গাজীপুর কণ্ঠ ডেস্ক
দেশের কারাগারে বন্দি মায়েদের সঙ্গে থাকা শিশুদের একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর কারাগারের বাইরে পুনর্বাসনের সুপারিশ করেছে সমাজসেবা অধিদপ্তর।
হাইকোর্টের নির্দেশে তৈরি প্রতিবেদনে অধিদপ্তর বলছে, দেশের কারাগারগুলোতে এ ধরনের শিশুর সংখ্যা ২৯৮ থেকে ৩০৩।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশুদের নিকটাত্মীয়ের কাছে বিকল্প পারিবারিক যত্নে (ফস্টার কেয়ার) অথবা সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন সরকারি শিশু পরিবারে রাখা যেতে পারে। অধিদপ্তরের মতে, কারাগারের পরিবেশ শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে উপযোগী নয়।
গত ৯ মে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কামরুন নাহার মাহমুদ (দীপা) এ বিষয়ে হাইকোর্টে জনস্বার্থে রিট করেন। তাঁর যুক্তি ছিল, বাংলাদেশ জেল কোডের ৯৫৭ ধারায় নারী বন্দিরা চার বছর পর্যন্ত সন্তানকে কাছে রাখতে পারেন। বিশেষ ক্ষেত্রে কারা তত্ত্বাবধায়কের অনুমতিতে তা ছয় বছর পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু এরপর শিশুরা কোথায় যাবে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা নেই।
রিটে প্রতিটি কারাগারে শূন্য থেকে তিন বছর বয়সীদের জন্য ক্রেশ এবং তিন থেকে ছয় বছর বয়সীদের জন্য নার্সারি স্থাপনের নির্দেশনা চাওয়া হয়।
১৫ জুন প্রাথমিক শুনানির পর বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি মো. জিয়াউল হকের বেঞ্চ রুল জারি করেন। রুলে জানতে চাওয়া হয়, শিশুদের নিরাপত্তা, কল্যাণ ও বিকাশ নিশ্চিতে সরকারকে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না। আদালত দুই মাসের মধ্যে কোন কারাগারে কত শিশু আছে, তাদের বয়স, থাকার পরিবেশ ও যত্নের ব্যবস্থা জানিয়ে একটি সমন্বিত প্রতিবেদন দিতে বলেন।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে সমাজসেবা অধিদপ্তর প্রতিবেদনটি তৈরি করে। অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা সেটি ডাকযোগে আইনজীবী দীপার কাছে পাঠিয়েছেন। দীপা সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, আদালতের অবকাশ শেষ হলে প্রতিবেদনটি সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে উপস্থাপন করা হবে।
প্রতিবেদনে কারা অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত ৭৪টি কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে মায়েদের সঙ্গে ছিল ২৯৯ শিশু। এর মধ্যে ১৫৩ মেয়ে ও ১৪৬ ছেলে। মায়েদের কেউ সাজাপ্রাপ্ত, কেউ বিচারাধীন; বেশির ভাগের বিরুদ্ধে মাদকের মামলা।
বিভাগ অনুযায়ী শিশুর সংখ্যা:
- – ঢাকা: ১০০ (১৮টি কারাগার)
- – চট্টগ্রাম: ৯০ (১২টি)
- – রাজশাহী: ২৫ (আটটি)
- – রংপুর: ২৫ (আটটি)
- – খুলনা: ২০ (১০টি)
- – সিলেট: ১৯ (পাঁচটি)
- – ময়মনসিংহ: ১৩ (চারটি)
- – বরিশাল: চার (ছয়টি)
একক কারাগার হিসেবে সবচেয়ে বেশি শিশু গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে। ৪ মে পর্যন্ত সেখানে ছিল ৫১ শিশু, ২৪ ছেলে ও ২৭ মেয়ে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তারা কারাগারের নির্দিষ্ট ওয়ার্ড বা সেলে থাকে, যেখানে খুন ও মাদকসহ বিভিন্ন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ও হাজতি বন্দিরাও আছেন।
সমাজসেবা অধিদপ্তর জানিয়েছে, শিশু সুরক্ষা ইউনিটের অধীনে কারাগারে আলাদা কোনো কার্যক্রম নেই। প্রবেশন শাখার মাধ্যমে শিশুদের মৌলিক চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করা হয়। প্রবেশন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে ‘অপরাধী সংশোধন ও পুনর্বাসন সমিতি’ শিশুদের খেলনা, পোশাক ও পুষ্টিকর খাবার দেয়। এর অর্থের উৎস জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের অনুদান ও বিত্তবানদের দান।
আইনজীবী দীপা বলেন, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সরকারি নীতিমালা বা তহবিল নেই। তাই বিকল্প পারিবারিক যত্নের ব্যবস্থা করতে হলে সরকারকে অর্থায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।
সোমবার সুপ্রিম কোর্টে নিজের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল। তিনি বলেন, মায়ের অপরাধের বিষয়টি যেমন বিবেচনায় রাখতে হবে, তেমনি শিশুর বিকাশ ও মায়ের স্নেহ পাওয়ার অধিকারও গুরুত্ব পেতে হবে।
তাঁর মতে, লঘু অপরাধে অভিযুক্ত মায়েদের শিশুদের জন্য আপাতত বিকল্প অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা করা যেতে পারে। শিশু আইনের আওতায় অভিযুক্ত বা ভুক্তভোগী শিশুদের সংশোধনাগারে রাখার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘ মেয়াদে এমন কাঠামো গড়া সম্ভব। তবে এটি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়।
অ্যাটর্নি জেনারেল আশা প্রকাশ করেন, প্রতিবেদনটি আদালতে উপস্থাপনের পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবে।