সিটির পাশাপাশি জেলা-পৌরসভায়ও প্রশাসক নিয়োগের আলোচনা

সিটির পাশাপাশি জেলা-পৌরসভায়ও প্রশাসক নিয়োগের আলোচনা

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক : সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি জেলা পরিষদ ও পৌরসভায় প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে চিন্তা করছে বিএনপি।

দলটির নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম সচল রাখা এবং প্রশাসনিক শূন্যতা এড়াতে প্রশাসক নিয়োগের চিন্তা করছে বিএনপির হাইকমান্ড।

এরই অংশ হিসেবে সম্প্রতি ঢাকাসহ ছয়টি সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শিগগিরই আরও পাঁচটি সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হতে পারে।

এ ছাড়া জেলা পরিষদ এবং সারা দেশের কিছু পৌরসভায় প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার চিন্তা করছে বিএনপির হাইকমান্ড। ঈদের পর জেলা পরিষদ ও পৌরসভায় প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হবে। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এ বিষয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে বলেও জানা গেছে।

বিএনপির কেন্দ্রীয় একাধিক নেতা সংবাদ মাধ্যমকে বলছেন, জনগণের নাগরিক সেবা অব্যাহত রাখতে ও স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় প্রশাসনিক কাজে গতি আনতে প্রশাসক নিয়োগ একটি সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়া জেলা ও পৌরসভাগুলোতে প্রশাসক নিয়োগে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে কার্যকর রাখতে দ্রুত নির্বাচনের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেকজন সদস্য সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই প্রশাসক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দলীয় ফোরামে বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনা করা হবে।’

দেশে জেলা পরিষদ ৬১টি এবং মোট পৌরসভার সংখ্যা ৩৩০। ২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করে জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভাগুলো ভেঙে দেয়। দেড় বছর ধরে সরকারি কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা হচ্ছে। শুধু ইউনিয়ন পরিষদগুলো বহাল থাকলেও আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত অধিকাংশ চেয়ারম্যান পলাতক থাকায় সেখানেও সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সেবা পেতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে নাগরিকদের। সম্প্রতি ছয় সিটিতে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হলেও কোথাও নেই কাউন্সিলর। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার কাঠামোয় প্রশাসনিক গতি আনতে উদ্যোগ নিচ্ছে বিএনপি সরকার। নির্বাচনের পাশাপাশি জেলা ও পৌরসভায় প্রশাসক নিয়োগ দিতে চায় বিএনপি সরকার।

বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, জেলা পরিষদ ও পৌরসভার বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ধাপে ধাপে প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের ভেতরে আলোচনা চলছে। ইতোমধ্যে জেলা ও পৌরসভার প্রশাসক পদের জন্য অনেক নেতা তাদের জীবনবৃত্তান্ত স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও দলের কেন্দ্রীয় অফিসে জমা দিয়েছেন। কেউ কেউ তদবির চালাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ প্রশাসক পদে বসার জন্য জেলা ও কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, সারা দেশের কোথাও স্থানীয় সরকার কাঠামো নেই। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তার কাজের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। এতে স্থানীয় প্রশাসনের কাজেও গতি কমেছে। আবার একই সঙ্গে ভোট দেওয়াও কঠিন। তাই কিছু জায়গায় প্রশাসক নিয়োগ এবং ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেওয়ার পরিকল্পনা করছে বিএনপি সরকার। তবে নির্বাচনের রোডম্যাপ এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়নি। প্রথম ধাপে সিটি করপোরেশন। এরপর ধাপে ধাপে উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করছে সরকার।

জানা গেছে, এবার স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকছে না। এ বিষয়ে জাতীয় সংসদে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোয় নির্বাচন দিতে আইনি জটিলতা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতও চাওয়া হয়েছে।

অনেকে মনে করছে, সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ ও পৌরসভায় প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হলে স্থানীয় সরকার কাঠামোয় গতি আসবে। তবে এই কারণে নির্বাচনও বিলম্ব হতে পারে। এ ছাড়া অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া নিয়ে আইনি জটিলতা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হচ্ছে।

বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও সদ্য সমাপ্ত কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, সারা দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করা হলে নাগরিকদের দৈনন্দিন চাহিদার সমস্যা অনেকটাই কমে যাবে। আর যেসব পৌরসভার মেয়াদ এখনো রয়েছে, নির্বাচনের সময় আসেনি, সেখানে দলীয় প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। নাগরিকদের সমস্যা সমাধানের জন্য প্রশাসক নিয়োগ ও নির্বাচন–দুই দিক থেকেই পদক্ষেপ গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয় হবে। এ ব্যাপারে দল ও সরকারের মধ্যে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘যত দ্রুত সম্ভব স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আয়োজনের প্রত্যাশা করছে বিএনপি। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করে থাকে। এমতাবস্থায় আমরা মনে করি, নির্বাচন কমিশন দ্রুতই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আয়োজন করবে।’

পৌরসভায় প্রশাসকে নিয়োগের ব্যাপারে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে দলীয় সিদ্ধান্ত হলে জানা যাবে।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভেঙে দেওয়া হয় রাজশাহী, বরিশাল, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ ও রংপুর সিটি করপোরেশন। বর্তমানে এই পাঁচ সিটিতেই প্রশাসক নিয়োগ করার কথা ভাবছে বিএনপি। চলতি মাসেই তাদের নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। বর্তমানে এসব বিভাগের কমিশনার প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রসঙ্গত, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ, সিলেট, খুলনা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে বিএনপি সরকার। শুধু আদালতের রায়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে মেয়র পদ ফিরে পেয়েছেন ড. শাহাদাত হোসেন। ভোটে কারচুপির অভিযোগ তুলে ফল বাতিল চেয়ে ২০২১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন শাহাদাত। ৩ বছর ৭ মাস পর, ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর চট্টগ্রামের যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ এবং নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ খাইরুল আমিন ড. শাহাদাতকে মেয়র হিসেবে ঘোষণা করে রায় দেন। তিনি এখনো দায়িত্ব পালন করছেন।

সূত্র: খবরের কাগজ