গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : সকাল সাড়ে ৮টা, ২৫ আগস্ট ১৯৭৫। স্বামী, সন্তান ও একমাত্র বোনকে সঙ্গে নিয়ে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি ফ্লাইটে জার্মানির ফ্রাংকফুর্ট থেকে দিল্লির পালাম বিমানবন্দরে এসে নামলেন শেখ হাসিনা।
এরপর একে একে দুঃখকাতর দিনের প্রায় ৬ বছর কেটে গেছে ভারতের মাটিতে। প্রথমে দিল্লির ডিফেন্স কলোনির একটি বাসায় ঠাঁই হয় পিতামাতা, ভাই ও স্বজনহারা শেখ হাসিনার। সবশেষে ওঠেন পান্ডারা রোডের ফ্ল্যাট নম্বর D II-16 PANDARA ROAD, NEW DELHI, INDIA এই বাড়িতে। ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফেরার ৪৭ বছর পরে এখনও দিল্লির সেই দিনগুলোতে ফিরে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
মঙ্গলবার দিল্লির হায়দরাবাদ হাউজে গণমাধ্যমের সামনে তারই স্মৃতিচারণ করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি হিন্দিতে এ দেশের মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এছাড়া আগে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পান্ডারা রোডের বাড়িটির কথাও তুলে ধরেছেন।
এখন থেকে ৪৭ বছর আগে বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বড় মেয়ে শেখ হাসিনা কেমন ছিলেন এ বাড়িতে? জার্মানিতে বসবাসরত সাংবাদিক সরাফ আহমেদ তার ‘১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ড প্রবাসে বঙ্গবন্ধু কন্যার দুঃসহ দিন’ গ্রন্থে বিষয়টি উল্লেখ করেন। ‘হাসিনা : এ ডটারস টেল’ তথ্যচিত্র থেকে নেওয়া হয়েছে বঙ্গবন্ধুকন্যা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সেই সময়ের স্মৃতিচারণ।
শেখ হাসিনার ভাষায়-‘প্রথম কয়েকটা বছর বসে বসে চিন্তা করেই সময় যাচ্ছিল। আমি আসলে বলতে পারব না। হয়তো একভাবে বসে আছি, বসেই আছি। হয়তো এমনও সময় গেছে আমি ছেলেমেয়েদের খাবারই দিইনি। ভুলেই গেছি ওদের খাবার দিতে হবে বা রান্না করতে হবে। রান্না করে সংসার করা সেটা বলা চলে দিল্লিতে এসেই শেখা।’ এ বাড়িতে নির্বাসিত জীবন শেষে ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফেরেন তিনি।
পান্ডারা রোডের সেই আবাসিক এলাকা এখন দিল্লিতে সুরক্ষিত হিসাবে পরিচিত। বুধবার দুপুরে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, নির্জন এ আবাসিক এলাকায় সেই স্মৃতিমোড়া বাড়িটি, কালের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে। ভবনটির উপর তলায় বাম পাশের উ ওও/১৬ ফ্ল্যাটের পরতে পরতে জমে আছে নানা স্মৃতি। এ বাড়িতেই ছোট বোন ও স্বামী, সন্তানদের নিয়ে থাকতেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা।
এখানে তাদের নাম পরিবর্তন করে থাকতে হয়েছে। সাবধানে থাকার জন্য মেনে চলতে হয়েছে নানা নিয়মকানুন। তাদের পাশের অর্থাৎ ডান দিকের ফ্ল্যাটের নম্বর প্লেট নেই, এটি খসে পড়েছে। তবে ফ্ল্যাটের নম্বরের ক্রমানুযায়ী যে কেউ বুঝবেন এর নম্বর ছিল উ ওও/১৪। নিচের তলায় বাম পাশের ফ্ল্যাট উ ওও/১৫ এর সামনের খোলা চত্বর ইটের দেওয়াল দিয়ে ঘেরা। ওয়ালে লাল রং, ওপরে সবুজ রংয়ের গ্রিল দেওয়া। নিচের ডানের ফ্ল্যাট উ ওও/১৩ এর সামনের চত্বর ইটের দেওয়াল দিয়ে ঘেরা। তবে এই দেওয়ালে সাদা রং।
এ বাড়িটিসহ ভারতে বসবাসের স্মৃতি ভোলেননি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মাঝে মাঝে তিনি সেইসব দিনে ফিরে যান। স্মৃতিচারণ করেন নানা ঘটনার। পান্ডারা রোডের বাড়িটির সামনে ছোট একটি পার্ক ছিল। তিনি জানান, ছোট এই পার্কটিতে মাঝে মাঝে হাঁটতেন। সরেজমিন দেখা যায়, এখনও পার্কটিতে শিশুরা খেলাধুলা করে। এজন্য কয়েকটি রাইডও আছে। বড়রাও হাঁটাহাটি করেন, তাদের শরীরচর্চার জন্য আছে একাধিক যন্ত্রপাতি। এছাড়া বিশ্রাম নেওয়ার জন্য লোহার বেঞ্চও দেখা গেছে।
পান্ডারা রোডের এই বাড়ির কেয়ারটেকার এখন রমেশ কুমার। তিনিও এই বাড়ির কোন ফ্ল্যাটে এখন কে বসবাস করছেন তা জানাতে অস্বীকার করেন। অনেক অনুরোধের পর শুধু উ ওও/১৬ ফ্ল্যাটের কথা জানালেন যে, এটি এখন একটি গভর্নমেন্ট অফিস।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তার কন্যা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন তা রমেশ কুমার জানতেন কিনা প্রশ্ন করা হলে বলেন, না তিনি জানতেন না। একপর্যায়ে মোবাইল ফোনে অপর প্রান্তে থাকা এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে বলেন রমেশ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যক্তি জানান, এখন ফ্ল্যাটটি গভর্নমেন্ট ইউনিয়ন অফিস।
নির্বাসিত জীবন নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন শেখ রেহানা এবং বঙ্গবন্ধুর জামাতা বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী প্রয়াত ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া। ছোট বোন শেখ রেহানাও বিয়ের আগ পর্যন্ত এ ফ্ল্যাটেই থাকতেন। ১৯৭৬ সালের জুলাইয়ে লন্ডনে তার বিয়ে হয়। পরে শেখ হাসিনা ভারতে নির্বাসন জীবনের বাকি সময় এই ফ্ল্যাটে কাটিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব সুভাষ সিংহ রায় তার ‘মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু পরিবার’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন সেই সময়কার কথা।
‘হাসিনা : এ ডটারস টেল’ তথ্যচিত্র থেকে নেওয়া হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানার স্মৃতিচারণের উদ্ধৃতি। শেখ রেহানার ভাষায়-‘দিল্লি থাকাকালীন আমাদের নামও পরিবর্তন করতে হয়েছিল। মিস্টার তালুকদার, মিসেস তালুকদার, মিস তালুকদার। আশপাশের যেন কেউ না জানে। আমি বলি, এটা কী ব্যাপার। দেশ ছাড়া, বাড়ি ছাড়া, বাপ-মা ছাড়া। আবার নামও বদলাব? দরকার নেই, আমি থাকব না এখানে। কিন্তু তখন উপায় নেই তো। সব সময় রাগ-অভিমান আর হুট করে কিছু তো করা যায় না।’
বঙ্গবন্ধুর জামাতা, বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী প্রয়াত ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া তার ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ’ বইয়ে এ সম্পর্কে লিখেছেন, ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে ওই সাক্ষাতের (ইন্দিরা গান্ধী তাদের বাসভবনে ডেকে নিয়ে ১৫ আগস্টের নৃশংস হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে অবহিত করেন এবং শেখ হাসিনাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেন) ৩-৪ দিন পর পান্ডারা রোডের একটি সরকারি দোতলা বাড়ির উপর তলার একটি ফ্ল্যাট আমাদের জন্য নির্ধারণ করা হয়। ফ্ল্যাটগুলোতে দুটো করে শয়নকক্ষ।
এতে তখন কোনো আসবাবপত্র ছিল না।’ এমএ ওয়াজেদ মিয়া বইতে পান্ডারা রোডের এ বাসায় থাকার বর্ণনা দেন এভাবে, ‘বাইরের কারও নিকট আমাদের পরিচয় না দেওয়া, কারও সংগে কোনো রূপ যোগাযোগ না করা এবং নিরাপত্তাপ্রহরী ব্যতিরেকে বাইরে না যাওয়া আমাদের জন্য অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব বলে আমাদের সকলকে স্মরণ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। সময় কাটানো এবং নিজেদের ব্যস্ত রাখার জন্য আমাদের বাসায় সরবরাহ করা হয় একটি ভারতীয় ‘সাদাকালো’ টেলিভিশন।
এছাড়া আমার একটি নিজস্ব ট্রানজিস্টারও ছিল। ওই বাসায় কোনো টেলিফোন সরবরাহ করা হয়নি। সুতরাং বাংলাদেশ সম্পর্কে খবরাখবর রাখার আমাদের একমাত্র উপায় ছিল আমার ওই ব্যক্তিগত ট্রানজিস্টার।’ তার ভাষায় বাড়ির অবস্থান ছিল ‘ইন্ডিয়া গেট’- এর কাছে।
বর্তমানে পান্ডারা মার্কেটের ঠিক পেছনের এ আবাসিক এলাকায় আইএস (ইন্ডিয়ান সার্ভিস) এবং আইপিএস (ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিস) অফিসাররা বসবাস করেন। দিল্লির কূটনৈতিক এলাকা সরদার প্যাটেল মার্গের একটি হোটেলে এখন (বুধবার দুপুরে) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবস্থান করছেন জানালে পুলিশ কর্মকর্তা অজিত মালিক বললেন, ‘এটি খুব দূরে নয়, এখান থেকে কাছেই।’
সূত্র: যুগান্তর