ সালে যোগ দেন আওয়ামী লীগে। সিরাজ ১৯৮৩ সালে সর্বপ্রথম ইউপি সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। পরে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে চেয়ারম্যানও হন। আওয়ামী লীগে যোগ দেয়ার পর তিনি এমপি’র আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচন করেন। অথচ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি হয়েও শাহেদ সরকার আশীর্বাদ পাননি। ওই নির্বাচনে সিরাজুল নির্বাচিত হন। কারণ তার প্রভাবের কাছে তটস্থ হয়ে এলাকা ছাড়া ছিলেন শাহেদ সরকারের সমর্থকরা। নির্বাচনী ওই দ্বন্দ্ব তুমুল আকার ধারণ করে। প্রায়ই দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ লেগে থাকতো। টেঁটা, বল্লম, ককটেল, বন্দুক নিয়ে দিনভর দু’পক্ষ যুদ্ধ করতো। প্রভাব খাটিয়ে সিরাজ নিয়ন্ত্রণ করতেন পুলিশ প্রশাসনকে। মামলা-হামলায় একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল তার। স্থানীয় ও নিখোঁজদের স্বজনরা দাবি করছেন মূলত সিরাজ চেয়ারম্যানের সঙ্গে শাহেদ সরকারের এই দ্বন্দ্বের বলি হয়েছেন ওই চারজন। ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান শাহেদ সরকার। এলাকায় কথিত আছে চারজন নিখোঁজের পর এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন সিরাজ। শাহেদ সরকারের কোনো সমর্থক ও নিখোঁজদের স্বজনরা একসঙ্গে বসার সুযোগ ছিল না। মামলা জিডি তো দূরের কথা কেউ থানার আশপাশে যেতে পারতো না। মোবাইল চালানো ও ঘুমানো যেতো না। নিখোঁজদের নিয়ে যারা কথা বলতো তাদেরকে ধরে নিয়ে মারধর, মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হতো। অনেককে পঙ্গু করে দেয়া হয়েছে। পঙ্গু হয়েছেন এরকম চারজনের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়েছে। স্থানীয়রা বলেছেন, নিখোঁজদের সন্ধানে ছুটাছুটি করার জন্য প্রায়ই হুমকি-ধমকি দেয়া হতো শাহেদ সরকারকে। তাকে বলা হতো অন্যদের পায়ে গুলি করা হয়েছে। আর তার বুকে গুলি করা হবে। এসব চাপ সহ্য করতে না পেরে তিনি মারা যান। পরের মাসে খুন হন সিরাজ চেয়ারম্যানও।

রূপ মিয়ার ভাতিজা মাইনুদ্দিন বলেন, আমার কাকা এমন কি দোষ করেছিল তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়ে গুম করে দিবে। পুলিশ ধরে নেয়ার পরে আমি থানা থেকে শুরু করে কোর্টে এবং জেলে গিয়ে খোঁজ নিয়েছি। কোথাও কাকার সন্ধান পাইনি। প্রধানমন্ত্রীর কাছে দুই হাত জোড় করে একটাই অনুরোধ করি আমার কাকাকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করুন। তিনি যদি কোনো অপরাধ করে থাকে তবে তাকে জেলে পাঠিয়ে দেয়া হোক। তারপরও তাকে জীবিত ফিরিয়ে দিন। এটাই আমার দাবি। নিখোঁজ হওয়ার পর তাকে খুঁজতে গিয়ে আমি প্রতিবন্ধী হয়েছি। আমার একটা পা নাই। ১৬ বছর আমি সৌদি আরবে ছিলাম। কাকা নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়ে আমি দেশে আসি। বিভিন্ন স্থানে কাকার সন্ধান করায় আমি আজ প্রতিবন্ধী। পুলিশ আমাকে মিথ্যা মামলা দিয়ে ধরে নিয়ে আমার পায়ে গুলি করেছে। শুধু গুলি করেই তারা থামেনি। আমার বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলা দেয়া হয়েছে। যাতে করে সারা জীবন জেলে কাটাতে হয়। প্রতিবন্ধী হয়েও কোর্টে গিয়ে হাজিরা দেই। এ ছাড়া সৌদি আরব যাওয়ার সময় রায়পুরা থানা পুলিশ তুলে এনে চোখ বেঁধে আমার পায়ে গুলি করেছিল। পঙ্গু হাসপাতালে ঠিকমতো চিকিৎসা করাতে পারিনি। পুলিশের নির্দেশনা অনুযায়ী চিকিৎসা হয়েছিল। পায়ের রগ কেটে আমাকে পরিকল্পিতভাবে পঙ্গু বানানো হয়েছিল।

রূপ মিয়ার স্ত্রী নাসিমা বেগম বলেন, আমরা চোর, ডাকাত বা সন্ত্রাসী না। আমরা শুধু আওয়ামী লীগ করি। অথচ পুলিশ ধরে নেয়ার পরে পাঁচ বছর ধরে স্বামীর খোঁজ পাচ্ছি না। সন্তানদের নিয়ে অনেক কষ্টে দিন কাটাচ্ছি। প্রতিদিনই অপেক্ষায় থাকি কখন আমার স্বামী আসবে। বিকাল হলে মনের ভেতর সেই ভয়ঙ্কর দিনের স্মৃতি নাড়া দিয়ে ওঠে।

বাঁশগাড়ি ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি হারুন মিয়া বলেন, প্রায় পাঁচ বছর ধরে আমার ভাই আজিজুল ইসলামসহ চারজন নিখোঁজ। আমার ভাইকে খুঁজতে গিয়ে আমি আমার পা হারিয়েছি। শুধুমাত্র তাদেরকে খোঁজাখুঁজির অপরাধে পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে পায়ে গুলি করে পঙ্গু করে দিয়েছে। পাঁচটা বছর ধরে আমার মা, ভাইয়ের বউ, ভাতিজা, ভাতিজি কান্নাকাটি করছে। তারা শুধু আজিজুলকে ফেরত চায়। তার সন্তানরা ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করে না শুধু বলে তাদের বাবাকে এনে দিতে হবে। কিন্তু কোথা থেকে তাদের বাবাকে এনে দিবো। কত জায়গায় খুঁজেছি তার হিসাব নাই। আমি পা হারিয়েছি তাতে সমস্যা নাই। পুলিশ প্রয়োজনে আমার বুকে গুলি করুক। তবুও আমি আমার ভাইকে ফেরত চাই। তিনি বলেন, আমাদের সঙ্গে কারও কোনো শত্রুতা ছিল না। শুধু ইউপি নির্বাচন নিয়ে এলাকার দুই গ্রুপের মধ্যে ঝগড়াঝাটি ছিল।

নিখোঁজ আজিজুলের মা নুরজাহান বেগম বলেন, আমি এত অভাগী কপালপোড়া হবো কখনো ভাবিনি। আমার তরতাজা ছেলেটাকে হারিয়ে আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি। চলাফেরা, কারও সঙ্গে কথা বলতে পারি না। আপানাদের যদি দয়া হয় তবে আমার ছেলেটারে আমার বুকে এনে দেন।

আজিজুলের স্ত্রী রানু আরা বলেন, আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি। সরকারের কাছে আমার একটাই আবেদন আমি আমার স্বামীকে ফেরত চাই। তিনটা সন্তান নিয়ে আমি অনেক কষ্টে দিন কাটাচ্ছি। খাবার দিতে পারি না। লেখাপড়া করাবো কীভাবে। পাঁচটা বছর ধরে আমি ও আমার সন্তানরা তার অপেক্ষায় আছি। এই অবুঝ সন্তানরা শুধু বাবা, বাবা করে। আমি তাদেরকে আর সান্ত্বনা দেয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না।

হাবিবুর রহমানের ভাবী ঝর্ণা বেগম বলেন, ঘটনার দিন শুক্রবার বিকাল তিনটার দিকে আমাদের বাড়ির পাশ থেকে আজহার নামের পুলিশ হাবিব মেম্বারসহ আরও তিনজনকে ধরে নিয়ে গেছে। আমরা ভেবেছিলাম থানায় নিয়ে যাবে। কিন্তু থানায় নেয়া হয়নি। অনেক চেষ্টা করেও জানতে পারিনি। বহু টাকা নষ্ট করেছি। যে যেখানে যেতে বলেছে ওখানে গিয়েছি। অনেক আওয়ামী লীগের লোকজন বাড়িতে এসেছে কিন্তু লাভ হয়নি। ঘটনার পরে হক চেয়ারম্যান লোকজন নিয়ে এসে আমাদের বাড়িঘর ভেঙে দিয়েছে। আশপাশের অনেক ঘর ভাঙচুর ও পুড়িয়ে দিয়েছে। পরে এলাকার মানুষ আমাদেরকে ঘর তৈরি করে দিয়েছে। এখন হাবিবের দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে এখানে থাকি।

হাবিব মেম্বারের বড় ভাই রবি আওয়াল বলেন, সিরাজুল হক চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে এ ঘটনা ঘটেছে। এরপর পাঁচ বছর কেটে যাচ্ছে। ঘটনার পরে বাঁশগাড়ি পুলিশ ক্যাম্পে রান্না করতো এক নারী আমাদেরকে বলেছে যাদেরকে ধরে নিয়েছিল তাদেরকে ক্যাম্পে অনেকক্ষণ রেখেছিল। রাতের বেলা একটা কালো গাড়িতে করে তাদেরকে নেয়া হয়। এরপর থেকে আর কোনো সন্ধান মেলেনি। তাদেরকে তুলে নেয়ার পরপরই কিছু লোক ক্যাম্পের দিকে যাচ্ছিলো। কিন্তু পুলিশ গুলি করে এলাকায় একটা আতঙ্ক তৈরি করেছিল। পরে আর কেউ সাহস করে নাই। পুলিশের ভয়ে অনেকেই এলাকা ছাড়া ছিল। পুলিশের গুলিতে ওইদিন মোস্তফা নামের একজন মারাও গিয়েছিল।

হাবিব মেম্বারের ছেলে মামুন বলেন, আমার বাবাসহ চারজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল। নিরপরাধ লোকদের গ্রেপ্তার করার খবর পেয়ে এলাকার লোক ছুটে আসে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে এলাকাবাসীর সংঘর্ষ হয়। পরের দিন তাদের সন্ধানে আমরা থানায় যাই। সেখান থেকে বলা হয় আমরা আনি নাই। এভাবে আমরা অনেক খোঁজাখুঁজি করেছি। থানায় মামলা করতে গেলেও মামলা নেয়নি।

নরসিংদী-৫ আসনের এমপি রাজিউদ্দিন আহমেদ বলেন, আওয়ামী লীগ করলেই যে সবাই ভালো তা নয়। তাদেরকে আমি অনেকবার শাসন ও বিচার করেছি। তারা কিন্তু সংশোধন হয়নি। এসপি’র সামনে পুলিশকে টেঁটা দিয়ে ঘাই দিছে, অস্ত্র কেড়ে নিছে। পুলিশের সামনে পুলিশকে তুলে নিয়ে যায়। টেঁটা মারে। পরে পুলিশ যা করার তাই করেছে। পরের ঘটনা আমি জানি না। নিলক্ষা ইউনিয়নে দেয়া বক্তব্যর ভিডিও নিয়ে তিনি বলেন, পুলিশ খাইয়া ফেলাইছে এটা আমি বলি নাই। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ওই বক্তব্য আমি বলেছিলাম। আমার কিন্তু করার বাইরে চলে যাবে। তোমরা যদি বাড়াবাড়ি করো। টেঁটা মারামারি যদি বন্ধ না করো তাহলে পুলিশ যেকোনো অ্যাকশন নিতে পারে। ওই অ্যাকশনে সাধারণ জনগণের সাপোর্ট থাকবে। কারণ সাধারণ জনগণ এটা চায় না।

নিখোঁজের বিষয়ে জানতে চাইলে নরসিংদী জেলা পুলিশ সুপার কাজী আশরাফুল আজিম বলেন, বিষয়টি দেখে বলতে হবে।

 

সূত্র: মানবজিমন