‘চুরি করা গম’ আমদানির অভিযোগে বাংলাদেশের ওপর ইইউ নিষেধাজ্ঞা চায় ইউক্রেন

‘চুরি করা গম’ আমদানির অভিযোগে বাংলাদেশের ওপর ইইউ নিষেধাজ্ঞা চায় ইউক্রেন

রয়টার্স : রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনীয় ভূখণ্ড থেকে গম আমদানির অভিযোগে ইউক্রেন বাংলাদেশের কিছু প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানাতে যাচ্ছে। ইউক্রেনের একজন শীর্ষ কূটনীতিক দক্ষিণ এশিয়ায় রয়টার্সকে জানান, কিয়েভের একাধিক বার্তা সত্ত্বেও ঢাকা ওই আমদানি বন্ধ করেনি।

২০১৪ সাল থেকে রাশিয়া ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিপ্রধান অনেক অঞ্চল দখল করে রেখেছে। ইউক্রেনের অভিযোগ, রাশিয়া এসব অঞ্চল থেকে গম চুরি করে রপ্তানি করছে। তবে রাশিয়া বলছে, এই অঞ্চলগুলো এখন রাশিয়ার অংশ এবং এসব গম চুরি নয়।

রয়টার্সের হাতে আসা নথি অনুযায়ী, ভারতে ইউক্রেন দূতাবাস চলতি বছরে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একাধিক চিঠি পাঠিয়ে রাশিয়ার কাভকাজ বন্দরের মাধ্যমে প্রায় ১.৫ লাখ টন চুরি করা গমের চালান প্রত্যাখ্যান করতে বলেছে।

এই গোপন কূটনৈতিক যোগাযোগ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে, ভারতে নিযুক্ত ইউক্রেনের রাষ্ট্রদূত ওলেক্সান্ডার পলিশচুক বলেন, “ঢাকা কোনও জবাব দেয়নি, তাই এখন আমরা বিষয়টি ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে তুলে ধরব।”

তিনি আরও বলেন, “আমাদের গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ান কোম্পানিগুলো ইউক্রেনীয় দখলকৃত অঞ্চল থেকে সংগৃহীত গম রাশিয়ান গমের সঙ্গে মিশিয়ে পাঠাচ্ছে। এটা অপরাধ।”

পলিশচুক বলেন, “আমরা আমাদের তদন্তের ফলাফল ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে শেয়ার করব এবং তাদের কাছে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানাব।”

বাংলাদেশ ও রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রয়টার্সের মন্তব্য অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

তবে বাংলাদেশের খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ঢাকা দখলকৃত ইউক্রেনীয় ভূখণ্ড থেকে উৎপন্ন গম আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং তারা “কোনো চুরি করা গম আমদানি করছে না।”

ইউক্রেনের নথি ও হুঁশিয়ারি

রয়টার্সের হাতে থাকা চারটি কূটনৈতিক চিঠিতে ইউক্রেনের দূতাবাস বাংলাদেশ সরকারকে বিভিন্ন জাহাজের নাম, রেজিস্ট্রেশন নম্বর, কাভকাজ বন্দরে প্রস্থান ও বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য আগমনের তারিখ জানিয়েছে। এই জাহাজগুলো ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত গম পরিবহন করেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

১১ জুনের চিঠিতে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যদি এই গম গ্রহণ করে তবে তা “গুরুতর নিষেধাজ্ঞা”-র মুখে পড়তে পারে।

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, “এই ধরনের আমদানির ফলে শুধু কোম্পানিই নয়, বরং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারাও নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে পারেন, যদি তারা জেনেশুনে এসব লঙ্ঘন প্রশ্রয় দেন।”

ইইউ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুখপাত্র আনিতা হিপার রয়টার্সকে জানান, অভিযোগে উল্লিখিত জাহাজগুলো বর্তমানে কোনও নিষেধাজ্ঞার আওতায় নেই। তবে যদি তাদের জড়িত থাকার প্রমাণ মেলে, তবে ভবিষ্যতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে।

রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলো — ক্রিমিয়া বাদে — ২০২৪ সালে রাশিয়ার মোট গম উৎপাদনের প্রায় ৩ শতাংশ সরবরাহ করেছে। রাশিয়ান শিপিং সংস্থা রুসাগ্রোট্রান্স জানিয়েছে, মে মাসে বাংলাদেশ রাশিয়ান গম আমদানিতে চতুর্থ বৃহত্তম ক্রেতা।

ইউক্রেনের অভিযোগ, রাশিয়া রপ্তানির সময় গমের উৎস গোপন করতে চুরি করা গমের সঙ্গে নিজেদের গম মিশিয়ে দেয়।

একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাশিয়ান গম ব্যবসায়ী রয়টার্সকে বলেন, “এই গুলো হীরা বা সোনা নয়। গমে থাকা অমিশ্রণ দেখে উৎস শনাক্ত করা সম্ভব নয়।”

ইউক্রেনের অর্থনীতিতে কৃষি খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে এই খাতই ইউক্রেনের অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস হিসেবে কাজ করছে। চলতি বছর এপ্রিলেও ইউক্রেন তাদের জলসীমায় একটি বিদেশি জাহাজ আটক করে, যেটি চুরি করা গম পরিবহনের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ ওঠে।