কালীগঞ্জে প্রশাসনের নাকের ডগায় অবৈধ বালু ভরাট, নীরব কর্তৃপক্ষ

উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও থানা থেকে মাত্র এক কিলোমিটারের মধ্যে এই অবৈধ কার্যক্রম চলমান থাকলেও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশাসনের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই পথ দিয়ে সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের প্রধানেরা প্রতিদিন যাতায়াত করেন—অর্থাৎ কার্যত অবৈধ কার্যক্রম তাঁদের চোখের সামনেই ঘটছে। কিন্তু প্রতিকারে কোনো উদ্যোগ নেই বললেই চলে।

কালীগঞ্জে প্রশাসনের নাকের ডগায় অবৈধ বালু ভরাট, নীরব কর্তৃপক্ষ

নিজস্ব সংবাদদাতা

কালীগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীতে ড্রেজার বসিয়ে পৌরসভার উত্তর ভাদার্ত্তী এলাকায় প্রকাশ্যে অনুমোদনহীনভাবে কৃষিজমি ভরাট করা হচ্ছে। এই কাজের জন্য প্রধান সড়কের ওপর দিয়ে আড়াআড়িভাবে পাইপ বসানো হয়েছে, যা যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করলেও তা অপসারণে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি স্থানীয় প্রশাসন।

বুধবার (১৫ জুলাই) ভোররাত থেকে শুরু হওয়া এই কার্যক্রম নিয়ে উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। 

প্রকাশ্য এই অনিয়ম, দীর্ঘদিনের সড়ক-প্রতিবন্ধকতা আর রাজনৈতিক-প্রশাসনিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ মিলিয়ে ঘটনাটি কালীগঞ্জ পৌরবাসীর মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কোথাও অবৈধভাবে বালু ভরাটে স্থানীয় সংসদ সদস্য এ কে এম ফজলুল হক মিলনের কোনো সম্মতি নেই। বিভিন্ন সময়ে দলীয় নেতারা ভিন্ন ভিন্ন স্থানে বালু ভরাটে তদবির করলেও এমপি তা নাকচ করে দিয়েছেন বলে তিনি নিজেই আগে নিশ্চিত করেছিলেন।

জানা গেছে, বালু ভরাটের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গত ১০ জুন কালীগঞ্জ পৌরসভার উত্তর ভাদার্ত্তী এলাকায় প্রধান সড়কের ওপর দিয়ে আড়াআড়িভাবে পাইপ বসানো হয়। কোনো দপ্তরের অনুমোদন ছাড়াই বসানো এই পাইপ প্রায় এক মাসের বেশি সময় ধরে সড়কে যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করলেও তা অপসারণে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি স্থানীয় প্রশাসন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, বালু ভরাটের প্রস্তুতি ও নদীতে ড্রেজার বসানোর পরপরই একাধিকবার বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হয়। তবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে প্রশাসন এই অবৈধ কাজে পরোক্ষভাবে উৎসাহ জুগিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অথচ কালীগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বালু ভরাটের খবর পাওয়ামাত্র প্রশাসন তা বন্ধ করে দেয় এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে জরিমানা আদায়ের নজিরও রয়েছে। ফলে একই প্রশাসনের দুই ধরনের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বাসিন্দাদের মধ্যে।

প্রধান সড়কের ওপর দিয়ে আড়াআড়িভাবে পাইপ বসানো হয়েছে, যা যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।

জানা গেছে, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও থানা থেকে মাত্র এক কিলোমিটারের মধ্যে এই অবৈধ কার্যক্রম চলমান থাকলেও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশাসনের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই পথ দিয়ে সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের প্রধানেরা প্রতিদিন যাতায়াত করেন—অর্থাৎ কার্যত অবৈধ কার্যক্রম তাঁদের চোখের সামনেই ঘটছে। কিন্তু প্রতিকারে কোনো উদ্যোগ নেই বললেই চলে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উত্তর ভাদার্ত্তী বাইপাস–সংলগ্ন একটি পেট্রল পাম্পের আশপাশের কৃষিজমিতে বালু ফেলা হচ্ছে। এই ভরাটের মধ্য দিয়ে জমির শ্রেণি কার্যত পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে, যদিও সংশ্লিষ্ট কোনো দপ্তর থেকে অনুমতি বা সম্মতি নেওয়া হয়নি। কৃষিজমি এভাবে অননুমোদিতভাবে অকৃষি খাতে রূপান্তরিত হলে ভূমি ব্যবস্থাপনার মৌলিক নিয়মকানুনই লঙ্ঘিত হয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, এই কৃষিজমি ভরাটের ফলে একদিকে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কমবে, অন্যদিকে পৌর এলাকায় জলাবদ্ধতা আরও প্রকট হবে। বিষয়টি নতুন নয়—এর আগে হা-মীম গ্রুপের একাধিক বিশাল পুকুর ভরাটের পর সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো পৌর শহর তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা নিয়মিত ঘটেছে।

সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার আরও বড় পরিসরে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন এলাকাবাসী।

ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে মুনসেফপুর ও উত্তর ভাদার্ত্তী এলাকার কৃষিজমি ভরাট স্থায়ীভাবে বন্ধ রাখা জরুরি হয়ে পড়েছে।

জানা গেছে, পৌর এলাকায় ভবন ও স্থাপনা নির্মাণে প্রাথমিক ছাড়পত্র দেওয়া বা তা বন্ধ করার দায়িত্ব পৌরসভার। কিন্তু কর্তৃপক্ষের এই উদাসীনতার সুযোগে অনুমোদনহীন বালু ভরাটের পাশাপাশি পরিকল্পনাবহির্ভূত ভবন ও স্থাপনা নির্মাণও চলছে অবাধে। ফলে অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে নির্মিত ভবনগুলোয় কাঠামোগত ঝুঁকি বাড়ছে, সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে জলাবদ্ধতাসহ নানা জনদুর্ভোগ বৃদ্ধির আশঙ্কাও।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উত্তর ভাদার্ত্তী এলাকার কৃষিশ্রেণির জমিতে প্রায় ৩০ লাখ ঘনফুট বালু ভরাট করা হবে বলে জানা গেছে—যা পরিমাণের বিচারে ছোট কোনো প্রকল্প নয়। এত বিপুল পরিমাণ বালু ফেলা হলে পৌর শহরের পানিপ্রবাহ বা নিষ্কাশনব্যবস্থা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে এবং সামান্য বৃষ্টিতেই শহর তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেবে। বর্তমানে অল্প বৃষ্টিতেই শহরের সড়ক-ঘাট ডুবে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ পানি নিষ্কাশনের পথগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যাওয়া। আশপাশের নিচু জমিও একই কারণে দ্রুতগতিতে ভরাট হয়ে যাচ্ছে।

পৌরসভা থেকে পানি বের হওয়ার একমাত্র পথ এই বিলে কোনো ড্রেন বা পাইপলাইনের মাধ্যমে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখার ন্যূনতম পরিকল্পনা ছাড়াই চলছে বালু ভরাট। ভরাট করতে হলেও অন্তত পাইপের মাধ্যমে পানিপ্রবাহের পথ খোলা রেখে তারপর কাজ শুরু করা উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে তেমন কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি, যা দীর্ঘমেয়াদে গোটা পৌর এলাকাকে জলাবদ্ধতার ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে।

অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং উপজেলা প্রশাসনের রহস্যময় নীরবতার সুযোগ কাজে লাগিয়েই সড়কের ওপর এই পাইপ বসানো হয়েছে। এতে যানবাহন চলাচলে সরাসরি ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে এবং সড়কের স্বাভাবিক গতি কমে যাচ্ছে। এই প্রতিবন্ধকতার কারণে সড়কে চলাচলকারী যানবাহন মাঝেমধ্যেই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রশাসনের কর্মকর্তারাও প্রতিদিন এই প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে চলাচল করেন। তবু রহস্যজনক কারণে জড়িতদের বিরুদ্ধে বা সড়ক থেকে পাইপ অপসারণে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, যা নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, এই অবৈধ বালু ভরাট কার্যক্রমের অঘোষিত নেতৃত্বে রয়েছেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ফরিদ আহমেদ মৃধা ও পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহীম প্রধান। তাদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহায়তায় কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছেন যুবদল নেতা পরিচয়দানকারী গোলাম কিবরিয়া। এটি তার প্রথম কোনো বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নয়—এর আগেও ভাদার্তী খন্দকার বাড়ি–সংলগ্ন এলাকায় একটি পুকুর ভরাটের সময় স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে বালু রেখে ক্ষমতার প্রভাব খাটানোর অভিযোগে আলোচনায় এসেছিলেন তিনি। অর্থাৎ একই ধরনের কর্মকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি ঘটছে।

এলাকায় আলোচনা রয়েছে, এই কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য ইউএনওর নামে ৩ লাখ, ওসির নামে ৩ লাখ, সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর নামে ২ লাখ এবং ইউএনও কার্যালয়ের নামে আরও ১ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলে গুঞ্জন রটিয়েছে বালু ব্যবসায়ীদের একটি অংশ।

উত্তর ভাদার্ত্তী এলাকায় অনুমোদনহীনভাবে এসব কৃষিজমি ভরাট করা হচ্ছে

তবে অতীতে দেখা গেছে, প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের নাম ভাঙিয়ে বিভিন্ন প্রকল্প, টেন্ডার ও অনুমোদনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সংশ্লিষ্ট নেতা বা কেউ কেউ নিজেরাই সেই অর্থ আত্মসাৎ করার নজির রয়েছে। ফলে অর্থ প্রকৃতপক্ষে হাতবদল হয়েছে কি না তা নিশ্চিত না হলেও, অবৈধ কার্যক্রমে কীভাবে এই ধরনের ‘নীরবতা’ মিলছে, তা নিয়ে রহস্য থেকেই যাচ্ছে।

এ ছাড়া জানা গেছে, গত মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বিকেলে কালীগঞ্জের একটি প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও বিএনপির মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত এক সাংবাদিক এবং অপর একটি প্রেস ক্লাবের সাংগঠনিক সম্পাদক ও প্রশাসনের মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত আরেক সাংবাদিকের সঙ্গে বৈঠক করে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তাদের নীতিগত অনুমোদন নিয়েছেন গোলাম কিবরিয়া।

সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ঘনফুট বালুর ক্রয়মূল্য ৬ টাকা হলেও তা বিক্রি হচ্ছে ১২ টাকায়—অর্থাৎ প্রতি ফুটে লাভ প্রায় ৬ টাকা। প্রায় ৩০ লাখ ঘনফুট বালুর এই প্রকল্পে মোট লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা, যার মধ্যে নিট মুনাফা প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এই বিপুল অঙ্কের মুনাফার হিসাবই স্পষ্ট করে দেয়, কেন এত ঝুঁকি নিয়েও একের পর এক পক্ষ এই কারবারে জড়িয়ে পড়ছে, আর কেনই বা প্রশাসনিক পর্যায়ে এত নীরবতা।

সব মিলিয়ে কালীগঞ্জের এই বালু ভরাট কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অনিয়মের ঘটনা নয়—বরং কৃষিজমি রক্ষা, নগর পরিকল্পনা, সড়ক নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক জবাবদিহির মতো একাধিক প্রশ্নকে একসঙ্গে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, অবৈধ এই প্রকল্প ঠেকাতে সড়কের পাইপ খুলে জব্দ করে নিলামের মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, যাতে বালু দস্যুদের দাপট কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হয়। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, একবার পাইপ অপসারণ করা হলেও পরবর্তী সময়ে তা পুনরায় বসিয়ে কাজ শুরু করার নজির রয়েছে। তাই শুধু সাময়িক ব্যবস্থা নয়, দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইব্রাহিম প্রধান দাবি করেন, তিনি বালু ভরাটের সঙ্গে জড়িত নন এবং তার জড়িত থাকার তথ্য মিথ্যা।

ফরিদ আহমেদ মৃধা বলেন, আইন অনুযায়ী প্রশাসন না চাইলে বালু ভরাট বন্ধ করে দেওয়া হবে।

কালীগঞ্জ পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা শ্যামল কুমার দত্ত বলেন, ‘সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে পাইপ বসানোর পর এবং বালু ভরাট শুরুর পর এ বিষয়ে ইউএনওকে অবহিত করা হয়েছে। তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। পৌরসভার নিজস্ব নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট না থাকায় চাইলেও অনেক সময় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ হয় না।’ 

তিনি আরও জানান, বালু ব্যবসায়ীরা পৌরসভা থেকে কোনো অনুমোদন নেননি, এমনকি তাদের কোনো ট্রেড লাইসেন্সও পৌরসভা থেকে দেওয়া হয়নি।

কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পৌরসভার প্রশাসক এ. টি. এম. কামরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা কাউকে লিখিত অনুমতি দিইনি। আইনানুগ না হলে অবশ্যই মোবাইল কোর্টে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।