মার্কিন গোয়েন্দাদের আপন শহর ব্যাংকক

মার্কিন গোয়েন্দাদের আপন শহর ব্যাংকক

গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক : মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (সিআইএ) উপপরিচালক ডেভিড এস কোহেন গত বছরের শেষ দিকে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক সফরে যান। সেখানে অনেকটা অঘোষিতভাবেই থাই প্রধানমন্ত্রী প্রায়ুত চান ওচার সঙ্গে বৈঠকে বসেন তিনি। রুদ্ধদ্বার ওই বৈঠকের বিষয়বস্তু নিয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর ধারণা, সিআইএর উপপ্রধান সেখানে মিয়ানমারসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে থাই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও থাইল্যান্ডের দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে তাদের দুজনের মধ্যে।

থাই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সিআইএ উপপ্রধানের এ রুদ্ধদ্বার বৈঠক নিয়ে অনেক জল্পনাকল্পনা হলেও বিষয়টি অবাক করেনি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের। থাইল্যান্ডে সিআইএর সক্রিয় উপস্থিতির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরেই। ২০১৮ সালে তত্কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট সিআইএর পরিচালক হিসেবে জিনা হ্যাসপেলকে নিয়োগ দিলে বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে তুমুল আলোচনা শুরু হয়। ২০০২ সালে ব্যাংককে সিআইএর একটি গোপন আস্তানায় বন্দিদের ওপর নির্মম অত্যাচারের অভিযোগ সে সময় নতুন করে সামনে আসে। ওই সময় ব্যাংককে সিআইএর আস্তানাটি ছিল জিনা হ্যাসপেলের তত্ত্বাবধানে। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সংঘটিত ‘নাইন-ইলেভেনের’ সন্ত্রাসী হামলার পর ওই আস্তানাটিতে অন্তত দুজন হাইপ্রোফাইল বন্দিকে আটকে রেখেছিল সিআইএ।

গোয়েন্দা সংস্থাটির এ ধরনের আস্তানাকে আখ্যা দেয়া হয় ‘ব্ল্যাক সাইট’ হিসেবে। ওপেন সোসাইটি জাস্টিস ইনিশিয়েটিভ নামের একটি মানবাধিকার সংস্থার বরাত দিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস জানিয়েছে, ওই ঘটনার পর থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ব্যাংককে অন্তত ১০ জনকে আটক করে রেখেছে সিআইএ। সেখানে আটকে নির্যাতন চালিয়ে স্বীকারোক্তি আদায়ের পর তাদের কিউবার কুখ্যাত গুয়ান্তানামো বে কারাগারে স্থানান্তর করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, থাইল্যান্ডের পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীও এখন সিআইএর কায়দায় বিদ্রোহী বা রাজনৈতিক বন্দিদের ওপর নির্যাতন চালায়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ব্যাংককভিত্তিক গবেষক সুনাই ফাসুকের মতে, সিআইএর গোপন কারাগারের উত্তরাধিকার এখন থাইল্যান্ডের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। প্রতি সপ্তাহেই রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে আটক বন্দি নির্যাতনের নতুন নতুন ঘটনা আমাদের সামনে উঠে আসছে। সিআইএর যেসব কৌশল সম্পর্কে আমরা শুনেছিলাম, এগুলো তারই পুনরাবৃত্তি।

থাইল্যান্ডে সামরিক জান্তা ক্ষমতায় রয়েছে ২০১৪ সাল থেকে। এখন পর্যন্ত সিআইএর এমন কোনো আস্তানার উপস্থিতির কথা স্বীকার করেনি তারা। এমনকি অতীতে রাজনৈতিকভাবে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসা সরকারগুলোও বিষয়টি চেপে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে বলে ধরে নিয়েছে।

আস্তানাটির উপস্থিতি থাইল্যান্ডের কোথায়, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেনি কেউই। তবে অধিকাংশেরই ধারণা, আস্তানাটি ছিল রাজধানী ব্যাংককেই। কারো কারো মতে, এটি ছিল ব্যাংককের দক্ষিণে অবস্থিত একটি বিমানঘাঁটি। কারো কারো মতে তা ছিল থাই বিমানবাহিনী নিয়ন্ত্রিত ব্যাংককের ডন মুয়েয়াং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি অংশ। আবার এটি থাইল্যান্ডের দুর্গম উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ উদন থানিতে গড়ে তোলা হয়েছিল বলেও অভিমত রয়েছে।

বেঞ্জামিন জাওয়াচকি নামের এক লেখক মার্কিন-থাই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে সম্প্রতি একটি বই লিখেছেন। তার অভিমত হলো থাইল্যান্ডে সিআইএর উপস্থিতি ছিল অনেকটাই পরীক্ষামূলক। এটিই ছিল সে জায়গা, যেখানে সিআইএ প্রথমবারের মতো বাধাহীনভাবে বিদেশী কোনো বন্দির ওপর তাদের নির্যাতন কৌশল প্রয়োগ করতে সক্ষম হয়।

তবে নাইন-ইলেভেনের ঘটনা নয়, ব্যাংকক সিআইএর অবাধ বিচরণস্থল হয়ে উঠেছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়। ওই সময় মার্কিন-থাই সম্পর্ক নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে আলোচনা হয়েছে অনেক কম। এ সম্পর্কের গোপন দিকটি নিয়ে পর্যবেক্ষকরা মাথা ঘামিয়েছেন আরো কম।

ব্যাংককের রেড লাইট জোন ঘেঁষে প্যাটপং রোডে একটি জাদুঘর গড়ে তোলা হয়েছে। জাদুঘরের বড় একটি আকর্ষণ হলো ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় মার্কিন তত্পরতার স্মৃতিবিজড়িত নানা বস্তু। প্রয়াত এক চীনা অভিবাসীর জীবনের কাহিনীকে মূর্ত করে তোলা জিনিসপত্রও রয়েছে সেখানে। চাল ও সিমেন্টের ব্যবসা করে ধনী হয়ে যাওয়া ওই চীনা অভিবাসী পরে একটি কলাবাগানেরও মালিক হন। ‘বিশেষ অবদানের’ জন্য তাকে নামে থাই রাজপরিবারের উপাধি ব্যবহারেরও সুযোগ দেয়া হয়েছে। ওই ব্যক্তির নাম লুয়াং পাতনংপানিচ।

তবে এ ‘বিশেষ অবদানের’ মূল কৃতিত্বের দাবিদার তার ছেলে উদোম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে গিয়ে সেখানে অফিস অব স্ট্র্যাটেজিক সার্ভিসেসের (ওএসএস) বিশেষ প্রশিক্ষণ পান তিনি। এ ওএসএসই পরে নাম বদলে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচয় পায় সিআইএ হিসেবে। কথা ছিল উদোম বিশ্বযুদ্ধকালে থাইল্যান্ডে জাপানি আগ্রাসনবিরোধী বিদ্রোহী সেরি থাইদের দলে যোগ দেবে। কিন্তু এর আগেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ায় সে সুযোগ পাননি তিনি।

দেশে ফিরে বাবার কলাবাগানটির সংস্কার করেন তিনি। পাশে গড়ে তোলেন একটি দ্বিতল অট্টালিকা। সে ভবনটি ভাড়া দেন তার ওএসএস ও সিআইএর বন্ধুদের কাছে। এখানে বসেই ভিয়েতনামে কমিউনিস্টদের মোকাবেলার প্রস্তুতি নিয়েছে সিআইএ।

জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ও কিউরেটর মাইকেল মেসনারও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। নিউজিল্যান্ডভিত্তিক স্কুপ ইনডিপেনডেন্ট নিউজের মার্কিন প্রতিবেদক রিচার্ড এস আরলিখকে সম্প্রতি তিনি বলেছেন, ব্যাংককে সিআইএ কী করছিল? তারা এখানে কমিউনিস্টদের সঙ্গে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সেটা ছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধ।

ভিয়েতনাম যুদ্ধ শেষ হলেও সিআইএর গোয়েন্দারা ব্যাংকক ছেড়ে যেতে চায়নি বলে জানান তিনি। মাইকেল মেসনারের ভাষ্যমতে, ভিয়েতনাম যুদ্ধ যখন শেষ হলো এরা সবাই তখনো এখানে। তারা ফিরে যেতে চায়নি। সুতরাং তারা এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করল। যারা এখানে থেকে গেল তাদের কেউ কেউ ছিল সাবেক সামরিক কর্মকর্তা, সাবেক গোয়েন্দা। তারা এখানে একের পর এক বার খুলল।

এসব বারের একটি এখনো চালু রয়েছে। মাদ্রিদ বার নামে ওই পানশালাটি চালু করেছিলেন সিআইএর প্যারামিলিটারি অফিসার জ্যাক শার্লি। লাওস ও উত্তর ভিয়েতনামে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য মং নৃগোষ্ঠী থেকে আগত ভাড়াটে যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিতেন তিনি।

জ্যাক শার্লি থাইল্যান্ডে মারা যান ২০০৩ সালে। মাইকেল মেসনারের জাদুঘরে জ্যাক শার্লি ও সিআইএর কুখ্যাত প্যারামিলিটারি অফিসার টনি ‘পোয়ে’ পশেপনির ঘনিষ্ঠ একটি ছবি দেখা যায়। অভিযোগ রয়েছে, ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় ভাড়াটে যোদ্ধাদের অর্থ (মার্সেনারি) দিতেন তিনি কমিউনিস্টদের কাটা মাথা ও কাটা কান গুনে। টনি পশেপনির সে কুখ্যাতির স্মরণে মিউজিয়ামে গ্লাস বক্সের মধ্যে প্লাস্টিকের কাটা একটি কানও (প্লাস্টিকের) রাখা হয়েছে।