গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে একাধিক ভুয়া ও অতিরঞ্জিত দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধের অবসান, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ ও সামরিক গোলাবারুদের মজুত তার কয়েকটি দাবি যাচাই করে সঠিক নয় বলে জানিয়েছে সিএনএন।
ট্রাম্প ও যুদ্ধ
ট্রাম্প জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে বলেছেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আটটি যুদ্ধের অবসান ঘটানো আমার জন্য বড় সম্মানের বিষয়।’
তিনি যেসব সংঘাতের কথা বলেছেন, সেগুলো হলো: কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড, কসোভো-সার্বিয়া, রুয়ান্ডা-গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, ভারত-পাকিস্তান, আর্মেনিয়া-আজারবাইজান এবং গাজা যুদ্ধ। এর বাইরে গত বছর ইসরায়েল-ইরানের ক্ষণস্থায়ী সংঘাত এবং মিসর-ইথিওপিয়ার কথিত যুদ্ধের অবসান ঘটানোর দাবিও এর আগে করেছেন তিনি।
তবে ট্রাম্পের ‘আটটি যুদ্ধ’ অবসানের দাবিটি স্পষ্টতই অতিরঞ্জিত।
এ তালিকায় এমন দুটি ঘটনাও রয়েছে, যেগুলো আসলে যুদ্ধ ছিল না। ইথিওপিয়ার বাঁধ নির্মাণ নিয়ে মিসরের সঙ্গে বিরোধটি ছিল কূটনৈতিক। একইভাবে সার্বিয়া ও কসোভোর মধ্যকার বিরোধও কোনো যুদ্ধ ছিল না।
এ ছাড়া রুয়ান্ডা ও গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের মধ্যকার যুদ্ধও শেষ হয়নি। ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যস্থতায় একটি শান্তিচুক্তি হলেও সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। গাজার যুদ্ধের কথাও ট্রাম্প উল্লেখ করেছেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পরও ইসরায়েল গাজায় নিয়মিত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে ২০২৫ সালে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ক্ষণস্থায়ী সংঘাত বন্ধে ট্রাম্প ভূমিকা রেখেছিলেন। যদিও ২০২৬ সালে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে আবারও যুদ্ধ শুরু করেছে।
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একসময় মানুষকে আক্রমণ বা হত্যা করতে পারে—এমন সতর্কবার্তাকে উপহাস করে ট্রাম্প বলেন, এসব সতর্কতা ‘একই লোকদের কাছ থেকে আসছে, যারা বলেছিল বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে ১২ বছরের মধ্যে আমরা সবাই মারা যাব।’
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ে ট্রাম্পের এই বক্তব্যে অন্তত চারটি সমস্যা রয়েছে।
প্রথমত, ‘বৈশ্বিক উষ্ণায়ন’ শব্দটি এখনো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ শব্দটিও প্রচলিত, তবে দুটির অর্থ এক নয়। জলবায়ুবিজ্ঞানীরা দীর্ঘমেয়াদে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা বোঝাতে ‘বৈশ্বিক উষ্ণায়ন’ এবং এর ফলে বিশ্বে যে নানা ধরনের পরিবর্তন ঘটছে, তা বোঝাতে ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ শব্দটি ব্যবহার করেন। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সংস্থা নাসাও তাদের ওয়েবসাইটে দুটি শব্দের পার্থক্য ব্যাখ্যা করেছে।
দ্বিতীয়ত, ট্রাম্প কোন সময়ের কথা বলছেন তা স্পষ্ট না করলেও পৃথিবীর তাপমাত্রা কমেনি, বরং বেড়েছে। জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানুয়ারিতে জানিয়েছে, রেকর্ড অনুযায়ী গত ১১ বছরই ছিল সবচেয়ে উষ্ণ ১১ বছর। এর মধ্যে ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ ছিল সবচেয়ে উষ্ণ তিন বছর। নাসার তথ্যেও একই প্রবণতা দেখা গেছে।
তৃতীয়ত, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের বিভিন্ন প্রভাবে ‘কেউ মারা যায়নি’—এমন দাবির সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের ব্যাপক মতপার্থক্য রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঠিক কত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে বিভিন্ন হিসাবে এ সংখ্যা লাখ থেকে শুরু করে কয়েক লাখ পর্যন্ত হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে অপুষ্টি, ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া ও অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বছরে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার অতিরিক্ত মৃত্যু হতে পারে।
চতুর্থত, কেউ কোথাও হয়তো বলেছিলেন ‘১২ বছরের মধ্যে আমরা সবাই মারা যাব’। কিন্তু ২০১৮ সালের জলবায়ুবিষয়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনে এমন দাবি করা হয়নি।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, শিল্পপূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হলে পরবর্তী ১২ বছরের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হবে। এই সীমা অতিক্রম করলে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রাণঘাতী প্রভাব আরও বাড়তে পারে। অর্থাৎ, ১২ বছরের মধ্যে সবাই মারা যাবে—এমন কথা বিজ্ঞানীরা বলেননি; বরং ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি উন্নত করতে ওই সময়ের মধ্যে বড় ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ
যুক্তরাষ্ট্রে ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আসছে—আগে এমনটা দাবি করলেও, এবার কিছুটা সতর্ক থেকে বক্তব্য দেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি আমরা নিশ্চিত করেছি।’
তবে ‘নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি’ বললেও এই সংখ্যার কোনো দৃশ্যমান ভিত্তি নেই। হোয়াইট হাউসও এ দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত প্রমাণ দিতে পারেনি।
ট্রাম্প জাতিসংঘে ভাষণ দেওয়ার সময় হোয়াইট হাউসের ওয়েবসাইটে বলা হয়, তার দ্বিতীয় মেয়াদে এখন পর্যন্ত ‘১১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারের’ বড় বিনিয়োগের ঘোষণা এসেছে। অর্থাৎ, ট্রাম্পের বলা ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতির তুলনায় এই অঙ্ক অনেক কম।
২০২৫ সালে সিএনএনের পর্যালোচনায় দেখা যায়, হোয়াইট হাউসের তালিকায় কিছু অস্পষ্ট বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি ছিল। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগের বদলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বা অর্থনৈতিক সহযোগিতার কথাও ছিল। কিছু বক্তব্যকে আবার প্রকৃত বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি বলার মতো পর্যায়ে নেওয়া যায় না।
হোয়াইট হাউসের হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানির পাশাপাশি বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের (এফডিআই) পরিমাণ ছিল প্রায় ২৩২ বিলিয়ন ডলার।
যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের মজুত
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পক্ষে দীর্ঘ বক্তব্য দেন ট্রাম্প। এ সময় তিনি বলেন, ‘কাপুরুষ ও বিশ্বাসঘাতকেরা বলতে চাইবে, যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের মজুত কমে গেছে। কিন্তু তা সত্য নয়। আমাদের কাছে এত বেশি গোলাবারুদ রয়েছে; যা আমরা যতটা ব্যবহার করতে পারি, তার চেয়েও বেশি। আর আমরা এমন মাত্রায় গোলাবারুদ তৈরি করছি, যা আগে কখনো করিনি।’
যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের বর্তমান মজুতের সুনির্দিষ্ট তথ্য গোপন থাকায় এ বিষয়ে পুরো চিত্র জানা সম্ভব নয়। তবে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার কথা শুধু সংবাদমাধ্যমই নয়, প্রতিরক্ষা দপ্তরের মহাপরিদর্শক এবং কংগ্রেসের নির্দলীয় গবেষণা সংস্থা কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসও জানিয়েছে। গত সপ্তাহে প্রকাশিত দুটি পৃথক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে।
প্রতিরক্ষা দপ্তরের অধিগ্রহণবিষয়ক একটি কার্যালয়ের বরাত দিয়ে মহাপরিদর্শকের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধে গোলাবারুদ ব্যবহারের কারণে কৌশলগত মজুতে ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং গোলাবারুদ পুনরায় সরবরাহের ক্ষেত্রে সামরিক শিল্পে নানা সীমাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিরক্ষা দপ্তর পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করলেও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে ‘উল্লেখযোগ্য সময়’ প্রয়োজন। বিশেষ করে সলিড রকেট মোটর, উচ্চমানের বিস্ফোরক ও প্রপেল্যান্টের সরবরাহ এবং দক্ষ উৎপাদনকর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের প্রতিবেদনে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় ব্যবহৃত ‘ইন্টারসেপ্টর’ ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতির কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, যুদ্ধের কারণে কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এসব ইন্টারসেপ্টরের মজুত কম থাকবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালানোর আগেই প্রতিরক্ষা দপ্তরের কাছে ইন্টারসেপ্টরের মজুত সীমিত ছিল। ২০২৫ সালের জুন থেকে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত এসব অস্ত্রের ৫০ থেকে ৬৬ শতাংশ ব্যবহার করেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে ইন্টারসেপ্টর ব্যবহারের পরিমাণ, বর্তমান কম উৎপাদন হার এবং উৎপাদন বৃদ্ধির ঐতিহাসিক জটিলতার কারণে উৎপাদন বাড়ানো হলেও মজুত পুনর্গঠনে অন্তত পাঁচ বছর সময় লাগতে পার।
তবে প্রতিরক্ষা দপ্তর ধারাবাহিকভাবে বলে আসছে, যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের কোনো ঘাটতি নেই। গত সপ্তাহেও তারা একই দাবি করেছে।
ওয়াশিংটন ডিসিতে অপরাধ
ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে বিভিন্ন মার্কিন শহরে অপরাধ কমার হার নিয়েও আবারও অতিরঞ্জিত দাবি করেছেন।
তিনি বলেন, ‘গত বছরের ২০ জানুয়ারি আমি যখন ওয়াশিংটন ডিসির দায়িত্ব নিই, তখন শহরটি অপরাধে জর্জরিত ছিল। এখন অপরাধ ৮৭ শতাংশ কমেছে এবং আমরা ১০০ শতাংশে যেতে চাই।’
কিন্তু ৮৭ শতাংশের এই দাবি সঠিক নয়।
ওয়াশিংটনে এ বছর সামগ্রিক অপরাধের হার সত্যিই কমেছে। দেশের অন্যান্য অনেক শহরেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। তবে স্থানীয় পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার পর্যন্ত ওয়াশিংটনে মোট ১৫ হাজারের বেশি অপরাধ নথিভুক্ত হয়েছে। একই সময়ের হিসাবে ২০২৪ সালের তুলনায় এ সংখ্যা প্রায় ২৩ শতাংশ কম, ৮০ শতাংশের বেশি নয়। ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ।
আগস্টে ওয়াশিংটন পোস্ট–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওয়াশিংটনে অপরাধ ৮১, ৮৮ বা ৯২ শতাংশ কমেছে—ট্রাম্পের এমন দাবির পক্ষে হোয়াইট হাউস কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি।
ট্রাম্পের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তারা অগ্নিসংযোগের ঘটনা উল্লেখ করেন। তাদের হিসাবে, ২০২৫ সালে এমন চারটি ঘটনা ঘটলেও ২০২৬ সালে হয়েছে মাত্র একটি। তারা ওয়াশিংটনে হত্যার হার কমার কথাও উল্লেখ করেছে। তবে সেটিও ট্রাম্পের বলা হারের কাছাকাছি নয়।
ট্রাম্প যদি নির্দিষ্ট কোনো ধরনের অপরাধ কমার কথা বলে থাকেন, তাহলে তার বক্তব্যে সেটি স্পষ্ট করে বলা উচিত ছিল।