গাজীপুর কণ্ঠ, আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইসরায়েলের কাছে পরমাণু অস্ত্র আছে কি না, এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রায় ষাট বছর ধরে প্রকাশ্যে কিছু বলেনি। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ও সৌদি আরবের পরমাণু উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রেক্ষাপটে সেই নীরবতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
গত জুনে মার্কিন কংগ্রেসের এক প্রকাশ্য শুনানিতে ডেমোক্রেটিক দলের প্রতিনিধি জোয়াকিন কাস্ত্রো পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর কাছে বিষয়টি তোলেন।
রুবিও জানান, বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের ধারণা ইসরায়েলের কাছে এ অস্ত্র আছে, তবে ইসরায়েল কখনো তা স্বীকার করেনি এবং যুক্তরাষ্ট্রও পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে এ নিয়ে কথা বলে না।
বিশ্লেষকদের মতে, কোনো মার্কিন শীর্ষ কূটনীতিকের কাছ থেকে এতটা খোলামেলা মন্তব্য আগে শোনা যায়নি। আরও বিস্তারিত জানতে চাইলে রুবিও বলেন, গোপন বৈঠকে তিনি অপেক্ষাকৃত স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারবেন।
সিএনএনকে কাস্ত্রো বলেন, বর্তমান নীতি এখন ‘বেপরোয়া ও বিপজ্জনক’। তাঁর যুক্তি, ইসরায়েলের সঙ্গে একসঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে থেকেও যুক্তরাষ্ট্র জানে না কোন পরিস্থিতিতে ইসরায়েল পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। পরমাণু স্থাপনায় হামলা হলে বা অস্ত্র ব্যবহার করা হলে যুক্তরাষ্ট্রের কী পরিকল্পনা, তা-ও স্পষ্ট নয়।
একই সময়ে ইসরায়েলের প্রতি ওয়াশিংটনের সমর্থনেও পরিবর্তনের আভাস মিলছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত মঙ্গলবার বলেছেন, ইসরায়েলকে দেওয়া প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা বছরের শেষে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাঁর ভাষ্য, ইসরায়েলের এখন আর এই সহায়তা দরকার নেই। এই সিদ্ধান্ত অস্পষ্টতার নীতিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
মন্তব্য চাওয়া হলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, নির্দিষ্ট অস্ত্রব্যবস্থা ও সামরিক অবস্থান নিয়ে তারা প্রকাশ্যে কথা বলে না। হোয়াইট হাউস সাড়া দেয়নি। ইসরায়েলি দূতাবাস প্রশ্নটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠিয়ে দিলেও সেখান থেকে কোনো জবাব আসেনি।
নীতিটির শিকড় ১৯৬০ সালে। সে বছরের শুরুতে ইসরায়েলি হেলিকপ্টারে ভ্রমণের সময় একদল মার্কিন কূটনীতিক নেগেভ মরুভূমিতে একটি নির্মাণস্থল দেখতে পান। ইসরায়েলের অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা অ্যাডি কোহেন তাঁদের বলেন, সেটি একটি টেক্সটাইল কারখানা। পরে মার্কিন গোয়েন্দারা বুঝতে পারেন, এটি দিমোনা পরমাণু স্থাপনা। এর পর মার্কিন রাষ্ট্রদূত কোহেনের সঙ্গে বৈঠক চান। গোপনীয় এক কূটনৈতিক তারবার্তা অনুযায়ী, কোহেন বিষয়টি প্রথমে হালকাভাবে নিলেও রিঅ্যাক্টরটি শেষ পর্যন্ত অস্ত্রের কাজে লাগতে পারে, এমন আভাস দিয়েছিলেন।
‘টেক্সটাইল কারখানা’ কথাটি এখন ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের কাছে পরমাণু কর্মসূচির দিকে ইঙ্গিত করার প্রচলিত রসিকতা। চলতি বছরের ১৪ জুলাইয়ের এক বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও এর উল্লেখ করেছেন।
১৯৬৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার একটি ইউরেনিয়াম কারখানা থেকে অস্ত্রের মানের কয়েকশো পাউন্ড সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের হিসাব পাওয়া যায়নি। মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কেউ কেউ মনে করতেন, তা ইসরায়েলের কর্মসূচিতে গেছে। সাম্প্রতিক একটি প্রামাণ্যচিত্রেও এমন ইঙ্গিত আছে।
ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভের প্রকাশ করা নথি অনুযায়ী, ওই বছরই হেনরি কিসিঞ্জার তেল আবিব সফর করেন। তিনি তখনো হার্ভার্ডের অধ্যাপক। সেখানে ইসরায়েলের তৎকালীন উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী শিমন পেরেজসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে তাঁর ধারণা হয়, ইসরায়েল ইতিমধ্যে পরমাণু অস্ত্র তৈরির পথে হাঁটছে। তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা চাইতেন না যে তারা এ অঞ্চলে পরমাণু অস্ত্র ‘প্রবর্তন’ করেছে, এমন ধারণা তৈরি হোক।
ইতিহাসবিদ আভনার কোহেনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ‘প্রবর্তন’ শব্দের সংজ্ঞা নিয়ে দুই পক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট ছিল। ১৯৬৮ সালের নভেম্বরে এফ-৪ ফ্যান্টম যুদ্ধবিমান বিক্রি নিয়ে আলোচনার সময় ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত ইয়িৎজাক রবিন জানান, অস্ত্র পরীক্ষা ও প্রকাশ্যে ঘোষণার আগে তাঁরা তাকে ‘প্রবর্তিত’ মনে করেন না।

১৯৬৯ সালের জুলাইয়ে কিসিঞ্জার প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে যে স্মারকলিপি পাঠান, তার সঙ্গে সংযুক্ত প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তারা সতর্ক করেন, ইসরায়েলের পরমাণু অস্ত্র অর্জন কেউ রাগের বশে তা ব্যবহার করার আশঙ্কা ‘উল্লেখযোগ্যভাবে’ বাড়াবে। কিন্তু কিসিঞ্জারের মূল্যায়ন ছিল, অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের হুমকি দিয়েও ইসরায়েলকে থামানো যাবে না এবং এতে কংগ্রেসের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ সংকট তৈরি হবে। আবার ইসরায়েলকে প্রকাশ্যে চাপ দিলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আরব দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে ইসরায়েলের সহযোগী বলে অভিযুক্ত করতে পারত। তাই লক্ষ্য দাঁড়ায়, ইসরায়েলের অস্ত্র যেন ‘প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বাস্তবতা’ হয়ে না ওঠে।
সে বছরের সেপ্টেম্বরে নিক্সন ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ারের সহকারীবিহীন বৈঠকের কোনো লিখিত বিবরণ নেই। তবে আভনার কোহেনের ধারণা, সেখানেই এই নীতির ভিত্তি তৈরি হয়। পরবর্তী এক স্মারকে নিক্সনের প্রধান উদ্বেগ হিসেবে উল্লেখ আছে, ইসরায়েল যেন দৃশ্যমানভাবে পরমাণু অস্ত্র ‘প্রবর্তন’ বা পরীক্ষা না করে। এর পর থেকে এ বিষয়ে ইসরায়েলের ওপর মার্কিন চাপ কার্যত থেমে যায়। ইসরায়েল পরমাণু অস্ত্র অপ্রসার চুক্তিতেও (এনপিটি) স্বাক্ষর করেনি।
১৯৭০-এর দশকে সংবাদ প্রতিবেদন ও অসতর্ক সরকারি মন্তব্যে ইঙ্গিত মিললেও ১৯৮৬ সালে দিমোনার সাবেক কারিগর মর্দেখাই ভানুনু ব্রিটিশ পত্রিকা সানডে টাইমসে কর্মসূচির বিবরণ ও ছবি দেন। প্রকাশের আগেই মোসাদের এক এজেন্ট তাঁকে রোমে নিয়ে যায় বলে ওই ঘটনার তদন্তকারী সাংবাদিক পিটার হাউনামের বইয়ে উল্লেখ আছে। সেখান থেকে তাঁকে ইসরায়েলে আনা হয়। রাষ্ট্রদ্রোহ ও গুপ্তচরবৃত্তি-সংক্রান্ত অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়ে তিনি ১৮ বছর কারাভোগ করেন, বেশির ভাগ সময় নির্জন কক্ষে।
২০২৪ সালের একটি হিব্রু ভাষার প্রামাণ্যচিত্রে বলা হয়েছে, দিমোনার নিচে গোপন ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ছিল, যেখানে অস্ত্রের মানের প্লুটোনিয়াম তৈরি হতো। মার্কিন পরিদর্শকেরা আসার আগে সেখানে যাওয়ার লিফট দেয়াল তুলে বন্ধ করে দেওয়া হতো বলে ওই ডকুমেন্টারিতে দাবি করা হয়েছে।

ঠান্ডা যুদ্ধের অবসানের পর নীতিটির মূল যুক্তি দুর্বল হয়। নিউ ইয়র্কারের ২০১৮ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েল তখন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে গোপনে লিখিত আশ্বাস চায় যে তাদের নিরস্ত্র হতে বলা হবে না। বিল ক্লিনটনের আমল থেকে এ আশ্বাস মেলে। ইসরায়েলি সেন্সর এখন ‘বিদেশি প্রতিবেদন অনুযায়ী’ উল্লেখ থাকলে বিষয়টি নিয়ে লেখার অনুমতি দেয়। ২০১৮ সালে সিএনএনকে নেতানিয়াহু অস্ত্রের অস্তিত্ব অস্বীকার করেননি। তিনি শুধু বলেছিলেন, ইসরায়েল এ অঞ্চলে প্রথম পরমাণু অস্ত্র আনবে না। পারমাণবিক হুমকি-বিষয়ক সংস্থা এনটিআইয়ের অনুমান, ইসরায়েলের কাছে ৯০টির মতো ওয়ারহেড আছে।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও পরমাণু কৌশলবিদ ম্যাথিউ ক্রোনিগ মনে করেন, ইসরায়েল প্রকাশ্যে ঘোষণা দিলে অন্য দেশের ওপর একই পথে যাওয়ার চাপ বাড়বে, যা যুক্তরাষ্ট্রের নীতির জন্য ভালো নয়। তাঁর মতে, ইরান পরমাণু পরীক্ষা চালালে তখনই কেবল নীতি বদলানোর যুক্তি থাকবে। তখন ইসরায়েলকে প্রতিরোধ ক্ষমতার বিশ্বাসযোগ্যতা দেখাতে প্রকাশ্যে পরমাণু কৌশল নিয়ে কথা বলতে ও সামরিক মহড়া চালাতে হবে। উল্লেখ্য, ক্রোনিগ কিসিঞ্জারের উত্তরাধিকার-সম্পর্কিত সাহিত্যিক প্রতিনিধিও।
কাস্ত্রোর যুক্তি ভিন্ন। তাঁর মতে, আগের দশকগুলোর ভূরাজনীতি এখন অনেক বদলে গেছে, অথচ নীতি একই রয়ে গেছে। এক পক্ষের হাতে পরমাণু অস্ত্র থাকাটাই প্রকাশ্য আলোচনার জন্য যথেষ্ট বলে তিনি মনে করেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক মাসের যুদ্ধের পরও ইরানের হাতে প্রায় এক হাজার পাউন্ড উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যদিও তা নির্মূল করা ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য। এর বড় অংশ গত বছর মার্কিন বোমা হামলায় আক্রান্ত স্থাপনার নিচে চাপা পড়ে আছে। কার্নেগি এনডাউমেন্টের বিশেষজ্ঞ জেমস অ্যাকটন মনে করেন, আগামী তিন বছরে ইরানের বোমা পাওয়ার সম্ভাবনা ৫০-৫০।
ওদিকে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান একাধিকবার বলেছেন, ইরান বোমা বানালে সৌদি আরবও বানাবে। যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি পরমাণু সহযোগিতা চুক্তি এখন মার্কিন কংগ্রেসের পর্যালোচনায় আছে। শর্ত পূরণ ও যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন সাপেক্ষে এতে সৌদি আরবের নিজ ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার পথ খুলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, অস্পষ্টতার নীতি ভাঙলে ইসরায়েলের পরমাণু প্রযুক্তির উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠবে এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা বা অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের দাবিও জোরালো হতে পারে। একই সঙ্গে পরমাণু অস্ত্র বিস্তারের বিরোধিতায় যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতাও চাপে পড়তে পারে।