বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হতে যাচ্ছেন ইলন মাস্ক

প্রতিদিন ১০ লাখ ডলার খরচ করলেও ১ ট্রিলিয়ন ডলার শেষ করতে মাস্কের সময় লাগবে ২ হাজার ৭৪০ বছর।

বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হতে যাচ্ছেন ইলন মাস্ক

আল জাজিরা

স্পেসএক্সের রেকর্ড গড়া আইপিও মাস্ককে এনে দিচ্ছে অভূতপূর্ব সম্পদ, বৈশ্বিক অসমতা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই শুক্রবার ওয়াল স্ট্রিটে স্পেসএক্সের শেয়ার লেনদেন শুরু হলে বিতর্কিত প্রযুক্তি ব্যবসায়ী ইলন মাস্ক বিশ্বের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ট্রিলিয়নিয়ারের তালিকায় নাম লেখাতে যাচ্ছেন—এমনটাই প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেছে।

ব্লুমবার্গ বিলিয়নিয়ার ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার স্পেসএক্স তাদের রেকর্ড গড়া প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) ঘোষণা দেওয়ার আগেই মাস্কের সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬৯৬ বিলিয়ন ডলার, যা তাঁকে বিশ্বের শীর্ষ ধনী ব্যক্তির আসনে রেখেছে।

তবে রকেট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—দুই খাতেই কাজ করা এই প্রতিষ্ঠানে তাঁর ৪২ শতাংশ মালিকানা তাঁকে নিয়ে যাচ্ছে একেবারে নতুন এক উচ্চতায়।

নাসডাকে তালিকাভুক্তির সময় স্পেসএক্সের বাজারমূল্য ধরা হয়েছে ১ দশমিক ৭৭ ট্রিলিয়ন ডলার। প্রতিটি ৫৫ কোটি ৫৬ লাখ শেয়ার বিক্রি হবে ১৩৫ ডলার দরে।

এই হিসাবে মাস্কের অংশীদারির মূল্য দাঁড়াতে পারে ৭৪৩ বিলিয়ন থেকে ৮৬৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে।

সবকিছু ঠিকঠাক চললে শুক্রবার বাজার বন্ধ হওয়ার আগেই আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রিলিয়নিয়ারের তালিকায় উঠে যাবেন টেসলার প্রধান নির্বাহীও থাকা মাস্ক।

১ ট্রিলিয়ন ডলার এমন এক সংখ্যা, যা মানুষের ধারণা ক্ষমতার বাইরে। যুক্তরাজ্যের দাতব্য সংস্থা অক্সফামের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন ১০ লাখ ডলার খরচ করলেও ১ ট্রিলিয়ন ডলার শেষ করতে মাস্কের সময় লাগবে ২ হাজার ৭৪০ বছর।

ব্লুমবার্গ বিলিয়নিয়ার ইনডেক্স বলছে, বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ ধনী, গুগলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেইজের সম্পদ ৩০৪ বিলিয়ন ডলার—অর্থাৎ মাস্কের সম্পদ তাঁর চেয়ে তিন গুণেরও বেশি হতে যাচ্ছে।

ইতিহাসের সবচেয়ে ধনীদের তালিকাতেও জায়গা করে নিতে যাচ্ছেন মাস্ক। যুগে যুগে সম্পদের তুলনা করা কঠিন—কেনার ক্ষমতা ও জীবনযাত্রার মানে পার্থক্যের কারণে। তবে অর্থনীতির আকারের হিসেবে ১৯ শতকের শিল্পপতিদের চেয়েও এগিয়ে যেতে পারেন মাস্ক।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম স্ব-নির্মিত মিলিয়নিয়ার বলে বিবেচিত জন জেকব অ্যাস্টরের সম্পদ ছিল ২ থেকে ৩ কোটি ডলারের মধ্যে। মেজারিং ওর্থ ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী ১৮৪৮ সালে মৃত্যুকালে এই অঙ্ক ছিল যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির প্রায় ১ শতাংশ।

কয়েক দশক পর ইস্পাত ব্যবসায়ী অ্যান্ড্রু কার্নেগির সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩৮ কোটি ডলার, যা ১৯১৯ সালে তাঁর মৃত্যুর সময় যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির প্রায় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের সমান।

তেল ব্যবসায়ী জন ডি রকফেলারের মৃত্যুর সময় ১৯৩৭ সালে সম্পদের পরিমাণ ছিল ১৪০ কোটি ডলার, যা তখনকার যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির দেড় শতাংশের সমান বলে জানাচ্ছে মেজারিং ওর্থ ফাউন্ডেশন।

ট্রিলিয়নিয়ার হলে মাস্কের সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির প্রায় ৩ শতাংশের সমান হয়ে যাবে।

ইতালির বোকোনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক ইতিহাসের শিক্ষক গিদো আলফানি বলছেন, সম্পদের তুলনার আরেকটি উপায় হলো—সেই অর্থ দিয়ে কত মানুষের শ্রম কেনা সম্ভব, তা হিসাব করা।

আল জাজিরাকে আলফানি বলেন, রাজা-বাদশাহ বা রাষ্ট্রের সম্পদের সঙ্গে যাদের ব্যক্তিগত সম্পদ মেলানো কঠিন, এমন ব্যক্তিদের বাদ দিলে ইলন মাস্কই হতে পারেন ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি।

তাঁর হিসাবে, ২০২৫ সালে মাস্ক প্রায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার ৮০০ মানুষের শ্রম কেনার মতো সামর্থ্য রাখতেন, যেখানে ১৯৩৭ সালে রকফেলারের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১৬ হাজার এবং ১৯০১ সালে কার্নেগির ক্ষেত্রে ৪৮ হাজার।

বর্তমানে মাস্ক যেমন বিতর্কিত এক চরিত্র, তেমনি ১৮০০ সালের মাঝামাঝি থেকে শেষভাগে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া শিল্পপতিরাও তাঁদের সময়ে কম বিতর্কিত ছিলেন না।

নিউইয়র্ক শহরের সবচেয়ে বড় এবং নীতিহীন ভূসম্পত্তি মালিকদের একজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন অ্যাস্টর।

‘গিল্ডেড এজ’ নামে পরিচিত সময়ে কার্নেগি, রকফেলারসহ তাঁদের সমসাময়িক ব্যবসায়ীদের নিষ্ঠুর ও প্রতিযোগিতাবিরোধী ব্যবসায়িক কৌশলের কারণে ‘ডাকাত ব্যারন’ আখ্যা দেওয়া হতো।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক রিচার্ড রাইট বলছেন, মাস্কের মতোই গিল্ডেড এজের শিল্পপতিরাও আগে কখনও দেখা যায়নি এমন বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছিলেন।

আল জাজিরাকে রাইট বলেন, তাঁরা অর্থ কামানো ও সেই অর্থ ধরে রাখায় খুবই দক্ষ ছিলেন, কিন্তু এর বাইরে তাঁদের বড় কোনো অর্জনের প্রমাণ নেই। কেউ কেউ তাঁদের সম্পদের জন্য প্রশংসা করতেন, তবে অধিকাংশ মানুষই তাঁদের ঘৃণা করতেন।

রাইট আরও বলেন, রকফেলারের মতো ধনকুবেরদের মধ্যে একটি সাধারণ ধারণা ছিল—তাঁদের সম্পদ নির্ভর করে সরকারি নীতি প্রভাবিত করার সামর্থ্যের ওপর। তিনি বলেন, তাঁরা সবাই রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতেন, এবং গিল্ডেড এজে এই হস্তক্ষেপের সঙ্গে দুর্নীতির মাত্রাও ছিল অনেক বেশি।

মাস্কও রাজনীতিতে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছেন। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রচারণার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে সরকারি ব্যয়ে অপচয় ও জালিয়াতি ঠেকানোর বিতর্কিত একটি উদ্যোগের নেতৃত্বও দিয়েছেন।

২০২২ সালে ৪০ বিলিয়ন ডলারে টুইটার অধিগ্রহণের পর থেকে মাস্ক এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমটিকে—যার নাম পরে এক্স রাখা হয়—ব্যক্তিগত প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। অভিবাসন ও রূপান্তরকামী ব্যক্তিদের অধিকারের মতো বিতর্কিত বিষয়ে তিনি প্রকাশ্যে ডানপন্থী মতাদর্শ প্রচার করে আসছেন।

বিপুল সম্পদের মালিক হলেও মাস্ক তাঁর পূর্বসূরিদের থেকে কিছু ক্ষেত্রে ভিন্ন।

গিল্ডেড এজের শিল্পপতিরা বিপুল সম্পদের পাশাপাশি ব্যাপক দাতব্য কর্মকাণ্ডেও যুক্ত ছিলেন। তাঁরা হাসপাতাল, গ্রন্থাগার, বিশ্ববিদ্যালয় ও জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং হুকওয়ার্ম ও ইয়েলো ফিভারের মতো রোগ নির্মূলে বড় অঙ্কের অর্থ দান করেছেন।

ওহাইও স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের শিক্ষক ক্রিস্টোফার নিকোলস আল জাজিরাকে বলেন, গিল্ডেড এজ ও প্রগ্রেসিভ এরার ‘ডাকাত ব্যারন’দের অনেক ব্যর্থতা থাকলেও তাঁরাই আধুনিক বৃহৎ পরিসরের জনহিতকর কর্মকাণ্ডের পথিকৃৎ ছিলেন।

কার্নেগি তাঁর জীবনের শেষ দুই দশকে সম্পদের ৯০ শতাংশ দান করেছিলেন, যার মূল্য বর্তমান হিসাবে অন্তত ৪২ বিলিয়ন ডলার বলে জানাচ্ছে মেজারিং ওর্থ ফাউন্ডেশন। নিকোলস বলেন, কার্নেগির ১৮৮৯ সালের প্রবন্ধ ‘গসপেল অব ওয়েলথ’-এ তিনি বলেছিলেন, ধনীদের জীবদ্দশায়ই তাঁদের সম্পদ জনকল্যাণে পুরোপুরি ব্যবহার করা উচিত, উত্তরাধিকারীদের জন্য রেখে যাওয়ার বদলে।

২০১০ সালে মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস এবং বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফেট মিলে চালু করেন ‘গিভিং প্লেজ’—বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের জীবদ্দশায় বা উইলের মাধ্যমে সম্পদের সিংহভাগ দাতব্য কাজে দেওয়ার আহ্বান জানানো একটি উদ্যোগ।

মাস্ক ২০১২ সালে এই প্রতিশ্রুতিতে যুক্ত হন। তবে অলাভজনক সংস্থাগুলোর ব্যয় পর্যবেক্ষণকারী মার্কিন সংস্থা ক্যাপিটাল রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, মাস্ক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তাঁর জনহিতকর কর্মকাণ্ডের বড় অংশই গেছে তাঁর ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে সংযুক্ত খাতগুলোতে।

পেপ্যালের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও বিনিয়োগকারী পিটার থিল গত বছর এক রুদ্ধদ্বার বক্তব্যে বলেন, মাস্ককে তিনি এই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসার পরামর্শ দিয়েছিলেন, কারণ এই অর্থ ‘বামপন্থী অলাভজনক সংস্থাগুলোর’ হাতে যাবে। মাস্ক প্রকাশ্যে প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার না করলেও থিলের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি এই পরামর্শ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিলেন।

ভ্যানগার্ড চ্যারিটেবল ও ফিডেলিটি চ্যারিটেবলের মতো দাতব্য তহবিল পরিচালনাকারী সংস্থার মাধ্যমে দান করতে পছন্দ করেন মাস্ক। ক্যাপিটাল রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে ভ্যানগার্ড চ্যারিটেবলে তিনি ৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার এবং ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ফিডেলিটি চ্যারিটেবলে ৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার দান করেন।

মাস্ক ও তাঁর পূর্বসূরিদের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো—অন্তত এখন পর্যন্ত তাঁর বিপুল সম্পদ ব্যাপক কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারেনি।

গিল্ডেড এজে ব্যাপক শ্রম আন্দোলন ও সামাজিক সক্রিয়তা দেখা গিয়েছিল, যার ফলে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে একচেটিয়া ব্যবসাবিরোধী আইন প্রণয়ন, ফেডারেল ট্রেড কমিশন প্রতিষ্ঠা এবং ফেডারেল আয়কর ব্যবস্থা চালু হয়।

আইওয়া স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির শিক্ষক জোশুয়া রোজেনব্লুম বলেন, ১৮৭০ থেকে ১৯২০-এর দশকের শেষভাগ পর্যন্ত যে অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থা অনেক বেশি পরিবর্তনযোগ্য ছিল, তার তুলনায় বর্তমান ব্যবস্থা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অনেক বেশি প্রতিরোধী।

আল জাজিরাকে রোজেনব্লুম বলেন, রকফেলার ও কার্নেগি তাঁদের সময়ে যে পরিমাণ প্রভাব রাখতেন, মাস্কের প্রভাবও তার থেকে খুব আলাদা নয়। তিনি বলেন, বিশ শতকের শুরুর দিকে বিপুল সম্পদের কেন্দ্রীভবন রাজনৈতিকভাবে যতটা বিতর্কিত ছিল, এখন তার তুলনায় তা কিছুটা কম বিতর্কিত। সে সময় শ্রমিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক সহিংসতা অনেক বেশি প্রকট ছিল, যা বর্তমানে দেখা যায় না।

সুইডেনের রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোনমিক্সের অর্থনীতির শিক্ষক ড্যানিয়েল ওয়ালডেনস্ট্রম বলেন, মাস্ক সম্ভবত ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হতে যাচ্ছেন, কিন্তু তাঁর সম্পদ স্থায়ী কিছু নয়।

আল জাজিরাকে তিনি বলেন, প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হয় তাঁকে এবং তাঁর প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজারমূল্য পরিবর্তিত হতে পারে। বাস্তব পরিস্থিতি বদলালে মাস্কের কিছু সম্পদের মূল্যও কমে যেতে পারে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ২০২২ সালে মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় টেসলার বাজারমূল্য একই বছরে ৬০ শতাংশের বেশি কমে গিয়েছিল।