কিমের সঙ্গে বৈঠক চান ট্রাম্প, উত্তর কোরিয়া বলল ‘ধৈর্য ধরুন’

কিমের সঙ্গে বৈঠক চান ট্রাম্প, উত্তর কোরিয়া বলল ‘ধৈর্য ধরুন’

গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক

বছর শেষ হওয়ার আগেই উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠক করতে চান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ট্রাম্পের এই আগ্রহে এখনো ইতিবাচক সাড়া দেয়নি পিয়ংইয়ং, বরং উত্তর কোরিয়া ট্রাম্পকে ‘ধৈর্য ধরার’ ইঙ্গিত দিয়েছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, কিমের সঙ্গে বৈঠক করতে হলে ট্রাম্প প্রশাসনকে কঠিন কিছু শর্ত মানতে হতে পারে।

রয়টার্সের খবরে বলা হয়, চলতি সপ্তাহের শুরুতে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়ার পরিসর হঠাৎ কমিয়ে দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সে সময় তিনি এসব মহড়াকে উত্তর কোরিয়ার জন্য ‘শত্রুতাপূর্ণ’ বলে উল্লেখ করেন।

এর পরপরই বুধবার ট্রাম্প জানান, তিনি এ বছরের শেষ দিকে সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনের সঙ্গে দেখা করার প্রত্যাশা করছেন।

এ বিষয়ে অবগত একটি সূত্রের দাবি, ট্রাম্প নতুন করে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা শুরু করতে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি কূটনৈতিক সাফল্য অর্জন করতে আগ্রহী।

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের প্রায় ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও তা দ্রুত শেষ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখা না যাওয়ায় উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠকের আগ্রহকে ‘নতুন কূটনৈতিক চাল’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন বিশ্লেষকরা। ইরান যুদ্ধের পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধও এক্ষেত্রে প্রাধান্য পাবে বলে মনে করছেন তারা।

বিশ্লেষকদের মতে, দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা নেওয়ার পর একাধিকবার ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন ট্রাম্প। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ঐতিহাসিক বৈঠক করেও কোনো ফল পাননি তিনি।

অন্যদিকে, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া শক্তিশালী ও বন্ধুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক ধরে রেখেছে। শুধু তাই নয়, রাশিয়াকে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে সহায়তা করতে সেনা, সামরিক সরঞ্জাম ও ক্ষেপণাস্ত্র পাঠিয়েছে উত্তর কোরিয়া।

মার্কিন সূত্রের দাবি, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে দুরত্ব কমিয়ে আনতে দক্ষিণ কোরিয়া ব্যক্তিগত পর্যায়ে ট্রাম্পের কৌশলের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া কমানোর বিষয়ে সিউলের কর্মকর্তাদের এখনো কিছুটা উদ্বেগ রয়েছে।

ওই সূত্রের মতে, ট্রাম্প এ বছরের শেষ দিকে চীনের শেনঝেনে এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন (এপেক) সম্মেলনে যেতে পারেন। উত্তর কোরিয়া নতুন করে আলোচনায় আগ্রহ দেখালে ওই সফরেই কিমের সঙ্গে আঞ্চলিক কোনো বৈঠকের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেছেন, ‘কোনো পূর্বশর্ত ছাড়াই উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সংলাপে যুক্তরাষ্ট্র এখনো আগ্রহী।’ তিনি আশা করেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও কিম জং উন ‘উপযুক্ত সময়ে’ আবার বৈঠক করবেন।

অবশ্য হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ও মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি। তবে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আগের একটি বিবৃতির দিকে ইঙ্গিত করে আশা করেছে ট্রাম্পের মন্তব্য পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে অর্থবহ সংলাপের পথ খুলবে।

কিম-ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে উত্তর কোরিয়ার অবস্থান

উত্তর কোরিয়া এখন পর্যন্ত ট্রাম্পের বৈঠকের আহ্বানে শীতল প্রতিক্রিয়া দেখালেও কিম ও ট্রাম্পের ‘চমৎকার ব্যক্তিগত সম্পর্কের’ প্রশংসা করেছে। তবে পিয়ংইয়ং স্পষ্ট করে দিয়েছে, দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্ককে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সম্পর্কের সঙ্গে এক করে দেখা যাবে না।

কিউংনাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর ফার ইস্টার্ন স্টাডিজের অধ্যাপক লিম উল-চুল বলেন, ব্যক্তিগত সম্পর্ককে কখনোই জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থ বা সামরিক সক্ষমতা জোরদারের প্রচেষ্টার সঙ্গে আপস করতে দেওয়া হবে না।

তার ভাষায়, ‘এর অর্থ হলো পিয়ংইয়ং ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ব্যক্তিগত কূটনীতিরও সীমা রয়েছে এবং তা কৌশলগত অগ্রাধিকারকে অতিক্রম করতে পারবে না।’

উত্তর কোরিয়ার রাজনীতিতে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকা কিম জং উনের বোন কিম ইয়ো জংও যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়ার ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ সামরিক মহড়ার পরিসর কমানোর সিদ্ধান্তকে তেমন গুরুত্ব দিতে চান না। তিনি বলেছেন, মহড়ার ধারাবাহিকতা এখনো আগ্রাসী এবং উত্তর কোরিয়ার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নীতি এখনো শত্রুতাপূর্ণ।

কিম ইয়ো জং আরও দাবি করেছেন, ট্রাম্প ও কিমের মধ্যে সম্প্রতি কোনো যোগাযোগ হয়নি। তবে তিনিও দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্ককে ‘চমৎকার’ বলে উল্লেখ করেছেন।

বৃহস্পতিবার দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, উত্তর কোরিয়া দেশটির পূর্ব উপকূল থেকে প্রায় ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, চলমান যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া সামরিক মহড়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবেই এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা হয়ে থাকতে পারে।

রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কেসিএনএকে দেওয়া বিবৃতিতে কিম ইয়ো জং বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি এবার নেওয়া পদক্ষেপগুলোকে কোনো ধরনের ‘সদিচ্ছার নিদর্শন’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে, তাহলে তারা যে ধরনের জবাব আশা করছে, তা পাবে না।

বৈঠকের জন্য পিয়ংইয়ংয়ের কঠিন শর্ত

ওয়াশিংটনভিত্তিক স্টিমসন সেন্টারের জ্যেষ্ঠ গবেষক জেনি টাউন বলেন, কোন পরিস্থিতিতে কিম ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে আগ্রহী হতে পারেন, সে বিষয়ে উত্তর কোরিয়া এরই মধ্যে কিছুটা পরিষ্কার ধারণা দিয়েছে। তবে এসব শর্ত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বেশ কঠিন।

তার মতে, উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে দেশটির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এবং পিয়ংইয়ং যেসব বিষয়কে শত্রুতাপূর্ণ মনে করে, সেগুলো প্রত্যাহার করা।

এর পাশাপাশি উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রের মর্যাদা মেনে নেওয়া অথবা অন্তত যুক্তরাষ্ট্র আর উত্তর কোরিয়ার পরমাণু নিরস্ত্রীকরণকে লক্ষ্য হিসেবে দেখছে না- এমন ঘোষণা দেওয়ার বিষয়টিও শর্তের মধ্যে থাকতে পারে।

টাউন বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বৈঠক আয়োজনের জন্য ট্রাম্প এসব শর্ত কতটা মানতে প্রস্তুত, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।’

তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র বলেছেন, উত্তর কোরিয়ার সম্পূর্ণ পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের প্রতি ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতি এখনো অটুট রয়েছে। তারা এখনো উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনকে হুমকি হসেবে দেখছেন।

পরমাণু অস্ত্র নিয়ে বিরোধেই পণ্ড হয় দুই নেতার আগের বৈঠক

ট্রাম্প ২০১৮ ও ২০১৯ সালে কিমের সঙ্গে ধারাবাহিক কয়েকটি শীর্ষ বৈঠক করেছিলেন। দুই দেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে এটিকে বেশ বিরল ঘটনা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু উত্তর কোরিয়াকে তার পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ করানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দাবির কারণে সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়ে।

এরপর ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে উত্তর কোরিয়াকে ‘পারমাণবিক শক্তিধর দেশ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে তার প্রশাসন এখনো উত্তর কোরিয়ার পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের আহ্বান জানিয়ে আসছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে দেশটিকে পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।

এবার কিমের সঙ্গে বৈঠকে আগ্রহ দেখানোর পেছনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো- ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের তুলনায় কিমের এখন আলোচনায় বসার তাগিদ কম। প্রথম মেয়াদে কিম আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন। কিন্তু এরপর উত্তর কোরিয়া চীন ও রাশিয়ার আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। দুই দেশের সঙ্গে বাড়তে থাকা বাণিজ্য উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতিতেও সহায়তা করেছে।

জেনি টাউন বলেন, উত্তর কোরিয়ার এখন একাধিক বিকল্প রয়েছে। তারা এমন দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াচ্ছে, যেখানে তাদের কোনো ছাড় দিতে হয় না এবং দুই পক্ষই লাভবান হয়।

তার মতে, নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় ছাড় দেওয়ার প্রত্যাশা থাকলে উত্তর কোরিয়ার আলোচনায় দ্রুত ফিরে যাওয়ার তেমন কোনো কারণ নেই।

সংলাপের দরজা পুরোপুরি বন্ধ করেনি পিয়ংইয়ং

তবে উত্তর কোরিয়ার সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়াকে পুরোপুরি সংলাপ প্রত্যাখ্যান হিসেবেও দেখছেন না বিশ্লেষকরা।

কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ইউনিফিকেশনের জ্যেষ্ঠ গবেষক হং মিন বলেন, কিম ইয়ো জংয়ের বক্তব্য এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে কূটনীতির সম্ভাবনা খোলা থাকে।

তার মতে, উত্তর কোরিয়ার মূল লক্ষ্য সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রকে আরও নমনীয় অবস্থান নিতে উৎসাহিত করা।

হং বলেন, পিয়ংইয়ং সম্ভবত ট্রাম্পকে বিরক্ত না করার জন্য তাদের বক্তব্যে ইরানের প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেছে।

তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কিম ইয়ো জংয়ের বিবৃতিটি সংলাপ প্রত্যাখ্যানের চেয়ে ট্রাম্পের ধারণাকে নিয়ন্ত্রণ করা, উত্তর কোরিয়াকে নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি প্রভাবিত করা এবং ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র-উত্তর কোরিয়া আলোচনার ভিত্তি তৈরির প্রচেষ্টা বেশি।