গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রথম ধাক্কায় বেড়ে গেছে গণপরিবহণের ভাড়া। পণ্যপরিবহণের ভাড়া বাড়ানোর দাবি করেছেন ট্রাকমালিকরা। লঞ্চ মালিকরা শতভাগ ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন। ভোজ্য তেলের দাম ২০% বাড়ানোর দাবি তুলেছেন ব্যবসায়ীরা।
জ্বালানি তেলের সঙ্গে আমদানি পণ্যেরব্যবসায়ীরা নতুন একটি ইস্যু যোগ করেন দাম বাড়ানোর জন্য। তারা ডলারের দাম বাড়াকে নতুন অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন।
বাস্তবে সবকিছুরই দাম বাড়তে শুরু করেছে। আর কৃষিপণ্যসহ নিত্য পণ্যের উৎপাদন ও পরিবহণ ব্যয় দুইটিই বেড়ে এর সম্মিলিত প্রভাবে সব কিছুরই দাম বাড়বে। দাম বাড়ার এই চাপ বইতে হবে সাধারণ মানুষকে। সাধারণ মানুষের আয় না বেড়ে মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত আয় কমছে।
বাংলাদেশে করোনার কারণে তিন কোটি মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। আর গত জুন মাসে পিপিআরসি এবং ব্র্যাক এক যৌথ গবেষণায় বলা হয়েছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে নতুন করে আরো ২১ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার অভিঘাতে আরো অনেক মানুষ নতুন করে দরিদ্র হবেন। অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, ‘‘দারিদ্র্য বাড়লেও তত নাও বাড়তে পারে। কারণ দেশের মানুষের আয় বাড়া এখনো থেমে যায়নি।”
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার কমপক্ষে ৩০ ভাগ বেড়ে যাবে। কিন্তু এই খরচ বাড়ানোর অর্থ তাদের কাছে নেই। তাই তারা দ্রব্য এবং সেবার ব্যবহার কমিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে চাইবে। অনেকে আরো বেশি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়বেন৷ মূল্যস্ফীতি আরো বাড়বে।
যেভাবে চেইন এফেক্ট:
সেন্টার ফর পলিসি রিচার্স ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর বলেন, জ্বালানি তেলের পর পরিবহণ ভাড়া বাড়ার প্রভাব সব কিছুর উপর কম-বেশি পড়বে। কারণ একটার সঙ্গে আরেকটা সম্পর্কিত৷ এর একটা চেইন এফেক্ট আছে। শিল্প, কৃষি থেকে শুরু করে সবখানেই ধীরে ধীরে এর প্রভাব দেখা যাবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন সব কিছুর দাম বেড়ে যাওয়ার একটি কারণ উৎপাদন ও পরিবহণ খরচ বেড়ে যাওয়া। আরেকটি কারণ হলো ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফার লোভ। বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে শিল্প ও পোশাক কারখানাগুলো জ্বালানি তেলভিত্তিক ক্যাপটিভ পাওয়ার ব্যবহার করায় এমনিতেই তাদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়।
এখন আবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় খরচআরো বেড়ে গেল। তাই কিজিএমই এবং বিকেএমইএ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর বিরোধিতা করেছে। তারা সরকারকে বিকল্প খোঁজার অনুরোধ করেছে। এফবিসিসিআইও মনে করে একবারে ৫০ শতাংশেরও বেশি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো ঠিক হয়নি। তারা জানিয়েছে, এতে শিল্প উৎপাদনের খরচ বেড়ে যাবে।
কৃষিখাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। ইউরিয়া সারের দাম আগে কেজিতে ছয় টাকা বাড়ানো হয়েছে। আবার বিদ্যুতও পাওয়া যাচ্ছে না ঠিকমতো, এখন ডিজেলের দাম বাড়ায় কৃষি উৎপাদনের খরচ অনেক বেড়ে যাবে। কারণ কৃষিতে শতরা ৭০ ভাগ পানি সেচ দেয়া হয় ডিজেল থেকে। কৃষি উৎপাদন এবং ভাড়া বাড়ায় পরিবহণ খরচ অনেক বেড়ে যাবে। এর প্রভাব পড়বে কৃষিপণ্যের বাজারে।
আর বাংলাদেশের বাজারের বৈশিষ্ট্য হলো, একটির দাম বাড়লে আরেকটির দামও বেড়ে যায় কোনো কারণ না থাকলেও।
কাঁচাবাজারে প্রভাব শুরু হয়ে গিয়েছে:
বেসরকারি চাকুরিজীবী নাজমুল হক তপন তার রোববারের কাঁচা বাজারের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘সকালে বাজারে গিয়ে দেখি এক আগের সপ্তাহের তুলনায় সব ধরনের শাক সবজি ও মাছের দাম বেড়ে গেছে৷ মাংসের দামও বেড়েছে।
বিক্রেতারা জ্বালানি তেল ও ডলারের দাম বাড়াকে কারণ হিসেবে দেখাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘‘এমনিতেই করোনায় আমরা ক্ষতিগ্রস্ত। বাজারদরে ঊর্ধ্বগতি আগে থেকেই ছিল। এবার আবার নতুন করে সব কিছুর দাম বাড়তে শুরু করায় কীভাবে হিসাব মিলাবো, বুঝতে পারছিনা।
তার কথায়, ‘‘আমাদের বেতন বাড়েনি তাই আগেই অনেক খাতে খরচ কমিয়ে কোনোভাবে সংসার চালিয়েছি। এবার কোথায় খরচ কমাব, সেটাই বের করতে পারছিনা৷ খরচ কমানো আর জায়গা নাই। দিনে এক বেলা না খেয়ে থেকে খরচ কমানো এখন একমাত্র পথ মনে হচ্ছে।”
একটি সরকারি স্কুলের শিক্ষক সাবিহা ইসলাম বলেন, ‘‘আমি থাকি মিরপুরে। কিন্তু আমার স্কুল পুরান ঢাকায়৷ এখন তো বাস ভাড়া দিতেই টাকা শেষ হয়ে যাবে। সরকার বাড়তি যে বাস ভাড়া নির্ধারণ করে দিয়েছে তার চেয়েও ৩০-৪০ ভাগ বেশি নিচ্ছে। এগুলো দেখার কেউ নেই। তিনিও সকালে কাঁচাবাজারের অভিজ্ঞাতার কথা জানিয়ে বলেন, ‘‘এর আগে তো বাড়তি খরচের চাপ ঋণ করে সামাল দিয়েছি। এবার আর সম্ভব হবেনা। পুরনো ঋণ শোধ করবো, কীভাবে তাই ভেবে পাচ্ছি না। নতুন ঋণ নেব কীভাবে!”
কলাবাগানের নিত্যপণ্যের ব্যবসায়ী মিন্টু মিয়া জানান, ‘‘চাল, ডাল, চিনিসহ সব কিছুর দামই বাড়তে শুরু করেছে। পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিবহণ খরচ বেড়ে গেছে।”
তার কথায়, ‘‘এখনো আগের আনা পণ্য আমরা বিক্রি করছি। নতুন পণ্য আসলে আরো দাম বাড়তে পারে।”
আরেকজন ব্যবসায়ী রহিম মিয়া বলেন, ‘‘ভোজ্য তেল আমদানিকারকরা যে সয়াবিন ও পাম তেলের দাম ২০ ভাড়া বাড়ানোর দাবি করেছেন তাতে বাজার অস্থির হওয়ায় আশঙ্কা আছে। কারণ অনেকেই এখন দাম বাড়বে এই আশায় ভোজ্য তেলের বিক্রি কমিয়ে দেবেন। ফলে বাজারে কৃত্রিম সংকট শুরু হতে পারে।”
পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে ?
কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ সভাপতি এস এম নাজের হোসেন মনে করেন, ‘‘সব কিছুর দামই শতকরা ৩০-৪০ ভাগ বেড়ে যাচ্ছে। মানুষের খরচও এই হারে বাড়বে৷ কিন্তু এই খরচ মেটানোর টাকা সাধারণ মানুষের হাতে নাই। তাই যে ভোগ কমিয়ে খরচ ঠিক রাখার চেষ্টা করবে। কাউকে একবেলা না খেয়ে থাকতেও হতে পারে। আর মানুষ নতুন করে আরো বেশি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়বে। তার কথায়, ‘‘সব মিলিয়ে শতকরা দুইভাগের বেশি মূল্যস্ফীতি হবে।”
তার কথায়, ‘‘বাংলাদেশের মানুষের এটা গা সওয়া হয়ে গেছে৷ এখন বেঁচে থাকাই তার কাছে আসল কথা৷ কীভাবে বেঁচে আছে তা ভাবছে না।” ড. আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, ‘‘এই পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি আরো শতকরা দুই-তিন ভাগ বেড়ে যেতে পারে। তবে মানুষের আয় এখনো বাড়ছে। ফলে যতটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে ততটা নাও পড়তে পারে।
তার কথায়, ‘‘সরকার ধাপে ধাপে ব্যবস্থাগুলো নিতে পারত। এখন একসঙ্গে অনেকগুলো ব্যবস্থা নেয়ায় তার প্রতিক্রিয়া বেশি হচ্ছে। সরকারের কাছে আগে অনেক সিগন্যাল থাকলেও আমলে নেয়নি। এখন বাধ্য হয়ে সবকিছু একসঙ্গে করছে। ঢাকার অবমূল্যায়ন সরকার করতে চায়নি। কিন্তু এছাড়া আর কোনো পথ তার কাছে খোলা ছিল না। জ্বালানি তেলের দাম সরকার অনেক আগেই আন্তর্জাতিক বাজারের উপর ছেড়ে দিতে পারত। আর বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও সরকার সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে এগোয়নি।
তার মতে, ‘‘ দুর্নীতি, আর্থিক অব্যবস্থাপনাসহ আরো অনেক অনিয়মের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
সূত্র: ডয়চে ভেলে