গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঢাকায় প্রত্যর্পণ না করা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্রিকস সম্মেলনসহ কোনো ভারত সফরেই যাবেন না বলে জানিয়েছেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
গত ১০ আগস্ট ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই বার্তা দেন।
শেখ হাসিনা দুই বছর আগে ঢাকা ছেড়ে দিল্লিতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের যে চেষ্টা চলছিল, এই ঘটনা তাতে নতুন করে অনিশ্চয়তার ছায়া ফেলেছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।
ঢাকার এই কঠোর অবস্থানের পেছনে সরাসরি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে গত ৫ আগস্ট দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে শেখ হাসিনা ও তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের যৌথ সংবাদ সম্মেলন। দিল্লিতে হাসিনার দুই বছরের আশ্রয়জীবন পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন মা-ছেলে। সেখানে হাসিনার কণ্ঠস্বর ছিল বিশেষভাবে আক্রমণাত্মক। তিনি ডিসেম্বরে ঢাকায় ফেরার অঙ্গীকার করে বলেন, ফিরলে তাকে “এমনকি হত্যাও করা হতে পারে।”
কূটনৈতিক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, হাসিনা এই সম্পর্ককে নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে মনে করছেন তারেক রহমান ও তার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার, আর এতেই তারা অসন্তুষ্ট। এমনকি ঢাকা দিল্লিকে সরাসরি জানিয়ে দিয়েছে, দ্বিপক্ষীয় সফরও এখন হাসিনার প্রত্যর্পণের ওপর “পুরোপুরি নির্ভরশীল—পঞ্চাশ-পঞ্চাশ।”
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনে জয়ের পরপরই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিশ্বনেতাদের মধ্যে সবার আগে তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। এই দ্বিপক্ষীয় আমন্ত্রণটি ব্রিকস সম্মেলনের আমন্ত্রণ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক বলে বিবেচিত হচ্ছে—কেননা ব্রিকসের আমন্ত্রণটি বঙ্গোপসাগরীয় জোট বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে পাঠানো হয়েছিল, যা আঞ্চলিক সংগঠনের প্রধানদের আমন্ত্রণ জানানোর প্রচলিত রীতি অনুসরণ করেই করা হয়েছে।
তবে ৫ আগস্টের সংবাদ সম্মেলন আয়োজনে তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না বলে দ্রুতই নিজেদের দূরত্ব স্পষ্ট করে ভারতীয় কর্মকর্তারা। তা সত্ত্বেও ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে বলে সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে। এরই মধ্যে ভারতের রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং ‘র’ এর প্রধান পরাগ জৈন ১০ আগস্ট ঢাকা সফরে যান এবং তার প্রতিপক্ষ, প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এ কে এম শামসুল ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সে সময় ঢাকার বদলে যাওয়া মনোভাব স্পষ্ট বোঝা গেছে বলে সূত্রগুলো জানায়।
একই দিন, অর্থাৎ ১০ আগস্ট সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী। প্রায় ৪৫ মিনিট স্থায়ী ওই বৈঠকে তারেক রহমান স্পষ্ট ভাষায় ত্রিবেদীকে জানিয়ে দেন, ভারতে তার যেকোনো সফর এখন থেকে হাসিনার প্রত্যর্পণের শর্তসাপেক্ষ।
জানা গেছে, ত্রিবেদী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নে “আকাশই একমাত্র সীমা” এবং ভারত এ ক্ষেত্রে কোনো প্রচেষ্টায় ঘাটতি রাখবে না বলে বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তারেক রহমান তার অবস্থানে অনড় থাকেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সংবাদমাধ্যমের কাছে অবশ্য ত্রিবেদী এই বৈঠককে দুই দেশের সম্পর্ককে “ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী” পথে নেওয়ার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফরের প্রত্যাশায় রয়েছে ভারত, এবং দুই দেশের মধ্যে এমন কোনো সমস্যা নেই যার সমাধান সম্ভব নয়।
দিল্লি ফেরার পর গত কয়েক দিনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ঢাকার বদলে যাওয়া অবস্থান সম্পর্কে অবহিত করেছেন বলে জানা গেছে ত্রিবেদী—যদিও প্রকাশ্যে তিনি এই সম্পর্ককে “বহুমাত্রিক ও দীর্ঘস্থায়ী” বলে বর্ণনা করেছেন।
পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে মোদি ব্যক্তিগতভাবে যে শক্তি বিনিয়োগ করছেন, তার নতুন “লুক ইস্ট” উদ্যোগের কেন্দ্রেই রয়েছে বাংলাদেশ। এমন প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের কঠোর অবস্থান ভারতের জন্য কিছুটা অপ্রত্যাশিত ধাক্কা হিসেবে দেখা দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
উভয় পক্ষই এখন একে অপরের কঠোর অবস্থান নরম করার চেষ্টা করছে, কেননা দ্রুত বদলে যাওয়া বিশ্ব পরিস্থিতিতে দুই দেশই একে অপরকে প্রয়োজন বলে সচেতনভাবে উপলব্ধি করছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর হয়েছিল মালয়েশিয়া ও চীনে, যা ভারত সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিল।
শেখ হাসিনার প্রসঙ্গে কূটনৈতিক সূত্রগুলো উল্লেখ করেছে, পুরোনো ও বিশ্বস্ত বন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যাকে ভারত পরিত্যাগ করতে পারে না—বিশেষত যখন তিনি জীবনে দ্বিতীয়বারের মতো ভারতে আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন।
তবে সূত্রগুলো এটাও স্বীকার করেছে যে হাসিনার সংবাদ সম্মেলন দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুতর বাধা সৃষ্টি করেছে। এ প্রসঙ্গে সূত্রগুলো বলেছে, “পূর্বাঞ্চলে ভারতের নিরাপত্তা প্রয়োজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, আর কেবল বন্ধুত্বপূর্ণ বাংলাদেশই সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।”