শিগগিরই ঢাকা সিটি, ডিএমপি ও ঢাকা জেলার অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে পূর্বাচল নতুন শহর

বর্তমানে তিন জেলায় বিভক্ত হওয়ায় এখানকার প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি হয়েছে।

শিগগিরই ঢাকা সিটি, ডিএমপি ও ঢাকা জেলার অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে পূর্বাচল নতুন শহর

শিগগিরই ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) অধীনে আসছে পূর্বাচল নতুন শহর। শুধু সিটি করপোরেশন নয়, পুরো প্রকল্প এলাকাকে ঢাকা জেলার অন্তর্ভুক্ত করা এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) আওতায় নেওয়া হচ্ছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) গত বছর এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় তা পাসও হয়েছে। এখন অপেক্ষা শুধু মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদনের। এশিয়া পোস্ট এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।

রাজউক চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘পূর্বাচল প্রকল্প এলাকাকে একই প্রশাসনিক ছাতার নিচে নিয়ে আসতে সরকারপ্রধানের আগ্রহ আছে। এর মধ্যে রাজউক থেকে সব কাজ শেষ করে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা আকারে পাঠানো হয়েছে। আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় প্রস্তাবনাটি পাস হয়েছে। এখন মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে অনুমোদন হলে প্রজ্ঞাপন জারি হবে।’

প্রশাসনিক বিচ্ছিন্নতা কাটানোর উদ্যোগ

দেশের বৃহত্তম পরিকল্পিত নগর প্রকল্প পূর্বাচল নতুন শহরের মোট আয়তন ৬ হাজার ২৬১ দশমিক ০৪ একর। এর মধ্যে গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার দুটি মৌজায় ১ হাজার ৫৮৯ দশমিক ৮৯ একর এবং নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থানার ১৪টি মৌজায় ৪ হাজার ৪৩১ দশমিক ৪৫ একর জমি রয়েছে।

শহরটির অবস্থান শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীর মধ্যবর্তী এলাকায়। উত্তরে গাজীপুর ও দক্ষিণে নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে সংযোগ থাকলেও এর মূল নগর সংযোগ ঢাকা মহানগরের সঙ্গে। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দূরত্ব সাড়ে ছয় কিলোমিটার। ইতোমধ্যে কুড়িল থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত আট লেনের এক্সপ্রেসওয়ে চালু হয়েছে। শহরের ভেতরে রয়েছে ৪৮ কিলোমিটার লেক এবং ৩৬৫ কিলোমিটার সড়ক।

বর্তমানে তিন জেলায় বিভক্ত হওয়ায় এখানকার প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। নামজারি, ট্রেড লাইসেন্স, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, বিচারিক সেবা সর্বত্র এর প্রভাব পড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রেও সমন্বয়হীনতা ছাপ প্রকট। প্রশাসনিক বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে তাই সব সেবা এক ছাতার নিচে নিয়ে আসতে চায় রাজউক।

এক জেলা, একক কর্তৃত্ব

জটিলতা কাটাতেই রাজউকের প্রস্তাব, পুরো পূর্বাচল প্রকল্প এলাকাকে এককভাবে ঢাকা জেলার অন্তর্ভুক্ত করা। এটি বাস্তবায়িত হলে প্রশাসনিক ও বিচারিক সেবায় একটি একীভূত ব্যবস্থা তৈরি হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন এবং সরকারি সেবাপ্রদান সবকিছুতে গতি আসবে। উন্নত সড়ক যোগাযোগের কারণে পূর্বাচলকে ঢাকার অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা বাস্তবসম্মত মনে করছে রাজউক।

শুধু জেলা প্রশাসনই নয়, পূর্বাচলকে মহানগর কাঠামোর মধ্যে আনার পরিকল্পনাও রয়েছে এই প্রস্তাবে। ডিএমপির আওতায় আনা হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে এবং নগর নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী হবে বলে প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে এলাকাটিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অধীনে আনার সুপারিশ করা হয়েছে। এতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ড্রেনেজ, সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ, স্ট্রিট লাইট, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও জনস্বাস্থ্য সেবার মতো নগর সুবিধাগুলো পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। প্রস্তাবনায় নির্বাচনি এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে।

পাঁচ মৌজায় ৩০ সেক্টর

প্রস্তাবে মৌজা পুনর্গঠনের কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে ১৬টি মৌজায় বিভক্ত প্রকল্প এলাকাকে পাঁচটি বৃহৎ মৌজায় রূপান্তরের পরিকল্পনা করা হয়েছে। পূর্বাচল-১ থেকে পূর্বাচল-৫ পর্যন্ত পাঁচটি মৌজার অধীনে ৩০টি সেক্টরকে পুনর্বিন্যস্ত করা হবে।

নতুন বিন্যাস অনুযায়ী, পূর্বাচল-১ মৌজায় থাকবে সেক্টর ২৫, ২৬ ও ২৭। পূর্বাচল-২ মৌজায় সেক্টর ২২, ২৩, ২৪, ২৮, ২৯ ও ৩০। পূর্বাচল-৩ মৌজায় সেক্টর ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ২০ ও ২১। পূর্বাচল-৪ মৌজায় সেক্টর ২, ৯, ১০, ১৮ ও ১৯ এবং পূর্বাচল-৫ মৌজায় থাকবে সেক্টর ১, ১১, ১২, ১৩, ১৪, ১৫, ১৬ ও ১৭। প্রস্তাবিত মৌজা মানচিত্রে কোনো সেক্টরকে বিভাজন করা হয়নি। সব মৌজাই ঢাকা জেলার অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই পুনর্গঠনে ভূমি ব্যবস্থাপনা সহজ হবে এবং সেবা প্রদানে সমন্বয় বাড়বে।

প্রকল্পের বর্তমান চিত্র

১৯৯৫ সালের জুলাই মাসে শুরু হওয়া পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছিল ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত। রাজউকের নিজস্ব অর্থায়নে গৃহীত এই প্রকল্পের প্রথম পর্যায় ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। অধিকাংশ প্লটও হস্তান্তর করা হয়েছে। অনেক বরাদ্দগ্রহীতা ভবন নির্মাণ শুরু করে দিয়েছেন। এখন অবকাঠামো নির্মাণের জন্য দ্বিতীয় একটি প্রকল্প সরকারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পের লে-আউট নকশায় ৩৮ দশমিক ৬০ শতাংশ জমি রাখা হয়েছে আবাসিক প্লটের জন্য। সড়ক ও ফুটপাতের জন্য ২৬ দশমিক ১৫ শতাংশ, প্রশাসনিক ও ইউটিলিটি কাজে ১৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ, ক্রীড়া-পার্ক-বনায়নে ১১ দশমিক ২০ শতাংশ এবং লেক ও খালের জন্য ৭ দশমিক ৬০ শতাংশ জমি রাখা হয়েছে।

প্রায় ৩০ হাজার প্লট

পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে মোট আবাসিক প্লট ২৬ হাজার ২১৩টি। এর মধ্যে তিন কাঠার ১১ হাজার ২০৯টি, পাঁচ কাঠার ১০ হাজার ৩৬১টি, সাড়ে সাত কাঠার ২ হাজার ৬১৮টি এবং ১০ কাঠার ২ হাজার ২৫টি। মোট আবাসিক প্লটের মধ্যে ৭ হাজার ৮৬৪টি বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রকল্পের মূল অধিবাসী ও ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য।

আবাসিক প্লটের বাইরে আরও ৩ হাজার ৫৬৩টি প্লট রয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি অ্যাপার্টমেন্ট ব্লক, ৪৭২টি প্রশাসনিক, এক হাজার ৩৩টি বাণিজ্যিক এবং দুই হাজার ৪৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নগর সুবিধার জন্য।

প্রকল্প এলাকায় সড়ক, সেতু, ড্রেনেজ ও অন্যান্য অবকাঠামোর কাজ প্রায় শেষ। শুরু হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে তোলার কাজ।

 

আরো জানতে…

উত্তরা ও পূর্বাচলে ইসকনকে দুই লাখ টাকায় ১২০ কোটির জমি দিয়েছে রাজউক

সূত্র:এশিয়া পোস্ট