রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে একটি চুক্তি এ সপ্তাহান্তেই স্বাক্ষরিত হতে পারে।
বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “যুদ্ধের একটি বড় সমাধান হয়ে গেছে আমাদের।”
চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গেই হরমুজ প্রণালি আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি চুক্তিতে সায় দিয়েছেন কি না—এই প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, “আমার যতদূর জানা, উত্তর হলো হ্যাঁ।”
মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে ট্রাম্প বারবার দাবি করে আসছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের চুক্তি একেবারে কাছাকাছি চলে এসেছে। তবে এপ্রিলে ঘোষিত যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও এ সপ্তাহে দুই পক্ষ একে অপরের ওপর হামলা চালিয়েছে।
ইরানের সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে জানা গেছে, দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুঠোফোনে দেওয়া বিবৃতিতে মুখপাত্র এসমাইল বাঘাই বলেছেন, চুক্তির বড় একটি অংশ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে ঐকমত্য হয়েছে। তবে নিজেদের নির্ধারিত সীমার ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেবে না তেহরান।
তিনি বলেন, “এই বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাইনি আমরা। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থাগুলো পর্যালোচনা করছে।”
শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা সামনে আসায় শুক্রবার এশিয়ার শেয়ারবাজারে বড় ধরনের উত্থান দেখা গেছে। একই সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম নেমে এসেছে গত দুই মাসের মধ্যে সর্বনিম্নে।
তবে হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা এখনও কমেনি। মার্কিন এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তেহরান বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার চেষ্টা চালানোর পর যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ইরানের দুটি আত্মঘাতী ড্রোন ভূপাতিত করেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, দেশটির সেনাবাহিনী একটি তেলবাহী জাহাজকে প্রণালি অতিক্রম করতে বাধা দিয়েছে এবং শুক্রবার ভোরে কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
ইরানে পরিকল্পিত সামরিক হামলা বাতিল করার পরই ট্রাম্প এই ঘোষণা দেন। আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে বলেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, সমঝোতা স্মারকটি “অত্যন্ত শক্তিশালী, যদিও কিছুটা ধারণাগত পর্যায়ে রয়ে গেছে।”
ট্রাম্প আগে থেকেই বলে আসছেন, যেকোনো শান্তি চুক্তিতে নিশ্চিত করতে হবে, ইরান যেন কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে। তবে ইরান বরাবরই এমন অস্ত্র তৈরির চেষ্টার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
অন্যদিকে ইরানের দাবির মধ্যে রয়েছে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ করা শত কোটি ডলারের সম্পদ ছেড়ে দেওয়া এবং হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতি।
এক নির্বাচনী প্রচার অনুষ্ঠানে মুঠোফোনে যুক্ত হয়ে ট্রাম্প বলেন, “মূল বিষয়টি হলো, ইরানে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না। এর মানে, তারা তা তৈরিও করতে পারবে না, কিনতেও পারবে না।”
এর আগে বৃহস্পতিবার ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে “আজ রাতেই খুব কঠোরভাবে” হামলা চালাবে এবং দেশটির তেল রপ্তানির অন্যতম কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ একসময় দখলে নেওয়ার ইচ্ছাও তাঁর রয়েছে।
এই যুদ্ধ হোয়াইট হাউসের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে। জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যে ভোটারদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ায় জনমত জরিপে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার হার কমছে বলে দেখা গেছে। কয়েকজন রিপাবলিকান প্রকাশ্যেই উদ্বেগ জানিয়েছেন, এই যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষের কারণে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে তাঁদের।
পাশাপাশি রিপাবলিকান দলের অভ্যন্তরে থাকা ইরানের প্রতি কঠোর মনোভাবাপন্ন একটি অংশকে সন্তুষ্ট রাখার বিষয়টিও ট্রাম্পের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের অংশ। আগে একবার এ ধরনের একটি প্রচেষ্টা ভেস্তে দিয়েছিলেন তাঁরা, এবং তাঁদের দাবি, যেকোনো চুক্তিতে তেহরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথ যেন পুরোপুরি বন্ধ হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের অন্য শক্তিগুলোর প্রতিক্রিয়াও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন, এই সমঝোতায় ইসরায়েল, সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ একাধিক দেশের সমর্থন রয়েছে।
তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দপ্তর থেকে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলার পর তাঁরা স্পষ্ট করেছেন—ইরানের সঙ্গে এই সমঝোতা স্মারকে ইসরায়েল কোনো পক্ষ নয়।
নেতানিয়াহু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন এমন একটি চুক্তির প্রতি ট্রাম্পের অঙ্গীকারের জন্য, যাতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ, সমৃদ্ধকরণ অবকাঠামো ভেঙে ফেলা, মিসাইল উৎপাদন সীমিত করা এবং আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে দেওয়া সহায়তা বন্ধ করা।
অন্যদিকে তেহরান দাবি জানিয়ে আসছে, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ করতে হবে, যেখানে ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে সমান্তরাল আরেকটি যুদ্ধ চলছে।