ক্রোয়েশিয়ার হৃদয় ভেঙে পর্তুগালের জয়োল্লাস

৯৪ মিনিটে দ্বিতীয় গোল করে পর্তুগাল এগিয়ে যাওয়ার পর, ১০৩ মিনিটে তাদের জালে বল পাঠাল ক্রোয়েশিয়া; কিন্তু বাতিল হয়ে গেল সেই গোল।

ক্রোয়েশিয়ার হৃদয় ভেঙে পর্তুগালের জয়োল্লাস

গাজীপুর কণ্ঠ, খেলাধুলা ডেস্ক

রোমাঞ্চ-উত্তেজনা সবকিছু যেন জমা ছিল দ্বিতীয়ার্ধের জন্য। প্রাণহীন প্রথমার্ধের পর দারুণভাবে জমে উঠল লড়াই। এগিয়ে গেল ক্রোয়েশিয়া। ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়াল পর্তুগাল। যোগ করা সময়ে দ্বিতীয় গোল করে যখন জয়ের অপেক্ষায় তারা, তখনই নতুন করে নাটকীয়তা। যোগ করা ১০ মিনিট পেরিয়ে ত্রয়োদশ মিনিটে পর্তুগালের জালে বল পাঠাল ক্রোয়েশিয়া! পরাজয়ের দুয়ার থেকে ক্রোয়াট শিবিরে তখন সমতায় ফেরার উচ্ছ্বাস। কিন্তু তাদের উদযাপন থেমে গেল ভিএআরে গোল বাতিল হওয়ায়।

টরন্টো স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় শুক্রবার সকালে শেষ বত্রিশের রুদ্ধশ্বাস ম্যাচটি ২-১ গোলে জিতেছে পর্তুগাল।

সবকটি গোলই হয়েছে দ্বিতীয়ার্ধে। এছাড়া অফসাইডের কারণে পর্তুগালের ‘গোল বাতিল’ হয়েছে একটি, ক্রোয়েশিয়ার তিনটি। যার শেষটি নিয়েই শেষের চরম নাটকীয়তা।

ইভান পেরিসিচের ক্রস বক্সে ইগর মাতাোভিচের মাথায় হালকা ছুঁয়ে বল পান মারিও পাশালিচ। তার থেকে বল পেয়ে জালে পাঠান ইয়োশকো ভার্দিওল। ক্রোয়েশিয়া শিবিরে তখন তুমুল উচ্ছ্বাস। বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে ভিএআরে পর্যালোচনার পর মনিটরে দেখে অফসাইডের সঙ্কেত দেন রেফারি। তার মতে, অফসাইডে ছিলেন পাশালিচ।

রেফারির এই সিদ্ধান্ত যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না ক্রোয়াটরা। তাদের সমর্থকরা মাঠে বোতল ছুড়তে থাকে গ্যালারি থেকে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর আবার শুরু হয় খেলা। একটু পরই বাজে শেষ বাঁশি। ১০ মিনিট যোগ করা সময় শেষ হয় ১৯ মিনিটে গিয়ে! শেষ ষোলোয় ওঠার উল্লাসে মাতে পর্তুগাল।

এই ম্যাচ দিয়ে সবচেয়ে বেশি বয়সী আউটফিল্ড খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচ খেলার কীর্তি গড়েন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো (৪১ বছর ১৪৭ দিন)। ইভান পেরিসিচের গোলে পিছিয়ে পড়ার পর, রোনালদোই পেনাল্টি থেকে সমতায় ফেরান দলকে। বদলি নেমে ৯৪তম মিনিটে দ্বিতীয় গোল করেন গসালো রামোস। সেটিই গড়ে দেয় ব্যবধান।

রোনালদোর পাশাপাশি এই ম্যাচে নজর ছিল আরেক জনের ওপর, ক্রোয়েশিয়া অধিনায়ক ৪০ বছর বয়সী লুকা মদ্রিচ। ২০১২ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত এই দুজন রেয়াল মাদ্রিদের হয়ে একসঙ্গে খেলেছেন ২২২ ম্যাচ এবং চারটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগসহ শিরোপা জিতেছেন ১৩টি। তারাই প্রথম ৪০ বা এর বেশি বয়সী দুজন আউটফিল্ড খেলোয়াড়, যারা বিশ্বকাপে মুখোমুখি হলেন।

একজন টুর্নামেন্টে টিকে থাকলেন, বিদায় নিতে হলো আরেক জনকে। বিশ্বকাপে সম্ভাব্য শেষ ম্যাচ খেলে ফেললেন মদ্রিচ।

প্রথমার্ধে আক্রমণে দাপট দেখায় পর্তুগাল। চতুর্থ মিনিটে এগিয়ে যেতে পারত তারা। বাঁ দিক দিয়ে ক্ষিপ্র গতিতে বক্সে ঢুকে কাটব্যাক করেন খাফায়েল লেয়াও, আর ব্রুনো ফের্নান্দসের শট ফিরিয়ে দেন গোলরক্ষক দমিনিক লিভাকোভিচ। ফের্নান্দসের ফিরতি শট প্রতিহত হয় রক্ষণে।

পরের কিছুক্ষণ টানা আক্রমণ শাণায় পর্তুগাল। দশম মিনিটে পেদ্রো নেতো দারুণ ক্রস দেন বক্সে, হেডের চেষ্টায় বলের নাগাল পাননি রোনালদো। ষোড়শ মিনিটে কর্নারে খেনাতো ভাইগার হেড উডে যায় ক্রসবারের ওপর দিয়ে।

৩০তম মিনিটে আরেকটি খুব ভালো সুযোগ পায় পর্তুগাল। ডান দিক থেকে জুয়াও কান্সেলোর ক্রসে দূরের পোস্টে বলে পা ছোঁয়াতে পারেননি ফের্নান্দস কিংবা রোনালদো।

বিরতির আগে আর উল্লেখযোগ্য সুযোগ তৈরি করতে পারেনি কেউ।

প্রথমার্ধে প্রায় ৭০ শতাংশ বল দখলে রেখে গোলের জন্য ৯টি শট নিয়ে একটিই শুধু লক্ষ্যে রাখতে পারে পর্তুগাল। এই সময়ে ক্রোয়েশিয়ার তিন শটের একটিও লক্ষ্যে ছিল না।

সেই ক্রোয়েশিয়া দ্বিতীয়ার্ধে গোলের জন্য ১০টি শট নিয়ে ছয়টি রাখে লক্ষ্যে। এই সময়ে পর্তুগালের ছয় শটের দুটি লক্ষ্যে ছিল।

৪৮তম মিনিটে বক্সে ঢুকে প্রতিপক্ষের দুই জনের বাধা এড়িয়ে মাতেও কোভাচিচের শট পর্তুগাল গোলরক্ষকের পা ছুঁয়ে পাশের জালে লাগে।

৫৩তম মিনিটে গোলের দেখা পেয়ে যায় ক্রোয়াটরা। ডান দিক থেকে ইয়োসিপ স্তানিসিচের ক্রসে প্রতিপক্ষের মাথা ছুঁয়ে দূরের পোস্টে ছয় বক্সের কোণায় ফাঁকায় বল পান পেরিসিচ। জোরাল শটে গোলরক্ষকের দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে জাল খুঁজে নেন ৩৭ বছর বয়সী উইঙ্গার।

তিন মিনিট পর আবার পর্তুগালের জালে বল পাঠায় ক্রোয়েশিয়া, কিন্তু অফসাইডের কারণে গোল মেলেনি এবার।

পরের মিনিটে সমতায় ফিরতে পারত পর্তুগাল। কিন্তু বক্সের বাইরে থেকে খাফায়েল লেয়াওয়ের জোরাল শট ক্রসবার কাঁপিয়ে ফিরে আসে।

৬১তম মিনিটে কান্সেলোর ক্রস নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বক্সে ঢুকে বল জালে পাঠান রোনালদো, কিন্তু অফসাইডের পতাকা ওঠায় থেমে যায় তার উদযাপন।

৬৮তম মিনিটে সফল স্পট কিকে সমতা টানেন রোনালদো। কর্নার কিকের পর ক্রোয়েশিয়ার নিকোলা ভ্লাসিচ বক্সে খেনাতো ভাইগাকে টেনে ফেলে দিলে, ভিএআর পর্যালোচনায় মনিটরে দেখে পেনাল্টি দিয়েছিলেন রেফারি।

বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ৯ ম্যাচে রোনালদোর প্রথম গোল এটি, ৩১তম শটে।

৭৫তম মিনিটে আবার এগিয়ে যেতে পারত ক্রোয়েশিয়া। ২৫ গজ দূর থেকে কোভাচিচের নিচু শট ঝাঁপিয়ে পড়া গোলরক্ষকের হাত ছুঁয়ে পোস্টে লাগে।

পাঁচ মিনিট পর পর্তুগালের জালে বল পাঠান পেতার সুচি, কিন্তু অফসাইডের পতাকা ওঠে আরেকবার।

পরের মিনিটে রোনালদোকে তুলে হুবেন নেভ্সকে নামান পর্তুগাল কোচ রবের্তো মার্তিনেস।

যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে এগিয়ে যায় পর্তুগাল। বাঁ দিক থেকে লেয়াওয়ের ক্রসে বক্সে প্রতিপক্ষের দুই খেলোয়াড়ের মাঝে লাফিয়ে হেডে বল জালে পাঠান রামোস।

যোগ করা ১০ মিনিট যখন পেরিয়ে গেলে, পর্তুগালের ডাগআউটের খেলোয়াড়রা জয় উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখন। এমন সময়ে তাদের জালে বল পাঠায় ক্রোয়েশিয়া, কিন্তু শেষ পর্যন্ত গোলটা আর পাওয়া হয়নি তাদের। বিদায় নিতে হলো আসর থেকে।

শেষ ষোলোয় স্পেনের বিপক্ষে খেলবে পর্তুগাল।