স্থানীয় নির্বাচন প্রভাবমুক্ত রাখতে এমপিদের ‘পরিদর্শন কক্ষ’ নিষ্ক্রিয় রাখতে চায় ইসি

স্থানীয় নির্বাচনে আইন শৃঙ্খলায় থাকছে না সেনাবাহিনী; একগুচ্ছ সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে বসার পরিকল্পনা করছে ইসি।

স্থানীয় নির্বাচন প্রভাবমুক্ত রাখতে এমপিদের ‘পরিদর্শন কক্ষ’ নিষ্ক্রিয় রাখতে চায় ইসি

গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক

ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন প্রভাবমুক্ত রাখতে সংসদ সদস্যদের উপজেলা পরিষদের ‘পরিদর্শন কক্ষ’ ভোটের সময় নিষ্ক্রিয় রাখার পরিকল্পনা করছে নির্বাচন কমিশন।

সেই লক্ষ্যে ভোটের প্রচারের সময় বিধিনিষেধ আরোপ করা হতে পারে বলে সংবাদ মাধ্যমকে একজন নির্বাচন কমিশনার জানিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, নির্দলীয় এ নির্বাচনকে সহিংসতামুক্ত রাখতেও পদক্ষেপ নেওয়া হবে। পাশপাশি সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক দল ও অংশীজনদের মতামতও নেওয়া হবে।

এ বছরের অক্টোবর নাগাদ স্থানীয় সরকারের ভোট শুরুর পরিকল্পনা করছে নির্বাচন আয়োজনকারী সাংবিধানিক সংস্থাটি। সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেই ভোট শুরু হবে। তার আগে সংস্কার কাজ গুছিয়ে কোন নির্বাচন কবে হবে তা নিয়ে ঠিক করতে বসবে ইসি।

অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে গত ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পর এবার দলীয় সরকারের অধীনে নির্দলীয় স্থানীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে।

৪,৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৬১টি জেলা পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৩৩০টি পৌরসভা, ১৩টি সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন পদে ভোটের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন।

বিধিনিষেধ থাকবে এমপিদের কক্ষে

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে উপজেলা পরিষদ ভবনে সংসদ সদস্যদের জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত বিশেষ ‘পরিদর্শন কক্ষ’ প্রস্তুতের নির্দেশনা দেয়।

২১ এপ্রিল সংসদেও সংসদ সদস্যদের জন্য উপজেলায় এমন কক্ষ বরাদ্দ রাখার আদেশের কথা বলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।

স্থানীয় সরকার বিভাগের উপজেলা-২ শাখা থেকে এ বিষয়ক আদেশে ‘পরিদর্শন কক্ষ’ নামে পৃথক একটি কক্ষ স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়। যেসব উপজেলা পরিষদের ভবন রয়েছে, সেগুলোর দ্বিতীয় তলায় এ কক্ষ প্রস্তত করতে বলা হয় সেখানে।

আর নতুন উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও দ্বিতীয় তলায় এমন একটি কক্ষ রাখার জন্য ডিপিপির নকশা ও পরিকল্পনায় সংস্থান রাখতে বলা হয় ওই আদেশে।

জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “উপজেলা পরিষদ ভবনে এমপিদের কক্ষ রাখা নিয়ে একটা বিষয় এসেছে। ভোটের প্রচারের আচরণবিধিতে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিষয়ে বিধিনিষেধ রয়েছে। এমপিদের এ ধরনের কক্ষের বিষয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করার কথা ভাবছি আমরা।”

সেক্ষেত্রে ভোটের সময় এমপিদের কক্ষ কোনো ধরনের প্রচার কাজে যেন ব্যবহার না হয় এবং ভোটের সময় এমপিদের সেখানে যাওয়া থেকে বিরত রাখার বিষয় যুক্ত হতে পারে বিধিতে।

পোস্টারহীন স্থানীয় সরকারের সব নির্বাচনের মধ্যে সিটি করপোরেশনে জামানত বাড়ানো, অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমার বিধান বাদ দেওয়া, উপজেলায় জামানত কমানো এবং সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে কিছু সংস্কারের সুপারিশ রয়েছে বলে জানান আব্দুর রহমানেল মাছউদ।

এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, “সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করা কিংবা মতামত নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। এ সংক্রান্ত একটি কমিটি কাজ করছে। কোরবানির ঈদের পর প্রস্তাবিত সংশোধন গুছিয়ে ওয়েবসাইটেও তুলে ধরা হতে পারে; কিংবা অংশীজন প্রতিনিধিদের নিয়ে একসঙ্গে আলোচনা করার চিন্তাভাবনা রয়েছে।”

সেপ্টেম্বরের মধ্যে বিধি চূড়ান্ত করে অক্টোবর থেকে ভোটের প্রক্রিয়া শুরু করতে চায় ইসি। এরপর ১০-১২ মাস ধরে স্থানীয় সরকারের পাঁচ স্তরের ভোট করা হবে।

এবারের সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ছিল না। আইন সংশোধন হওয়ায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও এ যন্ত্র আর ব্যবহার হচ্ছে না।

নতুন করে আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালটে ভোটিং ব্যবস্থা চালু হয়েছে সংসদ নির্বাচন থেকে। তবে স্থানীয় নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালট রাখা হচ্ছে না।

‘মাঠে সেনাবাহিনী লাগবে না’

রাজনৈতিক দলের সহায়তা ছাড়া সংঘাতহীন নির্বাচন করা সম্ভব নয় বলেই মনে করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন।

স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে সহিংসতা নিয়ে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেছেন, ২০১৬ সালে স্থানীয় সরকারের ভোটে ২৩৬ জন নিহত হয়েছেন, ২০২১ সালে ইউপি ভোটে ১১৩ জন মারা যান।

সিইসি বলেছেন, “নির্বাচনের ইতিহাস দেখেছি—লোকাল গভার্নমেন্ট ইলেকশন সংঘাতপূর্ণ হয়। এখন আমাদের সামনে বিরাট চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। সবার সহযোগিতা চাই, জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করুন। ভোটকে সামনে রেখে সচেতনতামূলক প্রচারণা করা হবে। অংশীজনের সঙ্গে কথা বলব।”

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্রবাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাতে সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনীসহ সশস্ত্রবাহিনী সদস্যদের মাঠে রাখার পথ প্রশস্ত হয়।

তবে অতীতের মত এবারও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেনাবাহিনী রাখা হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ।

তিনি বলেন, “স্থানীয় নির্বাচনগুলোয় সংঘাত ও নানা ধরনের সমস্যা হয়। হতাহতের সংখ্যাও বাড়ে। আমরা সংঘাতহীন একটা স্থানীয় নির্বাচন করতে চাই। এ লক্ষ্যে পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব, আনসারসহ আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর নিয়মিত সদস্যদের মাঠে রাখা হবে। সবার সহযোগিতার পাশাপাশি ভোটের সময় পরিস্থিতি অনুযায়ী কিছু পদক্ষেপও নেওয়া হবে।”

এ নির্বাচন কমিশনার জানান, ধাপে ধাপে স্থানীয় নির্বাচন হওয়ায় নিয়মিত বাহিনীর সদস্যদের দিয়েই আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে বলে তারা মনে করছেন।

“স্থানীয় সরকারের ভোটে সেনাবাহিনী ব্যবহার করা হয় না। স্থানীয় নির্বাচনের আইনের সংজ্ঞাতেও তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে না। আশা করি, সংঘাতময় পরিস্থিতি হবে না। কখনও কোনো কারণে সেনাবাহিনীকে দরকার হলে তখন পরিস্থিতি অনুযায়ী ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এ মোতায়েন করা হবে।”

নির্বাচন আয়োজন ব্যয়ে কৃচ্ছতার প্রসঙ্গ টেনে এ নির্বাচন কমিশনার জানান, সংসদ নির্বাচনে তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয় বরাদ্দ হলেও ব্যয় হয়েছে তার চেয়ে কম।

“সব মিলিয়ে প্রায় সোয়া দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। স্থানীয় নির্বাচনেও ধাপে ধাপে করায় ব্যয়ের ক্ষেত্রে সচেতন রয়েছি আমরা।”

সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতার আলোকে স্থানীয় নির্বাচনে কিছু সংস্কার পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগকে ‘ইতিবাচক’ বলছেন নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম।

তিনি সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “সংসদ নির্বাচন একদিনে সারাদেশে করতে গিয়ে বিশাল আইন শৃঙ্খলাবাহিনী দরকার হয়। কিন্তু স্থানীয় নির্বাচন হয় ধাপে ধাপে; সেক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সংখ্যক সদস্য হাতে থাকে, সেনাবাহিনীর দরকার পড়ে না। কখনও দরকার হলে, পরিস্থিতি খারাপ মনে হলে ইসি সংক্রান্ত বিধান সংস্কার করে ব্যবস্থা নিতে পারে।”

অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে বর্তমান কমিশন স্থানীয় সরকারের নির্বাচনকে ‘রক্তপাতহীন’ করার উদ্যোগ নেবে বলে আশা রাখেন এ বিশ্লেষক।

পোস্টাল ব্যালটে ভোটিং পদ্ধতি স্থানীয় নির্বাচনে ‘পাইলটিং’ আকারে হলেও চালু রাখার পক্ষে মত দেন তিনি।

আব্দুল আলীম বলেন, “বর্তমান কমিশন বেশ কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিল, বাস্তবায়নও শুরু হয়। সংসদ নির্বাচনই মূল লক্ষ্য ছিল তখন। আসলে রিফর্ম শুরু হয় ভোটের পরে। সংসদের অভিজ্ঞতা নিয়ে, রিভিউ করে স্থানীয় নির্বাচনেও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যায়। পাশাপাশি আগামী নির্বাচন কমিশনের জন্যও ইন্সটিটিউশনাল মেমোরি রাখতে একগুচ্ছ সুপারিশ করতে পারে বর্তমান কমিশন।”

সূত্র: বিডিনিউজ